দেশে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বেড়েছে টার্গেট কিলিং। চলতি বছরের ১০ মাসেই রাজনৈতিক কারণে অন্তত ১০৯ জনের প্রাণহানি ঘটেছে।
এর মধ্যে দুষ্কৃতকারীর হামলায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৪০ জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৪ মাসে রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের ওপর কমপক্ষে ১৭১টি দুর্বৃত্তের হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে কমপক্ষে ১২০ জন নিহত ও দুই শতাধিক আহত হয়েছেন। নিহতদের বড় অংশই বিএনপির নেতা-কর্মী। এই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন অন্তত ২৮১ জন। অধিকাংশ মৃত্যু দলীয় অন্তঃকোন্দলে। মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন, হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদনে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের এ ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনগুলো বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ আমলেও রাজনৈতিক সহিংসতা ও দুষ্কৃৃতকারীদের হামলায় বিপুলসংখ্যক রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। তখন নিহতের তালিকায় এগিয়ে ছিল আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী। অধিকাংশ ঘটনা ঘটে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে। আওয়ামী লীগের পতনের পর বেশি হত্যাকাণ্ডের শিকার বিএনপির নেতা-কর্মী।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্যানুযায়ী, গত অক্টোবরে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ওপর অন্তত ১৬টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে আটজন নিহত ও ১০ জন আহত হন। নিহতদের সাতজনই বিএনপির নেতা-কর্মী ও একজন শিবিরকর্মী। ওই মাসে রাজনৈতিক কারণে মোট ১৫ জন নিহত হন। ৪৯টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ৩০টি বিএনপির অন্তঃকোন্দল, ৫টি আওয়ামী লীগ-বিএনপি সংঘর্ষ, ছয়টি বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষ, একটি আওয়ামী লীগ-এনসিপি সংঘর্ষ, একটি আওয়ামী লীগের অন্তঃকোন্দল, একটি এনসিপির অন্তঃকোন্দল ও বাকিগুলো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অফিস ও বাড়িঘরে হামলা।
একইভাবে গত সেপ্টেম্বরে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ওপর ১৫টি হামলার ঘটনা ঘটে। এতে বিএনপির দুজন, আওয়ামী লীগের একজন ও ইসলামী ঐক্য আন্দোলনের একজন নিহত হন। এ ছাড়া দুজন আওয়ামী লীগ নেতার লাশ উদ্ধার হয়। আগস্টে দুষ্কৃৃতকারীদের হামলায় সাতজন, জুন ও জুলাইয়ে চারজন করে, মে মাসে পাঁচজন, মার্চ ও এপ্রিলে চারজন করে রাজনৈতিক নেতা-কর্মী প্রাণ হারান। দলীয় আধিপত্য নিয়ে এসব টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা ঘটে বলে ধারণা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর।
এইচআরএসএসের তথ্যানুযায়ী ২০২১ সালে রাজনৈতিক সহিংসতায় ৮২ জন, ২০২২ সালে ৯২ জন ও ২০২৩ সালে ৯৬ জন নিহত হন। ২০২৩ সালের শেষ দিকে নির্বাচনের আগমুহূর্তে সহিংসতা বাড়ে। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে দলীয় অন্তঃকোন্দল বাড়ে। তখন নিহতদের মধ্যে বেশির ভাগ ছিল আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক কারণে ১ হাজার ১৮০ জন নিহত ও ৩৭ হাজার ৫১ জন আহত হন। শুধু জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত হন ১ হাজার ৩৫ জন। অভ্যুত্থান বাদে গত বছর রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হন ১৪৫ জন। ওই বছর ১২তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও উপজেলা নির্বাচন কেন্দ্র করে ৭৮১টি ঘটনায় ৪৩ জন খুন হন। এর মধ্যে ৩৯ জনই ছিলেন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী। এইচআরএসএসের প্রতিবেদন বলছে, গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ১৩ মাসে ১ হাজার ৪৭টি রাজনৈতিক ঘটনায় ১৬০ জন নিহত হন। এর মধ্যে বিএনপির ১০৪ জন, আওয়ামী লীগের ৩৮ জন, জামায়াতে ইসলামীর তিনজন, এনসিপির একজন, ইউপিডিএফের ১০ জন ও রাজনৈতিক পরিচয় অজানা চারজন। আহত হন ৮ হাজারের বেশি। বেশির ভাগ মৃত্যু হয় দলীয় অন্তঃকোন্দলে। বিএনপির ৫৭৭টি দলীয় কোন্দলে নিহত হন ৮৮ জন। বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে ২২১টি সংঘর্ষে ৩৪ জন নিহত হন। এ ছাড়া নিহত ৩৮ জন আওয়ামী লীগের মধ্যে ১২ জনই অন্তর্দলীয় সহিংসতায় মারা গেছেন। জামায়াত কর্মীরা নিহত হয়েছেন বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংঘর্ষে।
অধিকারের প্রতিবেদন বলছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৪ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ২৮১ জন। রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের ওপর দুর্বৃত্তদের দ্বারা কমপক্ষে ১৭১টি হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যাতে কমপক্ষে ১২০ জন মারা গেছেন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত ১০ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় ১২১ জন নিহত হন। এর মধ্যে ৭৪ জন (প্রায় ৬১ শতাংশ) ছিল বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের শিকার।
এ ব্যাপারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. কে এম মহিউদ্দিন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গনে সাধারণত ক্ষমতায় টিকে থাকতে খুন-খারাবির ঘটনা ঘটে। যারা ক্ষমতায় থাকে, তাদের নেতা-কর্মীদের নানা সুবিধা পাওয়ার বিষয় আছে। বর্তমানে বিএনপি ধরেই নিয়েছে তারা ক্ষমতায় যাচ্ছে। তাই নেতা-কর্মীরা নিজের শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে নিজেদের মধ্যেই সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। একই কারণে টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা ঘটতে পারে। আওয়ামী লীগ আমলেও এটা হয়েছে। তবে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে পরিকল্পিতভাবেও এটা করা হতে পারে, যাতে নির্বাচন পিছিয়ে যায়। ঘটনাগুলো গুরুত্ব দিয়ে অনুসন্ধান করা দরকার।