Image description

রাজধানীর পল্লবীতে একটি শিশুকে নির্মমভাবে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় পুরো বাংলাদেশ যখন ক্ষোভে ফুঁসছে, তখন আরেক দিকে উন্মোচিত হচ্ছে এক নির্মম সত্য। শিশুদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি অন্ধকারের কোনো অপরিচিত মানুষ নয়, বরং নিজের ঘরের চেনা মানুষ।

ইউনিসেফের একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই হৃদয়বিদারক বাস্তব চিত্র।

আত্মীয়স্বজন এবং এমনকি খোদ বাবার মাধ্যমে যৌন নির্যাতনের ঘটনাগুলো অত্যন্ত উদ্বেগজনক হারে নীরবে সামনে আসছে। সামাজিক সংবেদনশীলতা এবং লোকলজ্জার ভয়ে এই নিষিদ্ধ বিষয়গুলো নিয়ে কেউ মুখ খোলে না। ফলে এই ভয়াবহ চক্র ভাঙা সম্ভব হচ্ছে না।

এই সংকটটি অত্যন্ত ব্যাপক এবং পরিসংখ্যানগতভাবে প্রমাণিত। ইউনিসেফের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে নয়জনই প্রতি মাসে তাদের নিজস্ব অভিভাবক বা যত্ন নেওয়া মানুষের হাতে সহিংস আচরণের শিকার হয়। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, শিশু সুরক্ষায় কিছু অগ্রগতি হলেও লাখ লাখ শিশুর জীবন এখনো সহিংসতা, নির্যাতন ও শোষণের বেড়াজালে বন্দী হয়ে আছে।

অন্ধকারের গল্প
নারী ও শিশু অধিকার রক্ষায় নিয়োজিত সংস্থাগুলোর নথিপত্র ঘাঁটলে এই নির্মম বাস্তবতার রূপটি স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।

ছয় ভাইবোন এবং মা-বাবার সঙ্গে একটি ঠাসাঠাসি এক কক্ষের ঘরে বড় হচ্ছিল একটি মেয়ে। সেখানে সবসময় বিশৃঙ্খলা লেগেই থাকত। গভীর রাতে তার বাবা প্রায়শই মাতাল অবস্থায় বাড়ি ফিরে মায়ের ওপর চিৎকার, গালিগালাজ ও নির্যাতন চালাত।

মেয়েটির বয়স যখন ১১ বছর, তখন এক চরম আতঙ্ক তার রাতের ঘুম কেড়ে নেয়। নিজের শরীরের সঙ্গে খুব খারাপ কিছু ঘটছে বুঝতে পেরে সে অবশেষে মায়ের কাছে মুখ খোলার সাহস করে।

মায়ের কাছ থেকে কোনো সুরক্ষা বা সান্ত্বনার বাণী পাওয়ার পরিবর্তে একটিমাত্র উত্তরে তার পুরো পৃথিবী চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। তার মা বলেছিল, ‘ছেলেরা এমনই করে।’

মায়ের এই একটি বাক্য মেয়েটির আশার সব দরজা বন্ধ করে দেয়। ঘরে নিজের ভয় প্রকাশ করার মতো কোনো জায়গা বা মানুষ না থাকায় তার ওপর এই নির্যাতন চলতেই থাকে এবং একপর্যায়ে শিশুটি গর্ভবতী হয়ে পড়ে। এই গোপন তথ্যটি জানাজানি হওয়ার পর তাকে কেবল নানার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

টাইমস অব বাংলাদেশের কাছে নিজের ট্রমার কথা তুলে ধরেন আরেকজন তরুণী। তখন তার বয়স ছিল মাত্র পাঁচ বা সাড়ে পাঁচ বছর। ‘দাদু’ বলে ডাকতেন এমন এক বয়স্ক ব্যক্তি তাকে প্রায়শই কোলে নিতেন এবং আদর করতেন। কিন্তু সেই পরিচিত স্নেহের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক অস্বস্তিকর স্পর্শ, যা সেই ছোট্ট শিশুর পক্ষে বোঝা সম্ভব ছিল না।

বিষয়টি সে হঠাৎ করেই বুঝতে পারে যখন তার এক খালাতো বা ফুফাতো বোন তাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে সতর্ক করে দেয়। সে বলেছিল, ‘ওই বুড়ো মানুষটা খারাপ’ এবং তাকে দূরে থাকার পরামর্শ দেয়।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই অস্পষ্ট স্মৃতিগুলো তীব্র যন্ত্রণাদায়ক রূপ নেয়, যা তার মনে নিজের প্রতি এক গভীর ঘৃণার জন্ম দেয়। সে সম্পূর্ণ একাকীত্ব ও নিভৃতে এই কষ্ট সহ্য করেছে।

সেই তরুণী জানান, ‘আমি আমার বাবাকে বলতে পারিনি কারণ তার কাছেও নিজেকে নিরাপদ মনে হতো না। সবচেয়ে কঠিন বিষয় ছিল এই সবকিছু একা একা সহ্য করা। আমি কাউকে বলতে পারছিলাম না। আমার শুধু মনে হতো আর কোনো মেয়েকে যেন এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।’

এক ‘বিকৃতির রাষ্ট্র’
বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির (বিএনডব্লিউএলএ) সাবেক সভাপতি সালমা আলী বলেন, ‘জাতি হিসেবে আমরা এখন এক বিকৃত অবস্থার মধ্যে রয়েছি। এটি আগেও ছিল, তবে এখন তা আরও বাড়ছে।’

তার কয়েক দশকের কাজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সালমা আলী ৩০ বছর আগের একটি ভয়াবহ মামলার কথা স্মরণ করেন, যেখানে একজন বাবা তার পাঁচ মেয়ের মধ্যে চারজনকেই নির্যাতন করেছিলেন। অন্য একটি ঘটনায় একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার প্রতিটি মেয়ে তাদের নিজের বাবার হাতেই নির্যাতনের শিকার হয়েছিল।

সালমা আলী উল্লেখ করেন, ‘ভাই, মামা, দাদা বা ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের মাধ্যমেও শিশু নির্যাতন ঘটে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে মা বিষয়টি জানতে পারলেও “ছেলেরা এমনই হয়” বলে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন।’

তিনি জানান, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের পেছনে প্রায়শই গভীর সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং মানসিক ব্যাধি কাজ করে।

তা ছাড়া এই অপরাধের বিচার চাইতে গেলে এক বিধ্বংসী মূল্য চোকাতে হয়। যেসব পরিবার মামলা করার সাহস দেখায়, তাদের প্রায়ই ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে হয়, চরম সামাজিক বর্জনের মুখোমুখি হতে হয় এবং বাইরের প্রচণ্ড চাপের মুখে নতি স্বীকার করতে হয়।

সালমা আলী জোর দিয়ে বলেন, ‘শিশু সুরক্ষার জন্য কেবল আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়; এর জন্য পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। একইসঙ্গে ভুক্তভোগীদের জন্য একটি নিরাপদ অভিযোগ ব্যবস্থা, কাউন্সেলিং এবং দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা নিশ্চিত করাও জরুরি।’

গভীর মানসিক ক্ষত
নির্যাতন বন্ধ হয়ে গেলেও এর মানসিক ট্রমা বা ধকল শেষ হয়ে যায় না। সাইকোলজিক্যাল হেলথ সেন্টারের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অয়ন রহমান ইমন বলেন, শৈশবের যৌন নির্যাতন মনে অত্যন্ত গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ক্ষত সৃষ্টি করে।

ভুক্তভোগীরা প্রায়শই অতীতের সেই ভয়াবহ স্মৃতি এবং দুঃস্বপ্নের দ্বারা তাড়িত হয়, যা সেই আতঙ্ককে মনের ভেতর বাঁচিয়ে রাখে।

তিনি বলেন, এই গভীর মানসিক ক্ষতির কারণে মানুষের শারীরিক স্পর্শের প্রতি তাদের মধ্যে এক তীব্র অস্বস্তি তৈরি হয়। এটি তাদের নিজের মা-বাবার প্রতিও অবিশ্বাসের জন্ম দিতে পারে।

ডা. ইমন জানান, বাবা এবং ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের মাধ্যমে শিশু নির্যাতনের ঘটনা ইদানীং বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই আশঙ্কাজনক বৃদ্ধির পেছনে তিনি অপসংস্কৃতির চাপ, পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ডেটিং অ্যাপের ব্যাপক প্রভাবকে দায়ী করেন।

এটি মোকাবিলা করার জন্য তিনি জরুরি সচেতনতার ওপর জোর দেন। শিশুদের দৃঢ় ও স্পষ্টভাবে ‘না’ বলা শেখাতে হবে এবং পরিবারগুলোকে এমন একটি নিরাপদ ও উন্মুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে একটি শিশু যে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা নির্দ্বিধায় ও সম্পূর্ণ নিরাপদে জানাতে পারে।

পিতৃতন্ত্রের শিকল ও সামাজিক কলঙ্ক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ মাহবুব কায়সার এই সংকটকে সরাসরি গভীর পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা যখন পিতৃতন্ত্রের কথা বলি, তখন নারীদের ঝুঁকির বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে ঘটনাটি পরিবারের ভেতরেই ঘটে। যদি বাবার মাধ্যমে এমন কিছু ঘটে, তবে মা তা চেপে রাখার চেষ্টা করেন। এর পেছনে সামাজিক সম্মান, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা এবং টিকে থাকার একটি হিসাব-নিকাশ কাজ করে।’

গোপন রাখাই একটি মেয়ের ভবিষ্যৎ বাঁচানোর একমাত্র উপায়–এমন বিশ্বাস থেকে পরিবারগুলো নীরবতা বেছে নেয়। ঘটনাটি আদালতে যাক বা অনানুষ্ঠানিক সালিসে মীমাংসা হোক, সামাজিক কলঙ্কের ভারী বোঝা সবসময় ভুক্তভোগী এবং তার পরিবারের ওপরই চেপে বসে।

তিনি উল্লেখ করেন, ঠিক এই কারণেই বহু নারী ও শিশু তাদের কষ্ট মনের গভীরে চেপে রাখতে বাধ্য হয়।

সামনের পথ
এই চক্র ভাঙার জন্য ইউনিসেফ জোর দিয়ে বলে, অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করা অত্যন্ত জরুরি। আন্তর্জাতিক এই সংস্থাটি বিদ্যমান ত্রুটিগুলো সংশোধনের জন্য জরুরি সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছে। তারা শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি সহজ ও সংক্ষিপ্ত অভিযোগ প্রক্রিয়ার দাবি জানিয়েছে।

প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে সম্পূর্ণ শিশুবান্ধব পুলিশ ও বিচার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যার পেছনে শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা এবং কার্যকর সমাজসেবামূলক কার্যক্রমের সমর্থন থাকবে।

পরিশেষে সংস্থাটি জোর দিয়ে বলেছে, নারী ও শিশু উভয়ের জন্য সহজলভ্য মানসিক ও সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করা না গেলে এই পদ্ধতিগত পরিবর্তনের কোনোটিই সফল হতে পারবে না।