Image description

জেলা শহর থেকে ১১ কিলোমিটার সড়ক, তারপর ৪০ মিনিটের নৌপথ পেরিয়ে পৌঁছাতে হয় পোড়ার চরে। ব্রহ্মপুত্রের বুকে জেগে ওঠা এই চরে প্রায় ১০০ পরিবারের বাস। কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নে বছর বিশ-পঁচিশ আগে গড়ে ওঠা এই জনপদে দূরত্ব আর দুর্গমতার কারণে সরকারি বা বেসরকারি সাহায্য তেমন পৌঁছায় না। আর কোরবানির ঈদ? সেটা এখানকার মানুষের কাছে এক দূরের স্বপ্ন।

চরের বাসিন্দা হাকীম খান (৬০) দশ বছর ধরে এখানে আছেন স্ত্রী হুনুফা খাতুনকে (৫০) নিয়ে। দুই ছেলে বিয়ে করে অন্যত্র থাকে। সংসার চলে কোনো রকমে। তিনি জানালেন, গত বছর ৪০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। সেই কিস্তি শোধ দিতে আবার নিতে হয়েছে ১২ হাজার। সপ্তাহে তিন হাজার টাকা কিস্তি, অথচ কাজ নেই, নদীতে মাছও কমে গেছে।

কোরবানির প্রস্তুতির কথা জিজ্ঞেস করতেই তিনি ম্লান মুখে বললেন, 'আমাগো কোনো ঈদ নাই। গত বছর গোটা চরে একটাই কোরবানি হইছে, মাংসও পাই নাই। এবার কী হবে কে জানে।'

একই চরের মো. রাজু মিয়ার (৩৫) জীবনের গল্পটা আরও কঠিন। তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে সংসার। গত দুই বছরে তিনবার নদীভাঙনে ভিটে হারিয়েছেন। সদ্য ধার-দেনা আর গরু বিক্রির টাকায় ১৫ হাজার টাকার মাটি কেটে ভিত উঁচু করে ৫৫ হাজার টাকায় তুলেছেন নতুন ঘর। সেই ঘরের পাশেও এখন ভাঙছে নদী।

'আমাগো ঈদ নদী নিয়া যায়,' বলতে বলতে তার গলা ভারী হয়ে আসে। 'গেল বার একটা গরু কোরবানি হইছে, দুই-তিন টুকরা মাংস পাইছি। ও মাংস খাওয়া না খাওয়া সমান।'

সাংবাদিক এসেছেন শুনে ছুটে আসেন মো. শাহ আলম (৪৫)। চার মেয়ে আর দুই ছেলের সংসারে তিনিই একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষ। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন, ছেলেরা এখনো ছোট। ঈদ নিয়ে প্রশ্ন করতেই বললেন, 'জীবনই বাঁচে না, আবার ঈদ! কতবার বাড়ি ভাঙছি তার হিসাব নাই। চরে ঈদগাহ নেই, নামাজ পড়ি কখনো এই জমিতে, কখনো ওই জমিতে।'

চরের একমাত্র মসজিদের মুয়াজ্জিন মো. দেওবর মণ্ডল (৫০) বিশ বছর ধরে আজান দিয়ে আসছেন এখানে। তিনি জানালেন, 'এখানে ঈদের দিনও অন্য দিনের মতোই। এবার এখন পর্যন্ত কেউ কোরবানি দেবে বলে শুনিনি।'

যাত্রাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল গফুর বললেন, সাধারণত প্রতি বছর বিভিন্ন চরে আট থেকে দশটি গরু আসে দান হিসেবে, সেগুলো চরেই কোরবানি হয়। এবার এখন পর্যন্ত একটিও আসেনি। কারণ হিসেবে তিনি মনে করেন, সার্বিক অর্থনৈতিক সংকটের কারণে এবার দাতারা এগিয়ে আসছেন না।

লেখক ও কলামিস্ট নাহিদ হাসান বললেন, চরে এজমালি চারণভূমিও কমে গেছে। গো-খাদ্য কিনে খাওয়াতে হয় বলে অনেকে গরু পালতেও পারছেন না, কোরবানিও দিতে পারছেন না। তার মতে, সরকারি খাসজমি এজমালি করে দিলে কিছুটা হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।

ব্রহ্মপুত্রের এই চরে ভাঙন আর অভাব মিলে জীবনটাই যেন এক অন্তহীন লড়াই। উৎসব এখানে বিলাসিতা — যে বিলাসিতার সঙ্গে এই মানুষগুলোর পরিচয় নেই বললেই চলে।