Image description

রাত নামলেই কাচের উঁচু ভবনগুলো আলোয় ঝলমল করে ওঠে। হুয়াংপু নদীর পানিতে ভেসে থাকে পুরো শহরের প্রতিচ্ছবি। ওপরে প্রশস্ত সড়ক। দুই পাশে গাছের সারি। আর হাঁটার পথে ব্যস্ত মানুষের চলাচল।

অথচ চীনের এই শহরের ইতিহাস একেবারেই এমন ছিল না। একসময় এটি ছিল ঘনবসতিপূর্ণ বন্দর নগরী। দারিদ্র্য আর সংকুচিত জীবনের প্রতীক।

সম্প্রতি সাংহাই ঘুরে দেখা যায়, শহরটির প্রতিটি স্তর যেন পরিকল্পনার ভাষায় গড়া। এটি শুধু একটি মেগাসিটি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা, রাষ্ট্রীয় নীতি ও অর্থনৈতিক কৌশলের এক বাস্তব উদাহরণ।

সাংহাই পেরেছে, ঢাকাও চাইলে পারেনদীতীরের সাংহাই

 

আমাদের ঢাকা শহরে ফেরা যাক। ঢাকাও মেগা সিটি। উঁচু ভবন, রাজনীতি, প্রশাসনিক কেন্দ্র। দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরে ঢাকাকে কেন্দ্র করে। কিন্তু এই শহরে আছে দারিদ্র্য, দূষণ, অনিয়ম, অপরিকল্পিত অত্যাচার।

দারিদ্র্যপীড়িত বন্দর নগরী থেকে আধুনিক বৈশ্বিক মহানগরে রূপান্তর, সাংহাই এখন বিশ্বের অন্যতম সফল নগর উন্নয়নের গল্প। কিন্তু একদিনে সেটা হয়নি। ঢাকা নির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা কখনো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেনি। অন্তত নাগরিক হিসেবে আমরা সেটা বলতেই পারি। সাংহাই পেরেছে, ঢাকাও যে চাইলে পারে সেটা মিলিয়ে নিতে পারবেন যে কেউ।

এর আগে সাংহাইয়ের ইতিহাসে আরেকটু ঢুঁ মেরে আসা যাক। ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকে শহরটি ছিল শ্রমজীবী মানুষের ঘনবসতির এলাকা, যেখানে জীবনযাত্রা ছিল কঠিন এবং জায়গার অভাব ছিল প্রকট। সেই বাস্তবতা এখন ইতিহাস।

 

সাংহাই পেরেছে, ঢাকাও চাইলে পারেমেঘে ঢেকেছে সাংহাইয়ের ভবন

উঁচু ভবন, আধুনিক অবকাঠামো এবং পরিকল্পিত জনপরিসর শহরটির ভৌত কাঠামোর পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক চেহারাও বদলে দিয়েছে।

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হলো পিপলস স্কয়ারে সাংহাই আরবান প্ল্যানিং এক্সিবিশন সেন্টার।

আমাদের নেওয়া হয় ‘শহরের জানালা’ নামে পরিচিত এই বিশাল কমপ্লেক্সে। প্রায় ২০ হাজার বর্গমিটারের এ প্রদর্শনী কেন্দ্র শুধু তথ্য দেখায় না, বরং শহরের পরিবর্তনের একটি ধারাবাহিক গল্প তুলে ধরে।

ভিতরে প্রবেশ করলে দেখা যায় বিশাল দেওয়ালচিত্র, পুরোনো ছবি, টিকা দেওয়া মানচিত্র, বিভিন্ন সময়ের মডেল ও স্থাপত্য নকশা। সব মিলিয়ে এটি এক ধরনের ভিজ্যুয়াল আর্কাইভ, যেখানে শহরের ইতিহাস, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে।

যেখানে সাংহাই হতে পারে ঢাকার মডেল

সাংহাইয়ের মূল দর্শন খুবই সরল। ‘মানুষ শহর তৈরি করে, আর শহর মানুষের জন্য।’ এ ধারণা পুরোনো এবং নতুন দুই সাংহাইয়ের মধ্যেই স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

সাংহাই পেরেছে, ঢাকাও চাইলে পারেমডেল শহর

প্রদর্শনী ঘুরে বোঝা যায়, সাংহাইয়ের এই উত্থান কোনো হঠাৎ পরিবর্তন নয়। এটি দীর্ঘ সময় ধরে চলা পরিকল্পিত নগরনীতি ও রাষ্ট্রীয় সমন্বয়ের ফল, যা কখনোই কেবল বাজারের ওপর নির্ভর করেনি।

প্রদর্শনীর এক অংশে পুরোনো সাংহাইকে দেখানো হয়েছে। ঘনবসতি, দারিদ্র্য ও সীমিত জীবনযাপনের চিত্র। তার পাশে বর্তমান শহরের উঁচু ভবন ও সবুজ অঞ্চল এক ধরনের তীব্র বৈপরীত্য তৈরি করে।

একটি বিশাল হলজুড়ে রয়েছে শহরের মডেল, যেখানে পুরো সাংহাইয়ের কাঠামো একনজরে দেখা যায়। এখানে দেখানো হয়েছে কীভাবে বিভিন্ন মাস্টারপ্ল্যান, বিশেষ করে ‘সাংহাই ২০৩৫’, শহরের ভবিষ্যৎ রূপরেখা তৈরি করেছে।

সাংহাই পেরেছে, ঢাকাও চাইলে পারেনদীতীরের সাংহাই

সাংহাই উন্নয়নের কেন্দ্রে রয়েছে ‘মানবিক শহর’ ধারণা, যা পশ্চিমা মানবতাবাদের থেকে আলাদা ব্যাখ্যায় দাঁড়ানো। এখানে উন্নয়নকে ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং সামষ্টিক কল্যাণ হিসেবে দেখা হয়।

এর সবচেয়ে বাস্তব উদাহরণ হলো ‘১৫ মিনিট কমিউনিটি লাইফ সাইকেল’, যেখানে মানুষ হাঁটার দূরত্বের মধ্যেই স্কুল, হাসপাতাল, বাজার ও বিনোদনের সুযোগ পেতে পারে।

পরিবেশ পরিকল্পনাও শহরের উন্নয়নের আরেকটি বড় ভিত্তি। পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, কম কার্বন পরিবহন ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে শহরকে টেকসই করার চেষ্টা চলছে।

সাংহাই পেরেছে, ঢাকাও চাইলে পারেপরিকল্পিত সাংহাইয়ের বিভিন্ন মডেল

একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ‘স্পঞ্জ সিটি’, যেখানে বৃষ্টির পানি জমে না থেকে ভূগর্ভে শোষিত ও পুনর্ব্যবহৃত হয়।

শহরের পরিকল্পনা শুধু উপরিভাগে নয়, ভূগর্ভেও বিস্তৃত। মেট্রো, ইউটিলিটি নেটওয়ার্ক ও অন্য অবকাঠামো স্তরভিত্তিকভাবে সাজানো, যা সাধারণত চোখে পড়ে না।

বাংলাদেশ, বিশেষ করে ঢাকা শহরের জন্য এসব অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়। সাংহাই বলা যায় শূন্য থেকে শুরু করে শিখরে পৌঁছেছে। ঢাকার অনেক কিছু আছে। দরকার শুধু সাজানো গোছানো বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা এবং সঠিক বাস্তবায়ন। সাংহাই পারলে ঢাকা পারবে না কেন!

সাংহাই দেখায়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া দ্রুত নগরায়ণ শুধু চাপ তৈরি করে। ঢাকার ক্ষেত্রে অনেক সময় এ পরিকল্পনার ঘাটতি স্পষ্ট।

সাংহাই পেরেছে, ঢাকাও চাইলে পারেপরিকল্পিত সাংহাই

‘১৫ মিনিট শহর’ ধারণা ঢাকার যানজট কমানোর জন্য কার্যকর হতে পারে, কারণ এতে দৈনন্দিন যাতায়াতের দূরত্ব কমে আসে।

একইভাবে ‘স্পঞ্জ সিটি’ ধারণা জলাবদ্ধতা সমস্যার একটি বাস্তবসম্মত সমাধান দিতে পারে।

সবুজ জায়গার গুরুত্বও সাংহাইয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায়। পার্ক ও উন্মুক্ত স্থানকে তারা বিলাসিতা নয়, বরং নগর জীবনের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।

উন্নয়ন ও ঐতিহ্য রক্ষার ভারসাম্যও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। পুরোনো স্থাপনা সংরক্ষণ করে আধুনিক শহর গড়ে তোলার চেষ্টা বাংলাদেশের জন্যও একটি শিক্ষণীয় দিক।

সাংহাইয়ের গল্প একটি বিষয় পরিষ্কার করে। শহরকে কেবল বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব হয় না। বরং পরিকল্পনা, সমন্বয় ও জনকল্যাণকে কেন্দ্র করে এগোলে শহরকে একটি জীবন্ত ব্যবস্থায় রূপ দেওয়া সম্ভব।

সাংহাই কোনো ভাগ্যের ফল নয়। এটি বহু দশকের ধারাবাহিক পরিকল্পনার বাস্তব ফলাফল। ঢাকার পক্ষেও যা অসম্ভব নয়।