Image description

রাজধানীর শ্যামলীতে দিনদুপুরে মানিব্যাগ-মোবাইল ছিনতাই হয় এনটিভির সাংবাদিক কাজী শফিউল ইসলামের। তবে থানায় গেলে পুলিশ তাঁকে ছিনতাই মামলার পরিবর্তে ‘হারিয়ে গেছে’– বলে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে বলে।

ভুক্তভোগী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীতে চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে থানায় যান না ভুক্তভোগীরা। কিছু মানুষ গেলেও, আদালত এবং থানা-পুলিশে দৌড়াদৌড়ির ভোগান্তির কথা বলে মামলা করতে নিরুৎসাহিত করা হয়। শুধু জিডি করতে বলা হয়। অথচ পুলিশের অপরাধ নথিতে জিডির তথ্যই থাকে না। এতে অপরাধের প্রকৃত চিত্র পুলিশের প্রতিবেদনে উঠে আসে না, যা কার্যত অপরাধীদের উৎসাহিত করছে।

সাংবাদিক কাজী শফিউল ইসলাম জানান, শ্যামলীর শিশুমেলার সামনে বাসের জানালা দিয়ে থাবা মেরে তাঁর মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া হয়। ওই সময় কাছেই ছিলেন ট্রাফিক ও ক্রাইম বিভাগের পুলিশ সদস্যরা। পেশাগত ও ব্যক্তিগত গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র খোয়া যাওয়ায় তাঁদের সহযোগিতা চাইলেও পাননি।

তিনি বলেন, পরে সিনিয়র ভাই ও পুলিশ কর্মকর্তাদের পরামর্শে শেরেবাংলা নগর থানায় জিডি করি। সেখানে মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ‘হারিয়েছে’ বলে উল্লেখ করেছি।

মামলায় অনাগ্রহ কেন

চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা না নিয়ে জিডি করতে বলা নিয়ে শেরেবাংলা নগর থানার এক পুলিশ পরিদর্শক দাবি করেন, ভুক্তভোগীরা যেভাবে সেবা পেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, পুলিশ সেভাবেই আইনি প্রক্রিয়া পরিচালনা করে। অনেক সময় মামলার দীর্ঘসূত্রতা ও ঝামেলার কথা চিন্তা করে ভুক্তভোগীরা নিজেরাই জিডি করতে আগ্রহী হন না।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উপকমিশনার (ডিসি) এন এম নাসিরুদ্দিন বলেন, ভুক্তভোগীরা মামলার চেয়ে খোয়ানো জিনিস উদ্ধারে বেশি আগ্রহী থাকেন। মামলা হলে নিয়মিত পুলিশের কাছে যাওয়া, আদালতে হাজিরা দেওয়া ও দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়– যা অনেকেই বিড়ম্বনা মনে করেন।

তাঁর দাবি, অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ হাতেনাতে অপরাধী ধরলেও ভুক্তভোগী মামলা করতে চান না। তারা শুধু তাদের সম্পদ ফেরত পাওয়ার ওপর জোর দেন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে পুলিশ একপ্রকার অসহায় হয়ে পড়ে। তবে এখন আর আগের মতো নেই। কেউ চাইলে অবশ্যই মামলা করতে পারেন।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাঁদের দাবি, রাজধানীতে প্রকৃত অপরাধের তুলনায় মামলা রেকর্ডের হার অত্যন্ত কম। হত্যা, হামলার মতো ঘটনায় মামলা হলেও চুরি-ছিনতাইয়ের ক্ষেত্রে এটি অনেক কম। এ ধরনের ক্ষেত্রে পুলিশ জিডি করতে উৎসাহিত করার মূল কারণ, অপরাধের ঘটনা কম করে দেখানো।

তাঁরা জানান, মামলা হলে আইনগত প্রক্রিয়া মানার বাধ্যবাধকতা থাকে। তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ, আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া মতো বিভিন্ন বিষয় থাকে। তবে জিডির অভিযোগকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় না। এ কারণে পুলিশের অপরাধের নথিতে মামলার তথ্য থাকলেও জিডির তথ্য উল্লেখ করা হয় না। এতে থানাগুলো তাদের এলাকায় অপরাধ কম দেখাতে পারে।

ডিএমপির তথ্যানুযায়ী, ঢাকা মহানগরে থানার সংখ্যা ৫০টি। গত এপ্রিলে এসব থানায় ডাকাতির ৩টি, দস্যুতার ১০৩টি, ছিনতাইয়ের ৭টি ও চুরির ৫৭৪টি মামলা রেকর্ড করা হয়েছে।

তবে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা স্ট্রিমকে জানান, চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা সরকারি ওই হিসাবের কয়েক গুণ বেশি। কারণ, প্রতিটি থানায় দিনে গড়ে ২০ থেকে ২৫টি জিডি হয়, যার একটি অংশ চুরি-ছিনতাই-ডাকাতির। তবে জিডি হওয়ায় সেগুলো অপরাধ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় না।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, মামলা তদন্তের ক্ষেত্রে পুলিশের প্রয়োজনীয় জনবল ও প্রযুক্তিগত সাপোর্টের অভাব রয়েছে। এ কারণে অনেক সময় ভুক্তভোগী থানায় গিয়ে ‘দ্বিতীয়বার ভিক্টিম’ হওয়ার আশঙ্কায় মামলা এড়িয়ে চলেন। এতে রাজধানীতে অপরাধের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায়