সিন্ডিকেটের চাপে ফরিয়া বিক্রেতাদের দাম না পাওয়া, সংরক্ষণ অবকাঠামোর ঘাটতি, সরবরাহ চেইনে জড়িতদের দক্ষতার অভাব ও ঈদের সময়ের উচ্চ পরিবহন ব্যয়ের কারণে প্রতি বছরই কোরবানির পশুর চামড়া নষ্ট হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। এবছর সংরক্ষণ সংকটে ৩১ লাখেরও বেশি চামড়া নষ্ট হতে পারে বলে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) সূত্রে জানা গেছে।
এর আগে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যে জানা যায়, এবার ঈদুল আজহায় সারাদেশে ৯৩ লাখ ৬৭ হাজার ৪১৮টি পশু কোরবানি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এখন বিসিকের তথ্য বলছে, এর মধ্যে সারাদেশে ৬২ লাখ ৫৩ হাজার ৯১৭টি পশুর চামড়া সংরক্ষণ করা হয়েছে। কোরবানি হওয়া বাকি পশুগুলোর চামড়া নষ্ট হয়ে গেছে। গত বছরও কোরবানির ঈদ ঘিরে প্রায় ৩০ লাখ পশুর চামড়া নষ্ট হয়েছে।
জানা গেছে, দাম না পেয়ে কেউ কেউ চামড়া বিক্রি না করে ফেলে দিয়েছেন, কোথাও কোথাও ফরিয়া বিক্রেতারা দাম না পেয়ে চামড়া নষ্ট করেছেন এবং কিছু চামড়া বরাবরই নষ্ট হয় সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করায়। সংরক্ষণ করা চামড়াগুলোর মধ্যে ৭২ দশমিক ১ শতাংশ গরু ও মহিষের এবং বাকি ২৭ দশমিক ৯ শতাংশ ছাগল ও ভেড়ার।
বিসিকের এক প্রতিবেদন বলছে, সংরক্ষণ করা ৬২ লাখ ৫৩ হাজার চামড়ার মধ্যে সারাদেশে বিভিন্ন গুদামে ৬৭ দশমিক ৪ শতাংশ, মাদরাসাগুলোতে ২৩ দশমিক ২ শতাংশ এবং টেনারিগুলোতে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ চামড়া সংরক্ষণ করা হয়েছে।
তথ্য বলছে, গত বছর ৬০ লাখ ৩০ হাজার চামড়া সংরক্ষণ করা হয়েছিল। যেখানে এবার সংরক্ষণ করা হয়েছে ৬২ লাখেরও বেশি চামড়া। অর্থাৎ, গত বছরের তুলনায় এবার চামড়া সংরক্ষণ বেড়েছে ৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ। তবে গত বছরের চেয়ে এ বছর পশু কোরবানি বেশি হয়েছে এবং সংখ্যার দিক থেকে চামড়া নষ্টও বেশি হয়েছে।
অনেকে চামড়ার দাম নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়েছে। সরকার লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করেছে। কাঁচা চামড়ার দাম স্থানীয় বা মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ঠিক করেন। প্রতিবছর বিষয়টি নিয়ে কথা উঠে। আমরা লবণযুক্ত চামড়া সরকার নির্ধারিত দামে কিনেছি।—বিটিএ চেয়ারম্যান মো. শাহীন
যদিও এবার বিসিকের কর্মকর্তারা কোরবানির আগে জানিয়েছিলেন, সারাদেশে কমবেশি ১ কোটি পিস কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ কোটি ১ লাখ কোরবানির পশুর চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে। তবে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছিল, সারাদেশে ৭০ লাখের বেশি পশুর চামড়া সংরক্ষণ করা হবে। যদিও চামড়া সংরক্ষণ করা হয়েছে তার চেয়ে অনেক কম।
এদিকে, বিসিকের সোমবার (৮ জুন) দুপুর ১২টা পর্যন্ত হিসাব করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারাদেশ থেকে বিসিক চামড়া শিল্পনগরীতে মোট ৭ লাখ ৯৬ হাজার ১০৬টি কাঁচা চামড়া প্রবেশ করেছে। এর মধ্যে গরু ও মহিষের চামড়া ৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৪টি এবং ছাগল-ভেড়ার চামড়ার সংখ্যা ১ লাখ ১ হাজার ৯২টি।
জানা গেছে, গতবছর ঈদুল আজহায় সরকারের ঘোষণায় কোরবানির পশুর চামড়ার দাম বাড়ানো হলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। সেই ধারাবাহিকতায় এ বছরও কাঁচা চামড়ার কাঙ্ক্ষিত দাম না পেয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন কোরবানিদাতা ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। আবার অনেকে বিনামূল্যে মসজিদ মাদরাসায় চামড়া দান করলেও সংরক্ষণ দক্ষতার অভাবে সেসব চামড়া নষ্ট হয়েছে বা মান খারাপ হয়েছে।
বরাবরের মতোই এবারও ট্যানারি মালিকরা বলছেন, স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অদক্ষতা ও গুজবের কারণে কোরবানিদাতারা চামড়ার সঠিক দাম পাননি। দাম না পেয়ে অনেকে চামড়া ফেলে দিয়েছেন বা মাটিতে পুঁতে ফেলেছেন। তবে, ট্যানারি মালিকরা লবণযুক্ত চামড়া সরকার নির্ধারিত দামেই কিনছেন বলে জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) চেয়ারম্যান মো. শাহীন আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘অনেকে চামড়ার দাম নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়েছে। সরকার লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করেছে। কাঁচা চামড়ার দাম স্থানীয় বা মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ঠিক করেন। প্রতিবছর বিষয়টি নিয়ে কথা উঠে। আমরা লবণযুক্ত চামড়া সরকার নির্ধারিত দামে কিনেছি।’
কিছু চামড়া নষ্ট হয়েছে। এখনো পুরোপুরি চামড়া আসা শুরু হয়নি। আমার মনে হয় না, চামড়া সংগ্রহ গতবারের চেয়ে কম হবে। যদিও ছাগলের কিছু চামড়া নষ্ট হওয়ার কারণে মনে করা হচ্ছে, চামড়া সংগ্রহ কম হবে।—মো. সাখাওয়াত উল্লাহ
সারাদেশে যে পরিমাণ পশু কোরবানি হয়েছে সে তুলনায় চামড়া সংরক্ষণ বা সংগ্রহ অনেক কম। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, মাঠপর্যায়ে চামড়ার সঠিক মূল্য ও সংরক্ষণ প্রক্রিয়ার অভাবে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। যার ফলে অনেকে নষ্ট চামড়া ফেলে দেন বা মাটিতে পুঁতে ফেলেন। যে কারণে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় সংগ্রহ কম হয়ে থাকে।
সালমা ট্যানারির স্বত্বাধিকারী মো. সাখাওয়াত উল্লাহ জাগো নিউজকে বলেন, ‘কিছু চামড়া নষ্ট হয়েছে। এখনো পুরোপুরি চামড়া আসা শুরু হয়নি। আমার মনে হয় না, চামড়া সংগ্রহ গতবারের চেয়ে কম হবে। যদিও ছাগলের কিছু চামড়া নষ্ট হওয়ার কারণে মনে করা হচ্ছে, চামড়া সংগ্রহ কিছুটা কম হবে।’
‘দেশে প্রতিবছর পশু কোরবানির সংখ্যা ৮ থেকে ১০ শতাংশ হারে বাড়ে। আমরা এবছর ধারণা করেছিলাম, এক কোটি পিস চামড়া সংগ্রহ করতে পারবো। গত বছর ৯১ লাখের মতো (৯১ লাখ ৩৬ হাজার) পশু কোরবানি হয়। পাঁচ থেকে ছয় শতাংশ হারে বাড়লেও এবার সে সংখ্যাটি ৯৮ বা ৯৯ লাখ হওয়ার কথা। কিন্তু এবার সেই হারে পশু কোরবানি বাড়েনি। কিছুটা বাড়লেও সেটি গত বছরের প্রায় কাছাকাছিই।