চলতি বছরের গত ৭ মে রাশিয়ায় নির্মাণ ও ফ্যাক্টরি কর্মীর ভিসায় গিয়ে ৩০ বাংলাদেশিকে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তাদের স্বজনরা। এ অবস্থায় দ্রুত সময়ের মধ্যে আটকে পড়া সন্তানদের সুস্থভাবে ফেরত চান তারা।
রোববার (২৪ মে) রাজাধানীর ইস্কাটনে অবস্থিত প্রবাসী কল্যাণ ভবনের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে তারা এই অভিযোগ করেন।
মানববন্ধনে সন্তান রিপন হোসেনকে ফেরত চেয়ে তার মা রিনা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে তার বন্ধুর সঙ্গে জাবালে নুর এজেন্সিতে যায়। সেখানে তারা দুজনই টাকা জমা দেয়। এরপর এজেন্সি আমাদের অনেক দিন ঘুরাইছে। পরে হঠাৎ করে এজেন্সি থেকে ভিসা হওয়ার কথা জানানো হয়। নির্মাণকাজের ভিসা নিয়ে গত ৭ তারিখ রিপন ও ওর বন্ধুসহ ৩০ জন রাশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর ৩ থেকে ৪ দিন কথা হয়েছে। এরপর আর কোনো কথা হয়নি। কারণ এরপরই ওদের কাজের কথা বলে যুদ্ধের ট্রেনিংয়ে নিয়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, ‘এখন ওদের যদি উদ্ধার করতে হয়, তাহলে ট্রেনিং অবস্থায় উদ্ধার করতে হবে। নইলে আর উদ্ধার করা যাবে না। আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার সন্তানকে ফেরত চাই।’
আরেক ভুক্তভোগীর ভাই রায়হান কবির বলেন, ‘আজ এখানে যারা দাঁড়িয়েছে, তাদের প্রত্যেকের সদস্য বিএমইটি ছাড়পত্র নিয়ে রাশিয়া গিয়েছে। একটা মানুষ কখন বিএমইটি ছাড়পত্র পায়? যখন সে সরকারি সব নিয়ম মেনে বিদেশে যায়। তার মানে যে কোম্পানিগুলো আমার ভাইদের বিদেশ পাঠাল, তারা সরকারি নিয়ম মেনে পাঠাল। তাহলে আমার ভাইয়েরা প্রতারণার শিকার হলো কীভাবে?’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার কাছে ১০০০ মানুষের তথ্য আছে, যাদের সরকার অনুমোদন করেছে কিন্তু তারা প্রত্যেকে এখন যুদ্ধে আছে। আবার যে কোম্পানির নামে তারা যাচ্ছেন, সেই নামে কোনো কোম্পানির অস্তিত্ব রাশিয়ায় নেই। আমাদের একটাই দাবি, তাদের সুস্থভাবে ফিরিয়ে আনতে হবে। আর এর জন্য রাশিয়ায় অবস্থিত দূতাবাস, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু এই ৩০ জন নয়, যুদ্ধে আটকে থাকা প্রত্যেক নাগরিককে দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করতে হবে।’
আরিফ হোসেনের বাবা স্বপন পাটওয়ারী বলেন, ‘দুই টাকা বৈধ রুজি কইরা বাপ-মারে খাওয়াইব, আর দেশে রেমিট্যান্স পাঠাইব, এই আশায় আমার ছেলেরে পাঠাইছি। এখন ছেলে পাঠাইয়া বিপদে পড়ে গেলাম। আর কোনো দিন দেখতে পাব কি না সেটাই জানি না। আমরা আমাদের ছেলেকে ফেরত চাই। যে ৩০ জন গেছে, সে ৩০ জনকে একসাথে আমরা আমাদের কোলে-বুকে চাই। আর কিছু চাই না।’
চাঁদপুরের বাসিন্দা কামাল হোসেনের মামাশ্বশুর জলিল খান বলেন, ‘আমার এক আত্মীয়র মাধ্যমে এজেন্সির খোঁজ পাইছি। যখন এজেন্সির মালিকের কাছে গেছি, তখন সে বলছে, “দেখেন, আমরা অবৈধ কোনো লোক পাঠাই না, বৈধভাবে কাগজপত্র দিয়ে লোক পাঠাই। আমাদেরও বৈধ কাগজপত্র করাইছে। কাউকে নির্মাণ ভিসা, কারও আবার ফ্যাক্টরি ভিসায় নিছে। ওরা যাওয়ার পর দেখে যে নিয়ে গেছে সে ওদের ওই দেশের সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি কইরা দেয়।”’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার ভাগ্নি জামাইয়ের সঙ্গে সর্বশেষ ১২ তারিখ কথা হয়েছে। সে বলে, আমাদের কাজের কথা বলে সেনাবাহিনী ধইরা নিয়া গেছে। ট্রেনিং করাইতেছে। এরপর আর কোনো কথা হয়নি। জানি না কেমন আছে। আমাদের দাবি, আমরা বৈধ কাগজপত্র দিয়া পাঠাইছি, আমরা তো যুদ্ধে পাঠাই নাই। আমাদের ছেলে যদি বৈধ কাজ পায় তাইলে কাজ করব, আর নাইলে আমাদের ছেলে আমগো কাছে ফিরাইয়া দিবে। আমগো ছেলে আমরা চাই। আমরা টাকাও চাই না, পয়সাও চাই না; আমাদের ছেলে আমরা চাই।’
নাজমুল আলমের বড় ভাই মো. লিয়াদ আলী বলেন, ‘ওদের রাশিয়ার সেনাবাহিনী জিম্মি করে যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে গেছে। গত কয়েক দিন যাবৎ তারা ট্রেনিং করাচ্ছে। গতকাল রাতে একটা ভয়েস আসছে। তারা বলছে, “আমাদের আপনারা বাঁচান। যদি আপনারা আমাদের এখান থেকে উদ্ধার না করেন, আমাদের যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে গেলে আমাদের লাশটাও বাংলাদেশে মনে হয় যাবে না। আর আমাদের ওপর খুব নির্যাতন করতেছে। আপনারা আমাদের বাঁচান।”’
তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়ে বলেন, ‘তিনি যেন আমাদের এই ৩০টি পরিবারের ৩০টি সন্তান সুস্থভাবে বাংলাদেশে ফেরত আনার ব্যবস্থা করেন। আমাদের কাজের কোনো দরকার নেই, আমাদের টাকার কোনো দরকার নেই, আমাদের দরকার আমাদের সন্তানদের।’