Image description

নব্বইয়ের দশকে অস্টিনের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন ববি হাজ্জাজ। দু’বছর অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটিয়েছিলেন, যেখানে তিনি প্রথমে এমবিএ করেন (২০০৬) এবং পরে কৌশল বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর গবেষণা চালিয়েছিলেন। দেশে ফেরার পর তিনি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবসায়িক কৌশল বিষয়ের প্রভাষক এবং গবেষক হিসাবে কাজ করেছেন। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের পাশে থেকে সাহস জুগিয়ে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করছেন। চষে বেড়াচ্ছেন এক বিদ্যালয় থেকে আরেক বিদ্যালয়ে। প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার তিন মাস পর প্রাথমিক শিক্ষার নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সঙ্গে। জানিয়েছেন নিজের কর্মপরিকল্পনা, দিয়েছেন শিক্ষার্থীদের পরামর্শও। তাঁর সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সিনিয়র রিপোর্টার মো. শিহাব উদ্দিন। নিচে সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশটুকু তুলে ধরা হলো—

প্রাথমিকের ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কারিগরি শিক্ষার সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হবে কি?
ববি হাজ্জাজ: কারিগরি শিক্ষা, এটা সেকেন্ডারি (মাধ্যমিক) থেকেই যাবে। তবে ৪র্থ এবং ৫ম শ্রেণিতে মেইন ডিজাইনটা হবে। এই দুই শ্রেণিতে পড়ার সময়ই শিক্ষার্থীদের সেকেন্ডারির জন্য তৈরি করা হবে। মাধ্যমিকের ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে কোন কোন বিষয় থাকতে পারে; সেটার কিছু পরিচিতি প্রাথমিকের ৪র্থ ও ৫ম শ্রেণিতে নিশ্চয়ই আসবে। তবে সেটা লার্নিং এবং কারিকুলাম এক্সপার্ট যারা; তারাই নির্ধারণ করবেন। আমরা শুধু ডিরেকশনগুলো দেব। শিক্ষার্থীদের লার্নিংয়ের জন্য যেটা বেস্ট হয়, এটা এক্সপার্ট যারা তারাই করবেন।

প্রাথমিকের মিড-ডে মিল খেয়ে অনেক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। এটি রোধে কী ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছেন?
ববি হাজ্জাজ: দুর্নীতি, এই শব্দটা আমি অত ব্যবহার করব না। অনেক ভুল ত্রুটি হচ্ছে, ভুল ত্রুটির কারণ দুর্নীতি কি না সেটা পরে যাচাই-বাছাই করে দেখা যাবে। যাচাইয়ের শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানকে ওয়ার্নিং দেওয়া হয়েছে। বেশ কিছু  সাপ্লায়ারদেরকেও সতর্ক করা হয়েছে। খাবারের মান যাচাইয়ে আমরা মাদেরকে নিয়ে কমিটি গঠন করেছি। ওই কমিটি যদি খাবার এক্সেপ্ট করে তাহলে সবারই ডেলিভারি এক্সেপ্ট হবে। এক্সেপ্ট না করলে তার পেমেন্ট হবে না। আগামী রবিবার (২৪ মে) আমরা সব কন্ট্রাক্টর ও সাপ্লায়েরদের সাথে আলোচনায় বসব। আমরা সবাইকে শেষ সুযোগ দিতে চাই, যেন কাজটা সঠিকভাবে করা যায়। 

প্রাথমিকের ৬৫ হাজার বিদ্যালয়ে কোনো ক্লিনার নেই, এর ফলে বিদ্যালয় পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার কাজ করতে হয় শিক্ষকদের। ক্লিনার বা পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগের কোনো পরিকল্পনা আছে কী?
ববি হাজ্জাজ: আসন্ন বাজেটে ক্লিনার নিয়োগের বিষয়গুলো রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সেফটি-সিকিউরিটির জন্য এগুলো জরুরি। আমরা বিষয়গুলো অনুধাবন করে বিষয়গুলো এডজাস্ট করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিষয়গুলো নীতিমালার আওতায় নিয়ে আসা যায় কিনা সেদিকেও আমাদের নজর রয়েছে।

শিক্ষকদের নিয়ে অনেক বড় পরিকল্পনা আছে। তাদের ট্রেনিং, তাদের এন্থুজিয়াসম ধরে রাখার জন্য তাদের যা কিছু দরকার, সবকিছু নিয়ে আমি কাজ করছি। নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়ন করতে হলে সঠিকভাবে করতে হবে।

প্রাথমিকের কারিকুলাম ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় স্টেক হোল্ডার শিক্ষকরা। তবে বর্তমান শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ঘাটতিসহ নানা সমস্যা রয়েছে। ফলে আপনাদের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তারা কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারবে? 
ববি হাজ্জাজ: শিক্ষকদের নিয়ে অনেক বড় পরিকল্পনা আছে। তাদের ট্রেনিং, তাদের এন্থুজিয়াসম ধরে রাখার জন্য তাদের যা কিছু দরকার, সবকিছু নিয়ে আমি কাজ করছি। নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়ন করতে হলে সঠিকভাবে করতে হবে। কারণ শুধু নতুন কারিকুলাম করে লাভ নেই, যদি সেটা সঠিকভাবে ক্লাসরুমে শেখানো না হয়। ক্লাসে সঠিকভাবে শেখানোর জন্য টিচারদেরকে সঠিক জায়গায় নিয়ে আসা গুরুত্বপূর্ণ। সো আমাদের বিষয়টির দিকে আমাদের শক্ত নজর আছে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩২ হাজার প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। এই পদগুলো রিসোর্স পুলের মাধ্যমে পূরণ করা হবে কিনা?
ববি হাজ্জাজ: বিষয়গুলো একেবারেই প্রাথমিক পর্যায় বলতে পারেন পরিকল্পনা অবস্থায় আছে। আমরা এখানে কোন কোন জিনিসগুলো আরো ব্যবহার করতে পারি সেটি আমরা দেখছি। প্রধান শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে একটি মামলা চলমান আছে। সে কারণে ৩২ হাজারের বেশি বিদ্যালয়ে আমরা হেডমাস্টার দিতে পারছি না। এই বিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে সহকারী শিক্ষকদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। মামলা নিষ্পত্তির জন্য আমরা কোর্টের কাছে আপিল করে যাচ্ছি। যতভাবে পারি কোর্টের কাছে আপিল করে যাচ্ছি। যেহেতু এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা ইস্যু, আমরা আশাবাদী কোর্ট বিষয়টির দিকে খুব তাড়াতাড়ি রায় দেবে।

প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস সম্পর্কে জানতে চাই।
ববি হাজ্জাজ: শুধু প্রাথমিকের ক্ষেত্রেই নয়; পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাতেই লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস অর্থাৎ আনন্দের সাথে শেখার বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে সরকার। প্রাথমিকের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এটা একটা ফিলোসফির মতো। প্রধামন্ত্রী এই ফিলোসফি অনুযায়ী পাঠ্যক্রম তৈরির নির্দেশনা দিয়েছেন। স্কুলের পাঠ্যক্রম বা শিক্ষাক্রমের পুরোটুকু এই আঙ্গিকে সাজানো।  স্কুলের শ্রেণিকক্ষ কীভাবে ডিজাইন হবে, পাঠ্যবইতে কী থাকবে, শিক্ষকরা কীভাবে পড়াবেন কয় ঘণ্টা পড়াবেন, কী কী কাজ থাকবে শ্রেণিকক্ষে—সবকিছুেই একেকটা ফিলোসফি।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট ও শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত চাপ কমাতে আপনারা কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন?
ববি হাজ্জাজ: আমরা শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষক নীতিমালা এবং শিক্ষকের ক্যারিয়ার স্টার্টআপ শিক্ষকের ট্রেনিংয়ে আরও বেশি করে মনোযোগ দিচ্ছি। আমরা প্ল্যানিং স্টেজে আছি যে এগুলো কী কী করা যেতে পারে, একইসঙ্গে শ্রেণিকক্ষ কীভাবে বাড়ানো যেতে পারে, ওয়ানশিফট স্কুলস কীভাবে বাড়ানো যেতে পারে; এসব বিষয়ে বড় দাগে ইনভেস্টমেন্ট আনছি এবং আমাদের প্রচেষ্টাও এটাও থাকে যে, এই নতুন যে উদ্যোগগুলো সামনে নেওয়া হবে; সেটা যেন আগে মত না হয়। এগুলো যেন সঠিক ও মানসম্মত নির্মাণগুলো হয়; সবকিছুর দিকে শক্ত নজর রাখার চেষ্টা করছি।

শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষক নীতিমালা এবং শিক্ষকের ক্যারিয়ার স্টার্টআপ শিক্ষকের ট্রেনিংয়ে আরও বেশি করে মনোযোগ দিচ্ছি। আমরা প্ল্যানিং স্টেজে আছি যে এগুলো কী কী করা যেতে পারে, একইসঙ্গে শ্রেণিকক্ষ কীভাবে বাড়ানো যেতে পারে, ওয়ানশিফট স্কুলস কীভাবে বাড়ানো যেতে পারে; এসব বিষয়ে বড় দাগে ইনভেস্টমেন্ট আনছি।

অনেক বিদ্যালয়ে এখনো অবকাঠামোগত সমস্যা আছে এই বিষয়ে আপনাদের দীর্ঘমেয়াদী কোন পরিকল্পনা আছে কিনা এই অবকাঠামোগুলো উন্নয়ন করার জন্য
ববি হাজ্জাজ: এ বিষয়ে অনেক বড় প্রকল্প হাতে নিচ্ছি। এগুলো উন্নয়নের জন্য আমরা আশাবাদী।

প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার মান উন্নয়ন নতুন কোন কারিকুলাম বা পদ্ধতি চালুর পরিকল্পনা আপনাদের আছে কিনা 
ববি হাজ্জাজ: কারিকুলাম নিয়ে আমরা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করছি। আশা করছি, আগামী দুই বছরের মধ্যে নতুন কারিকুলাম চালু করতে পারব

প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ নিয়ে তো আপনারা উদ্যোগ নিয়েছেন। এই পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে আসলে কি ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছেন?
ববি হাজ্জাজ: নতুন কারিকুলামের ভিত্তিতে টিচার্স ট্রেনিং বাধ্যতামূল হচ্ছে। টিচার্স ট্রেনিংটাও কিছুটা অন্য লেভেলে হবে; যেন যে কোনও স্কুল শ্রেণিকক্ষের দায়িত্ব নেবার জন্য।

শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিশেষ পরিকল্পনা আছে কিনা?
ববি হাজ্জাজ: অনেকগুলো পরিকল্পনা রয়েছে। এগুলো আস্তে আস্তে আপনারা দেখতে পারবেন। 

শিক্ষার্থীরা বাংলা ও ইংরেজি পড়তে না পারলে শিক্ষকরা শাস্তি পাবেন, এরকম একটা খবর আমরা বিভিন্ন জায়গায় দেখেছি। আসলে কি হবে? 
ববি হাজ্জাজ: আমরা যখন সবাইকে ইনসেন্টিভাইজ করব সঠিকভাবে শিক্ষা দান করার জন্য। তখন অবভিসলি সে কাজটা যদি তারা ঠিকভাবে না করে, তাহলেও ইনসেন্টিভ এমনি এমনি হবে না। এজন্য আমরা অ্যাসেসমেন্ট পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছি। সেই অ্যাসেসমেন্ট পদ্ধতির আলোকে তাদেরকে ইনসেন্টিভ বা ডিসেন্টিভ দেয়া হবে।

আগামী পাঁচ বছরে দেশের প্রাথমিক শিক্ষাকে কোথায় দেখতে চান?
ববি হাজ্জাজ: যেন বিশ্বের যেকোন জায়গায় গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড বলতে যেটা বোঝে, সেটা থেকে কোনোভাবে আমাদের দেশ পিছিয়ে না থাকে, সেই জায়গায় দেখতে চাই।

শিক্ষার্থী অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে আপনার কোন বার্তা যদি থাকে।
ববি হাজ্জাজ: জি! অভিভাবকদের জন্য আমার বার্তা, আপনারা আপনাদের সন্তানদের শিক্ষার ওপরে যতটুকু ফোকাস দিতে পারেন, দেবেন। সেই সঙ্গে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো সম্মানটাও সঠিকভাবে রক্ষা করাটা গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেকের জন্য এই মেসেজটা সব জায়গায় ছড়িয়ে দেয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং গার্ডিয়ানদের প্রতি আমার আহ্বান- আপনারা এই মেসেজটা ছড়িয়ে দেবেন।

একজন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে এখন পর্যন্ত আপনার সবচেয়ে বড় অর্জন এবং সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কোনটি বলে আপনার মনে হয়েছে
ববি হাজ্জাজ: তিন মাস হয়েছে আমরা দায়িত্ব নিয়েছি। তাই এখনও অর্জনের সময় আসেনি। অর্জন সময় নিয়ে হবে। সবকিছুই চ্যালেঞ্জ। শিক্ষা ব্যবস্থায় অনেক বছর ধরে যে দুরবস্থা তৈরি করা হয়েছে বা হয়েছে; সেগুলো নিয়ে কাজ করতে হবে। বাচ্চাদের লার্নিং ও স্কুল আওয়ার্স গ্যাপ বিশাল চ্যালেঞ্জ। স্কুল বিল্ডিংগুলোর কী অবস্থা, ভবনগুলোর কী অবস্থা; সেগুলো নিয়েও কাজ করতে হবে। কারিকুলাম কীভাবে আছে, কোনটা কোনটা শেখানো উচিত, কীভাবে শেখানো উচিত; সেগুলোও বিশাল চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জ সব জায়গায় আছে। তবে আমরা কনফিডেন্ট যে, এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে হবে এবং আমাদের শিক্ষার্থীদের সঠিক ভবিষ্যৎ শিক্ষার জন্য সবকিছু করতে পারব।

প্রাথমিকের ১৪ হাজারের বেশি শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর যোগদান করানো হবে। এই প্রশিক্ষণটা কবে থেকে শুরু হতে পারে?
ববি হাজ্জাজ: এটা ন্যাপ (জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি) আরো ভালোভাবে বলতে পারবে। তবে ন্যাপকে আমরা দায়িত্ব দিয়েছি, যাতে শিগগিরই তারা এটা করতে পারে।

আপনাকে ধন্যবাদ।
ববি হাজ্জাজ: দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকেও ধন্যবাদ।