খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার আমভিটার বাসিন্দা লাবণ্য আক্তার। ১৯ মে ভোরে সাড়ে ৩ মাসের সন্তান জয়কে নিয়ে আসেন খুলনা মেডিক্যাল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে। সন্তানের হাম শনাক্ত হয়।
তিনি জানান, টানা চার দিন জ্বরে ভোগার পর শরীরে হাম দেখা দেয়। তাই ওই দিন ভোরে হাসপাতালে আনেন। জরুরি বিভাগ থেকে ১৫ টাকায় টিকিট কেটে শিশু সন্তানকে হাম ওয়ার্ডে ভর্তি করান। ওয়ার্ডে নিলে চিকিৎসক শিশুকে পর্যবেক্ষণ করেন। চার দিনের জ্বরের ঘটনা শোনেন। এরপর ওষুধ লিখে দিলে শিশুর চিকিৎসা শুরু হয়।
খুলনা মেডিক্যাল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশুরা
শুধু জয় নয়, হাসপাতালে হামের চিকিৎসার জন্য আসা সবাইকে জরুরি বিভাগ থেকে টিকিট কেটে ভর্তি হতে হয়। সকল প্রকার রোগের চিকিৎসার জন্য এটাই ভর্তি প্রক্রিয়া। জ্বর বা নিউমোনিয়া নিয়ে ভর্তি হলে তাদের মেডিসিন ওয়ার্ড বা শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। এরপর হাম উপসর্গ দেখা দিলে হাম ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়।
হাসপাতালের চারতলায় হাম রোগীদের ওয়ার্ড। চারতলার লিফট থেকে বের হতেই দেখা গেলো, মেঝেতে রোগীর সারি। কেউ শুয়ে আছে, কেউ আসে যায়, কেউ মোবাইল টিপছে। মেডিসিন ওয়ার্ডের সামনের বারান্দায়ও রোগীর সারি।
রোগীদের মাঝ দিয়ে রাখা সরু পথ ধরে এগিয়ে যাই হাম ওয়ার্ডের দিকে। সেখানে দেখা যায়, ওয়ার্ডের গেটের সামনেই জটলা। জানা গেলো চিকিৎসক রাউন্ডে আছেন। তাই অতিরিক্ত অভিভাবকদের বাইরে রাখা হয়েছে। গার্ডের অনুমতি নিয়ে ভেতরে গিয়ে জানা গেলো হামের ৩৮ রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে ওয়ার্ডে। এই ওয়ার্ডজুড়েই কোলাহল। কোনও শিশু কান্না করছে। কোন শিশু ঘুমাচ্ছে, পাশে মাসহ স্বজনরা চোখের পানি ফেলছেন। কোনও কোনও মা শিশুকে কোলে নিয়ে হেলেদুলে কান্না থামাতে ব্যস্ত। কোনও মা শিশুকে খাওয়াচ্ছেন। কোনও কোনও শিশুর কষ্ট দেখে নীরবে কাঁদছেন।
বিশাল ওয়ার্ড কক্ষ ও বারান্দায় রোগী ভরা। তবে, শিশু রোগী হওয়ার কারণে অভিভাবকের সংখ্যা রোগী প্রতি ৩-৪ জন করে রয়েছেন। ফলে ওয়ার্ডটি জনাকীর্ণ। এ কারণে ওয়ার্ডে চিকিৎসক, নার্সসহ সবারই স্বাভাবিক চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। ভ্রাম্যমাণ এক্সরে মেশিন টেনে ওয়ার্ডের ভেতর নিতে রোগীর ওপর চাপ বাড়ে। জনাকীর্ণ পরিবেশে চিকিৎসকরা রোগীকে ঠিকমতো সময় নিয়ে দেখতে পারছেন না। ওয়ার্ডের ভেতর ও বেডের পাশাপাশি মেঝেতে রোগীর সারি। বারান্দায় হাঁটার মতোও জায়গা নেই।
কথা হয় তেরখাদা থেকে সাড়ে তিন বছরের মরিয়মকে নিয়ে হাসপাতালে আসা সাথীর সঙ্গে। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, চার দিন আগে হাম শনাক্ত হয়। এরপরই এই ওয়ার্ডে নিয়ে আসি। তাকে ৯ মাসের সময় হামের টিকা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ১৫ মাসের টিকা দেওয়া যায়নি। এরপর থেকে হামের টিকা দেওয়া হয়নি আমাদের এলাকায়।
তেরোখাদা থেকে ৯ মাসের সাফোয়ান নিয়ে হাসপাতালে আসা মা রেশমা আক্তার বলেন, ১ সপ্তাহ জ্বরে ভোগার পর দুদিন হলো হাম দেখা দেয়। তাই এই ওয়ার্ডে আনা হয়েছে। এখানে চিকিৎসা ব্যবস্থার বেহাল অবস্থা।
নড়াইলের কালিয়া থেকে ৯ মাসের রাজ্যকে নিয়ে এই ওয়ার্ডে আসা ঈদনী বলেন, ছয় দিন জ্বরে আক্রান্ত ছিল। এরপর হাম দেখা দেয়। এখানে এনে তিন দিনের চিকিৎসায় সুস্থ হয়েছে।
ওয়ার্ডের সিনিয়র নার্সরা জানান, আজ বেলা ১১টা পর্যন্ত ওয়ার্ডে ৩৮ রোগী ভর্তি ছিল।
খুলনা মেডিক্যাল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশুরা
এই ওয়ার্ডে রাউন্ডে থাকা চিকিৎসক সৈয়দা রোকসনা পারভীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া রোগীর ৯০ শতাংশই টিকা না নেওয়া। নির্দিষ্ট সময় ৯ মাস ও ১৫ মাসের সময় এসব রোগী হামের টিকা পায়নি। এ কারণেই এত প্রকোপ। আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি। সবাইকে বলছি সুস্থ হয়ে বাড়ি গিয়ে আগে টিকা নিতে।
খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মো. মুজিবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ইতিমধ্যে হামের টিকার লক্ষ্যমাত্রার শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। এখন খুঁজে খুঁজে টিকা দেওয়া হচ্ছে। তবে কোনও অসুস্থ শিশুকে টিকা দেওয়া হচ্ছে না। অসুস্থরা সুস্থ হলে এই টিকা পাবে।
তিনি বলেন, গত ১৫ মার্চ থেকে ১৯ মে পর্যন্ত খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় ১১৮ জন হাম রোগী পাওয়া গেছে। সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ৪৩২৯ জন। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩৯১২ জন। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৩৫০৬ জন। মারা গেছে ২১ জন। মৃতের মধ্যে রয়েছে কুষ্টিয়ার ১২ জন, খুলনার পাঁচ জন, ঝিনাইদহে দুজন, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরে একজন করে।


