Image description
► ১০ মাসে নিহতের সংখ্যা ১৬৫ ► আইনি ব্যবস্থায় রয়েছে ঘাটতি ► সামাজিক সচেতনতা জরুরি

মধ্যরাতে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর ধোলাইপাড় এলাকার একটি বাসা থেকে বাপ্পী (১৫) নামের এক কিশোরকে তুলে নিয়ে ‘চোর’ অপবাদ দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে পেটানো হয়। একপর্যায়ে কিশোরটি মারা গেলে তাকে সড়কে ফেলে রাখা হয়। গত ১১ নভেম্বর এ ঘটনা ঘটে। এরও আগে যাত্রাবাড়ীতেই ৩১ অক্টোবর আনোয়ার হোসেন বাবু (৪৩) নামে বিআইডব্লিউটিএর এক ইলেকট্রিশিয়ানকে চোর সন্দেহে হাত-পা বেঁধে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। একইভাবে ২৩ নভেম্বর ফরিদপুরের নগরকান্দায় গভীর রাতে চার যুবককে ভ্যানচোর সন্দেহে গণপিটুনি দেওয়া হলে শাহীন শিকদার (২৮) নামে একজন নিহত হন। সম্প্রতি সময়ের শুধু এ ঘটনাগুলোই নয়, রাজনৈতিক বিরোধ, জমি নিয়ে দ্বন্দ্ব কিংবা পূর্বশত্রুতার জেরে চোর, ছিনতাইকারী, ডাকাতসহ বিভিন্ন অপবাদ দিয়ে প্রতিনিয়তই গণপিটুনি দিয়ে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। কিছু ঘটনা হুট করে সংক্ষুব্ধ জনতার মাধ্যমে ঘটলেও বেশির ভাগ ঘটনাই ঘটছে পূর্বপরিকল্পিতভাবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মবের পরিবর্তিত ধরন হিসেবে গণপিটুনিকে বেছে নেওয়া হয়েছে। ফলে দিনদিন আবারও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে গণপিটুনির ঘটনা। এটির লাগাম টানতে না পারলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঘাড়েই আবার দোষ চাপবে। পুলিশ বলছে, গণপিটুনি প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতার বিকল্প নেই।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১০ মাসে মব ও গণপিটুনিতে ১৬৫ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক ৭৭ জন নিহতের ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। ঢাকার পরেই রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ। সেখানে নিহতের সংখ্যা ২৮ জন। সবচেয়ে কম চারজন নিহতের ঘটনা ঘটেছে সিলেট বিভাগে। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) পরিসংখ্যান বলছে, গত ১০ মাসে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির অন্তত ২৫৬টি ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন ১৪০ জন এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ২৩১ জন।

গত ২৪ অক্টোবর ভোরে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় গরুচোর সন্দেহে করিম উদ্দিন নামে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ২৩ নভেম্বর কুমিল্লার চান্দিনায় মুছা নামে এক যুবককে ছিনতাইকারী সন্দেহে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়। গত ১১ অক্টোবর নওগাঁর বদলগাছীতে ডাকাতির চেষ্টার অভিযোগে গণপিটুনিতে আশাদুল ইসলাম (৪২) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। এ সময় উত্তেজিত জনতা তার হাত-পা বেঁধে দুই পায়ের রগও কেটে দেয়। গত ২১ অক্টোবর গাজীপুরের টঙ্গীতে মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে এলাকাবাসীর পিটুনিতে অজ্ঞাতপরিচয় এক যুবক নিহত হন। মৃত্যুর পর উত্তেজিত জনতা ওই ব্যক্তির গায়ে লবণ ঢেলে উল্লাস করে। গত ২২ আগস্ট চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে তিন কিশোরকে চোর সন্দেহে বেঁধে পেটানোর ঘটনা ঘটে। তখন ঘটনাস্থলেই রিহান মহিন নামে এক কিশোর নিহত হয়। গত ৭ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ছিনতাইকারী সন্দেহে সাজ্জাদ হোসেন (৩০) নামে এক মানসিক প্রতিবন্ধী যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, বর্তমান সময়ে মবের আরেকটি ধরন গণপিটুনির ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। এভাবে যদি মব ও গণপিটুনির ঘটনা মাথা চাড়া দিয়ে উঠতেই থাকে, তাহলে বেলা শেষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেই দোষ নিতে হবে। এজন্য তাদের উচিত হবে গণপিটুনির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া এবং কোনো ঘটনা ঘটলে নেপথ্যের লোকদের আইনের আওতায় আনা।

মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, গণপিটুনি আমাদের সমাজে একটি উদ্বেগজনক ও বিপজ্জনক প্রবণতা হিসেবে জেঁকে বসেছে। এটি শুধু আইনশৃঙ্খলার অবক্ষয় নয়, অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার কাঠামোর ওপর নাগরিকের আস্থাহীনতারও প্রকাশ। বস্তুত এ দায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার ত্রুটি এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য অনেকাংশে দায়ী। রাষ্ট্রকে দ্রুত ও কঠোরভাবে এ প্রবণতা রোধ করতে হবে। অন্যথায় গণপিটুনির মতো এই বেআইনি চর্চা সমাজকে আরও অস্থিতিশীল ও অনিরাপদ ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, গণপিটুনির ঘটনা ঘটলে পুলিশ আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়। তবে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে পিটুনি খেয়ে ভিকটিমের পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যায়। তাই এ বিষয়ে সামাজিক সচেতনতার বিকল্প নেই।