দেশজুড়ে শীতের প্রভাব বাড়তে থাকায় ঢাকার হাসপাতালগুলোতে ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে কাশি, সর্দি, নিউমোনিয়া, হাঁপানি ও ডায়রিয়ায়। এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসকরা অভিভাবকদের চিকিৎসার পাশাপাশি বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন।
রাজধানীর আগারগাঁও শিশু হাসপাতালের বহির্বিভাগে গত ২৬ নভেম্বর (২৪ ঘণ্টায়) সর্বমোট চিকিৎসা নিয়েছে ১ হাজার ১১৫ জন শিশু। এর মধ্যে জরুরি বিভাগে ৩০১, মেডিসিন বিভাগে ৬৭৯ এবং সার্জারি বিভাগে ১৩৫ জন শিশু চিকিৎসা নিয়েছে। তাদের মধ্যে সাধারণ ঠান্ডাজনিত অসুস্থতা নিয়ে ২৭১ জন, নিউমোনিয়ায় ৩১, হাঁপানিতে ২৩, চুলকানি/চর্মরোগে ১৩৯/২০৩ এবং ডায়রিয়ায় ৫৯ জন শিশু চিকিৎসা নিয়েছে।
গত ২৫ নভেম্বর ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিয়েছে মোট ৩৩৬ শিশু। এর মধ্যে ২৯০ জনের ছিল সাধারণ ঠান্ডাজনিত অসুস্থতা, ২৭ জনের নিউমোনিয়া এবং ২৩ জনের হাঁপানি। ২৪ নভেম্বর চিকিৎসা নেওয়া ২৫৮ জন রোগীর মধ্যে ১৯৮ জনের ছিল ঠান্ডাজনিত সমস্যা, ৩৬ জনের নিউমোনিয়া ও ২৪ জনের হাঁপানি। ২৩ নভেম্বর ২৭৫ রোগীর মধ্যে ২০০ জনের সাধারণ ঠান্ডা, ৪৪ জনের নিউমোনিয়া ও ২৮ জনের হাঁপানি শনাক্ত হয়। ২২ নভেম্বর ৩১৪ রোগীর মধ্যে ২৩০ জন ঠান্ডাজনিত সমস্যা, ৫০ জন নিউমোনিয়া এবং ৩৪ জন হাঁপানিতে আক্রান্ত ছিল।
২২ থেকে ২৬ নভেম্বর পর্যন্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই সময়ে ১ হাজার ১৯২ শিশু ঠান্ডাজনিত অসুস্থতায়, ১৮৮ জন নিউমোনিয়ায় এবং ১২৮ জন হাঁপানির চিকিৎসা নিয়েছে। ডায়রিয়ায় ২২ নভেম্বর ৭৭, ২৩ নভেম্বর ৬৪, ২৪ নভেম্বর ৪৯, ২৫ নভেম্বর ৬৫ এবং ২৬ নভেম্বর ৫৯ জন রোগী চিকিৎসা নেয়। মোট ৩১৪ শিশু এ সময়ে ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা পেয়েছে।
ঢাকা শিশু হাসপাতালের বহির্বিভাগে অভিভাবকদের কোলে করে সন্তান নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। কারও সন্তান ঠান্ডা ও জ্বর, আবার কারও সন্তান কাশি-শ্বাসকষ্টে ভুগছে।
দেড় বছর বয়সী সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন আমেনা খাতুন ও তার স্বামী আসলাম। জানতে চাইলে আসলাম এই প্রতিবেদককে জানান, তাদের সন্তান প্রায় ১০ দিন ধরে ঠান্ডাজনিত জ্বর ও কাশিতে ভুগছে। ফার্মেসির ওষুধে কাজে না হওয়ায় প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন। কিছুটা ভালো হলেও বাসায় গিয়ে আবার অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাই উন্নত চিকিৎসার জন্য তারা সন্তানকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন।
রাবেয়া, নিলুফা, ইয়াসমিনসহ অনেকে একই ধরনের উপসর্গে আক্রান্ত সন্তানদের নিয়ে ঢাকা শিশু হাসপাতালে ভিড় করেছেন। কারও ঠান্ডা, কাশি, জ্বর, কারও শ্বাসকষ্ট, আবার কেউ খাবার খেতে পারছে না।
বর্তমানে নিউমোনিয়া ওয়ার্ডে ভর্তি আছে ৩১ জন শিশু। গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছে আরও ১১ জন। তাদের একজন কিশোরগঞ্জের আলিফ। তার বয়স সাত মাস। গত এক মাস ধরে সে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আলিফের মা জানান, দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসকষ্টে ভুগছে আলিফ। বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করানো হলেও তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়নি। শিশু হাসপাতালে ভর্তি করানোর পর কিছুটা ভালো হয়েছে।
তিনি জানান, তাদের পাশের বেডে থাকা এক শিশু সাত দিন হাসপাতালে থেকে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি যায়। এরপর আবার অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ফেরত আসে। তার ভাষায়, ‘আমার বাচ্চা পুরোপুরি ভালো না হওয়া পর্যন্ত আমি বাড়ি যাবো না। এখানে আলিফকে স্যালাইন, ইনজেকশন ও শ্বাসকষ্ট বাড়লে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে।’
ডায়রিয়া বিভাগেও গত ২২ নভেম্বর চিকিৎসা নিয়েছে ৭৭ জন শিশু। এছাড়াও ২৩ নভেম্বর চিকিৎসা নিয়েছে ৬৪, ২৪ নভেম্বর ৪৯, ২৫ নভেম্বর ৬৫ এবং ২৬ নভেম্বর ৫৯ জন শিশু চিকিৎসা নিয়েছে।
ডায়রিয়ায় আক্রান্ত সন্তানকে নিয়ে ১৭ নভেম্বর হাসপাতালে আসেন কবির ও তার স্ত্রী। ডাক্তাররা প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন। পাঁচ দিন ধরে হাসপাতালে আছেন তারা। তাদের সন্তান এখন প্রায় সুস্থ। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এক-দুই দিনের মধ্যেই তাকে ছাড়পত্র দেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শীতকালে শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। তাই সন্তান অসুস্থ হওয়ার আগেই বাড়িতে পর্যাপ্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল অ্যান্ড ইনস্টিটিউটের ডিপার্টমেন্ট অব পেডিয়েট্রিকস রেসপাইরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড আরআইসিইউ’র অফিসার ডা. বেদান্ত মজুমদার জানান, শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তাই তারা ঠান্ডা, কাশি ও অন্যান্য অসুস্থতায় সহজেই আক্রান্ত হয়। কিছু ক্ষেত্রে আইসিইউতেও নিতে হয়।
তিনি বলেন, ‘বায়ুদূষণ, মশার কয়েল ও ধোঁয়ার সংস্পর্শ ঝুঁকি বাড়ায়, বিশেষ করে ঘিঞ্জি ও কম-বাতাস চলাচলের বাসায় থাকা শিশুদের জন্য।’
একই বিভাগের অধ্যাপক ডা. প্রবীর কুমার সরকার জানান, শীতকালে ঠান্ডা, ভাইরাসজনিত কাশি, নিউমোনিয়া, হাঁপানি এবং রোটা ভাইরাস ডায়রিয়া বেড়ে যায়। বহির্বিভাগে আসা শিশুদের মধ্যে প্রায় ৬০-৭০ শতাংশের থাকে ঠান্ডাজনিত অসুস্থতা, আর ২০-৩০ শতাংশ ভোগে হাঁপানি বা নিউমোনিয়ায়।
তিনি বলেন, জ্বর বা কাশি হলে অভিভাবকদের ১-২ দিন পর্যবেক্ষণ করে তারপর চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রেসক্রিপশন ছাড়া ফার্মেসি থেকে অ্যান্টিবায়োটিক কেনার বিষয়ে তিনি সতর্ক করেন, কারণ বেশির ভাগ ঠান্ডাজনিত অসুখ ভাইরাসজনিত এবং অ্যান্টিবায়োটিক লাগে না। দ্রুত শ্বাস নেওয়া, বুকে শব্দ, খেতে না পারা বা বমি করা নিউমোনিয়ার লক্ষণ হতে পারে। এমন হলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
তিনি সময় মতো ইপিআই টিকা, মৌসুমি ইনফ্লুয়েঞ্জা ও নিউমোনিয়া টিকা দেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘শীতে শিশুরা কম পানি পান করে, তাই ডিহাইড্রেশন এড়াতে তরল খাবার বাড়াতে হবে। বাইরে ধুলোবালি থেকে বাঁচতে মাস্ক পরা এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখাও জরুরি।’