Image description
 

ইউরোপজুড়ে দ্রুত কমে যাচ্ছে ভূ-পৃষ্ঠ ও ভূগর্ভস্থ পানির মজুত। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন (ইউসিএল) ও ওয়াটারশেড ইনভেস্টিগেশনসের বিজ্ঞানীরা ২০০২–২০২৪ সাল পর্যন্ত উপগ্রহের মহাকর্ষীয় তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, দক্ষিণ ও মধ্য ইউরোপ— স্পেন, ইতালি, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, জার্মানি থেকে শুরু করে রোমানিয়া ও ইউক্রেন পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চল মারাত্মকভাবে শুকিয়ে যাচ্ছে। কিছু অঞ্চলসহ যুক্তরাজ্যের পূর্বাংশেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

শনিবার (২৯ নভেম্বর) দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

স্যাটেলাইট তথ্যে দেখা গেছে, উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম ইউরোপ— বিশেষ করে স্ক্যান্ডিনেভিয়া ও যুক্তরাজ্যের কিছু এলাকা ক্রমশ ভিজে উঠছে। অন্যদিকে দক্ষিণ ইউরোপ দ্রুত পানি হারাচ্ছে। গবেষকরা বলছেন, এ পরিবর্তন স্পষ্টভাবে জলবায়ু বিপর্যয়েরই প্রতিফলন।

 

ইউসিএলের পানি সংকট বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোহাম্মদ শামসুদ্দোহা বলেন, আমরা এখন ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতা সীমার কথা বলি না; পৃথিবী ২ ডিগ্রির দিকে এগোচ্ছে, আর এই পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব আমরা এখনই দেখছি।

 
 

ডক্টরাল গবেষক আরিফিন জানান, ভূগর্ভস্থ পানির প্রবণতাও মোট পানির প্রবণতার মতোই নিচের দিকে নামছে। অর্থাৎ, ইউরোপের লুকানো পানির ভাণ্ডারও দ্রুত কমে যাচ্ছে।

 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যে পরিস্থিতি দুই রকম দেখা গিয়েছে। এর মধ্যে পশ্চিমে ভিজে উঠছে, আর পূর্বাঞ্চল শুকিয়ে যাচ্ছে। যদিও মোট বৃষ্টিপাত কিছুটা স্থির বা সামান্য বেড়েছে, কিন্তু বৃষ্টির ধরন বদলে গেছে: ভারী বর্ষণ ও দীর্ঘ শুকনো সময়ের সংখ্যা বাড়ছে। এতে গ্রীষ্মে পানির বেশিরভাগ অংশ দ্রুত বয়ে যাচ্ছে, আর শীতের ভূগর্ভস্থ পানি পুনরায় পূরণের মৌসুম ছোট হয়ে যাচ্ছে। দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ডে ৭০ শতাংশ পানীয় জল আসে ভূগর্ভস্থ পানি থেকে। ফলে সেখানে এই পরিবর্তন বিশেষ উদ্বেগজনক।

ইউরোপীয় পরিবেশ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০০০-২০২২ সালে মোট পানি উত্তোলন কিছুটা কমলেও ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন ৬ শতাংশ বেড়েছে। কৃষি ও জনসাধারণের পানির চাহিদাই এ বৃদ্ধির প্রধান কারণ। ২০২২ সালে ইইউজুড়ে ৬২ শতাংশ পাবলিক পানি সরবরাহ ও ৩৩ শতাংশ কৃষি খাতের পানি এসেছে ভূগর্ভস্থ মজুত থেকে।

ইউরোপীয় কমিশন বলছে, তাদের নতুন ‘ওয়াটার রেজিলিয়েন্স স্ট্র্যাটেজি’ সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। ২০৩০ সালের মধ্যে পানির দক্ষতা কমপক্ষে ১০ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্য রাখা হয়েছে।

হাইড্রোলজি বিশেষজ্ঞ হান্না ক্লোক জানান, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হলে আগামী বসন্ত ও গ্রীষ্মে ইংল্যান্ডে কঠোর পানি সংকট দেখা দিতে পারে। পরিবেশ সংস্থা ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে যে, যথেষ্ট শীতকালীন বৃষ্টি না হলে ২০২৬ সাল পর্যন্ত খরা চলতে পারে।

তিনি বলেন, সংকট মোকাবিলায় বড় রিজার্ভার নির্মাণের প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়। বরং এখনই পানি পুনর্ব্যবহার, কম পানি ব্যবহার, প্রকৃতি-নির্ভর সমাধান এবং পানি ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের দিকে দ্রুত এগোতে হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্পেনসহ দক্ষিণ ইউরোপের পানির সংকট যুক্তরাজ্যের খাদ্য আমদানিকেও সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে। পরিবেশ পরিবর্তনের যে প্রভাব এতদিন দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে চোখে পড়ত, তা এখন ইউরোপেও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।

এতে আরও বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া, আমেরিকা, কানাডা এমনকি গ্রিনল্যান্ড ও আইসল্যান্ডেও গুরুতর শুষ্কতা দেখা যাচ্ছে। ইরানের রাজধানী তেহরানে তো ‘ডে জিরো’ তথা কল খুললে পানি পাওয়া যাবে না এমন দিন ঘনিয়ে আসছে।