Image description

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ফ্যামিলি কার্ডের ঘোষণা দিয়ে আলোচনার জন্ম দেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করে নতুন সরকার। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দ্রুতই চালু করা হয় ফ্যামিলি কার্ড। এর পাশাপাশি প্রথম ১০০ দিনে আরও কয়েকটি নতুন কার্ড বা কার্ডভিত্তিক উদ্যোগ আলোচনায় এসেছে। চলুন, জেনে নেওয়া যাক সেগুলো সম্পর্কে—

ফ্যামিলি কার্ড

গত ১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। এটি একটি ডিজিটাল ডেটাবেজভিত্তিক স্মার্ট কার্ড, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিবার সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপণ্য এবং সরাসরি নগদ সহায়তা পাবে। এর লক্ষ্য প্রান্তিক, হতদরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারের অর্থনৈতিক ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বিশেষ করে নারীর ক্ষমতায়ন।

প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। ‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’—এই ধারণাকে সামনে রেখে ‘ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং বাস্তবায়ন গাইডলাইন-২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে।

এই কার্ড সবার জন্য নয়। মূলত হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারের নারীরা এ সুবিধা পাচ্ছেন। ভূমিহীন, গৃহহীন, প্রতিবন্ধী সদস্য থাকা পরিবার, হিজড়া, বেদে ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পরিবার অগ্রাধিকার পাচ্ছে।

 

প্রতি পরিবারে সর্বোচ্চ পাঁচজন সদস্য বিবেচনায় নেওয়া হবে। পরিবারের প্রধান নারী বা মা কার্ডধারী হবেন। সরকারি চাকরিজীবী, নিয়মিত পেনশনভোগী, বিলাসবহুল সম্পদের মালিক বা বড় ব্যবসায়ী এ সুবিধার আওতায় আসবেন না।

কার্ডধারী পরিবার মাসে আড়াই হাজার টাকা সরাসরি পাবে। পাশাপাশি কম দামে চাল, ডাল, সয়াবিন তেল ও চিনি কেনার সুযোগ রয়েছে।

কৃষক কার্ড

পর্যায়ক্রমে সারা দেশের কৃষকদের ‘কৃষক কার্ড’ দিচ্ছে সরকার। পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করে দেওয়া হচ্ছে এই কার্ড। এর মাধ্যমে কৃষকেরা ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ, সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে ঋণসহ ১০ ধরনের সুবিধা পাবেন।

পহেলা বৈশাখ (২১ এপ্রিল) প্রাক-পাইলটিং পর্যায়ে এ কার্ড বিতরণের উদ্বোধন করা হয়। পিওএস মেশিন ব্যবহার করে কৃষকেরা সরাসরি সার, বীজ, খাদ্যসহ বিভিন্ন উপকরণ কিনতে পারবেন।

ফ্রিল্যান্সার আইডি কার্ড

দেশের ফ্রিল্যান্সারদের জন্য নতুন উদ্যোগ হিসেবে আগামী পাঁচ বছরে দুই লাখ ফ্রিল্যান্সারকে আইডি কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে তারা ব্যাংকিং সুবিধা, আয়ের স্বীকৃতি ও আনুষ্ঠানিক পরিচয় পাবেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ২২ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব তথ্য জানান।

এর আগে, এবছরের জানুয়ারি থেকে ফ্রিল্যান্সারদের বিনামূল্যে পরিচয়পত্র দেওয়ার কার্যক্রম শুরু করে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ। গত ১৪ জানুয়ারি রাজধানীর আগারগাঁওয়ে আইসিটি বিভাগের সভাকক্ষে ‘ফ্রিল্যান্সার আইডি ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার’ উদ্বোধনের মাধ্যমে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব।

ভবিষ্যতে এই ডিজিটাল আইডি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে গ্রহণযোগ্য করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

ই-হেলথ কার্ড

সরকারের ১৮০ দিনের কর্মসূচির আওতায় ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রাথমিকভাবে খুলনা, নোয়াখালী, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও নরসিংদীতে এটি চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এই কার্ডের মাধ্যমে রোগীরা ইলেকট্রনিক পেশেন্ট রেফারেল ও ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের আওতায় চিকিৎসাসেবা পাবেন।

ফুয়েল কার্ড (ফুয়েল পাস)

জ্বালানি সরবরাহ ও বিতরণে শৃঙ্খলা আনতে মোটরসাইকেলের জন্য কিউআর কোডভিত্তিক ‘ফুয়েল পাস’ চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে জ্বালানি বিতরণ ব্যবস্থাকে আরও নিয়ন্ত্রিত ও স্বচ্ছ করার চেষ্টা চলছে।

এলপিজি কার্ড

পরিবারের নারীপ্রধানদের আর্থিক স্বচ্ছলতা নিশ্চিত করতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর পর এবার গৃহিণীদের রান্নার ঝামেলা কমাতে ‘এলপিজি কার্ড’ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। গত ২৭ এপ্রিল যশোরের শার্শা উপজেলার উলশী খাল পুনঃখনন কার্যক্রমের উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ নতুন উদ্যোগের কথা জানান।

এলপিজি কার্ডের মাধ্যমে নিবন্ধিত পরিবারের নারী সদস্যরা রান্নাবান্নার জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে বা বিশেষ ভর্তুকিতে এলপিজি সিলিন্ডার গ্যাস সুবিধা পাবেন। মূলত রান্নার জ্বালানি সংগ্রহে নারীদের যে শারীরিক ও আর্থিক কষ্ট হয়, তা দূর করাই এই কার্ডের লক্ষ্য।

প্রবাসী কার্ড

বৈধ পথে রেমিট্যান্সে উৎসাহ যোগাতেই সরকার এই প্রবাসী কার্ড চালু করতে যাচ্ছে। সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী দুই মাসের মধ্যে প্রবাসী নাগরিকদের হাতে এই কার্ড চালু হতে যাচ্ছে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই কার্ডটি প্রবাসীদের জন্য একটি ডিজিটাল পরিচয়পত্র ও সেবা কার্ড হিসেবে কাজ করবে, যার মাধ্যমে তারা দেশের ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন সরকারি ও আর্থিক সুবিধা পাবেন।

ওয়ান সিটিজেন ওয়ান কার্ড

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের পুরো অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে ডিজিটাল অটোমেশনের আওতায় আনা হবে এবং ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান কার্ড’-এর মাধ্যমে সব নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ চলছে।

ক্যাপ্টেনস কার্ড

সরকারি উদ্যোগ না হলেও বর্তমান সময়ে আলোচনায় এসেছে ‘ক্যাপ্টেনস কার্ড’। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) জাতীয় দলের সাবেক ও বর্তমান অধিনায়কদের সম্মান জানাতে এই বিশেষ কার্ড চালু করেছে।

এই কার্ডধারীরা স্বাস্থ্যবীমা, বিসিবির চিকিৎসাসেবা, আন্তর্জাতিক ও দেশীয় ম্যাচ উপভোগ এবং অন্যান্য সুবিধা পাবেন।

সর্বোপরি, স্বল্প সময়ের মধ্যেই একাধিক কার্ডভিত্তিক উদ্যোগ চালু বা প্রস্তাব করার মাধ্যমে বিভিন্ন খাতে সেবা প্রদানের নতুন কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করছে সরকার। সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি, স্বাস্থ্য, জ্বালানি ও ডিজিটাল অর্থনীতিতে এই উদ্যোগগুলোর প্রভাব কতটা কার্যকর হবে, তা সময়ই বলে দেবে।