Image description
 

বাংলাদেশ ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ। দেশের পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম ও রংপুর অঞ্চল তিনটি সক্রিয় ফল্ট লাইনের ওপর অবস্থান করায় ভূমিকম্পের ঝুঁকি প্রতিনিয়ত বাড়ছে। দেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ভবন নির্মাণে নিয়ম না মানা এবং দুর্বল অবকাঠামো- এইসব কারণে যেকোনো বড় ভূমিকম্প মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে প্রাথমিক সতর্কতা, যাকে আন্তর্জাতিকভাবে আরলি ওয়ার্নিং বলা হয়, বাংলাদেশে জীবন ও সম্পদ রক্ষার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে উঠছে।

 

বাংলাদেশ কেন অতি ঝুঁকিপূর্ণ দেশ

বাংলাদেশ তিনটি প্রধান সক্রিয় ফল্ট লাইনের ওপর অবস্থিত ১) মেঘনা ফল্ট, ২) ডাউকি ফল্ট, ৩) চট্টগ্রাম-টেকনাফ স্লিপ ফল্ট। বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই ফল্টগুলো দীর্ঘদিন ধরে চাপে রয়েছে এবং যেকোনো সময় ৭.৫ থেকে ৮.৫ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ঢাকা বিশ্বে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ মহানগরীর মধ্যে অন্যতম হিসেবে বিবেচিত। জাতিসংঘ দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস কার্যালয় (ইউএন-ডি-আর-আর) বলেছে-‘প্রতিটি দেশ দুর্যোগ শনাক্ত করতে যত দ্রুত সক্ষম হবে, তার ক্ষতি তত কম হবে।’ বিশ্বব্যাপী পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শক্তিশালী ভূমিকম্পে মৃত্যুর ৮০ শতাংশই ঘটে ভবন ধসে পড়ার কারণে। অর্থাৎ নিরাপদ নির্মাণ এবং প্রাথমিক সতর্কতা-উভয়ই জীবনরক্ষার প্রধান অস্ত্র।

 

দেশে ভূমিকম্পের প্রাথমিক সতর্কতা ও বাস্তব সক্ষমতা

 

বাংলাদেশ সরকার গত এক দশকে ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের অধীনে বর্তমানে উনিশটি সিসমিক মনিটরিং কেন্দ্র কাজ করছে, যেগুলো ভূকম্পনের মাত্রা, গভীরতা, উৎস এবং কম্পন-তরঙ্গ তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করে।
১. কম্পন তরঙ্গ শনাক্তকরণ (পি-ওয়েভ ও এস-ওয়েভ পদ্ধতি) : ভূমিকম্পের প্রথম কম-ধ্বংসাত্মক কম্পনকে বলা হয় পি-ওয়েভ (প্রীমারি ওয়েভ), যা সাধারণত ক্ষতি করে না। এর কয়েক সেকেন্ড পরে আসে এস-ওয়েভ (সেকেন্ডারি ওয়েভ)- যা ভবন ধস, সেতু ভেঙে পড়া এবং ভয়াবহ ক্ষতির মূল কারণ। জাপান, মেক্সিকো, চিলি ও যুক্তরাষ্ট্রে এই পি-ওয়েভ শনাক্ত হওয়ার পরপরই শহরে সাইরেন বাজানো, মোবাইলে সতর্কবার্তা পাঠানো এবং ট্রেন-মেট্রো থামিয়ে দেওয়ার প্রযুক্তি চালু আছে। বাংলাদেশে এটি এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু না হলেও পি-ওয়েভ শনাক্তের মৌলিক সক্ষমতা তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যতে জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ সময় দেবে।
২. রিয়েল-টাইম ডেটা ব্যবস্থা :  সিসমিক সেন্সর প্রতি সেকেন্ডে তথ্য পাঠায় এবং কেন্দ্রীয় সার্ভার তা বিশ্লেষণ করে। এটি ভূমিকম্প-পরবর্তী জরুরি প্রতিক্রিয়া (ইমার্জেন্সি রেসপন্স) দ্রুত করতে সাহায্য করে।
৩. ভূ-তাত্ত্বিক মানচিত্র (জিআইএস ঝুঁকিম্যাপ) :  ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রামের জন্য জিআইএসভিত্তিক ভূমিকম্প ঝুঁকিম্যাপ তৈরি করা হয়েছে। এতে দেখানো হয়- কোনো এলাকায় মাটির ধরন দুর্বল, কোথায় ভবনের ঘনত্ব অত্যধিক, কোনো এলাকায় ধসের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এই মানচিত্র অনুসরণ করলে উদ্ধার ও উদ্ধার-পরবর্তী পরিকল্পনা অনেক সহজ হয়।
৪. মোবাইল সতর্কবার্তা ব্যবস্থা (পরিকল্পনাধীন) : সরকার ভূমিকম্প শনাক্ত হওয়া মাত্র মোবাইল বার্তা (মোবাইল অ্যালার্ট) পাঠানো, সাইরেন বাজানো ও গণপরিবহন থামানো, বিদ্যুৎলাইন ও গ্যাসলাইন নিরাপদ অবস্থায় নিয়ে যাওয়া ব্যবস্থা গ্রহণ করতে যাচ্ছে। এই মডেলটি জাপানের ‘কোকুমিন হি-সাই অ্যালার্ট’-এর আদলে প্রস্তুত হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট  

১. বিশ্বব্যাংক (ওয়ার্ল্ড ব্যাংক) : বিশ্বব্যাংকের দুর্যোগ প্রস্তুতি প্রকল্প অনুযায়ী- খরচের প্রতি ১ টাকা আগাম প্রস্তুতিতে খরচ হলে, দুর্যোগে ক্ষতি কমে ৭-১০ টাকা পর্যন্ত। বাংলাদেশে ‘রেজিলিয়েন্স প্রকল্প’ ইতোমধ্যে সেতু, স্কুল ভবন, হাসপাতাল ও সিটি করপোরেশনের অবকাঠামো শক্তিশালীকরণে সহায়তা দিয়েছে।
২. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউ-এইচ-ও) :  সংস্থাটি বলেছে- ভূমিকম্পে মৃত্যুর ৪০ শতাংশই চিকিৎসা বিলম্ব, অ্যাম্বুলেন্স-ব্যর্থতা এবং হাসপাতালের প্রস্তুতি না থাকার কারণে হয়। এ কারণে ডব্লিউ-এইচ-ও বাংলাদেশে ‘হসপিটাল প্রিপেয়ার্ডনেস গাইডলাইন’ চালু করেছে।
৩. বিশ্ব খাদ্য সংস্থা (ডব্লিউ-এফ-পি) : ডব্লিউ-এফ-পি জরুরি খাদ্য মজুদ, ড্রোন-মানচিত্র এবং ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নে বাংলাদেশকে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে।
৪. বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউ-টিও) :  ডব্লিউ-টিও বলেছে- প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর্থিকভাবে সবচেয়ে বেশি আঘাত হানে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর। ফলে দুর্যোগ প্রতিরোধে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থাকে তারা দেশগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক সক্ষমতা হিসেবে দেখছে।
৫. জাতিসংঘ মহাসচিবের মন্তব্য :  জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস (বাংলা উচ্চারণ: আন্তোনিও গুতেরেস) বলেছেন- ‘আগাম সতর্কতা মানুষকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রযুক্তি। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের কাছে একটি আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা পৌঁছে দিতে হবে।’ বাংলাদেশ জাতিসংঘের এই ঘোষণার অন্যতম অগ্রগামী সদস্য।

বাংলাদেশের নানা সমস্যা 

১. ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড মানা হয় না : বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড (বি-এন-বি-সি) কঠোর হলেও বাস্তবায়ন দুর্বল।
২. পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন :  ঢাকায় অন্তত এক লাখের বেশি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ।
৩. সংকীর্ণ রাস্তা ও দমকলের সীমাবদ্ধতা :  ঢাকার অধিকাংশ এলাকায় বড় গাড়ি বা উদ্ধারযান প্রবেশ করতে পারে না।
৪. জনগণের সচেতনতা কম :  ‘ড্রপ-কভার-হোল্ড’ পদ্ধতি অধিকাংশ মানুষ জানে না।
৫. প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক কম:  বহু এলাকায় উদ্ধার কার্যক্রমে যথেষ্ট জনবল নেই।

প্রাথমিক সতর্কতা বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় সুপারিশ
১. জাতীয় ভূমিকম্প সতর্কতা কেন্দ্র স্থাপন : সিসমিক স্টেশনগুলোর তথ্য একক সার্ভারে এনে ৫ সেকেন্ডের মধ্যে সতর্কতা প্রচার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
২. মোবাইল অ্যালার্ট বাধ্যতামূলক : সব সিম-গ্রাহককে বিনামূল্যে জরুরি সতর্কবার্তা পাঠানোর সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
৩. স্কুল ও অফিসে মাসিক ড্রিল বাধ্যতামূলক : জাপানের মতো স্কুল-কলেজ, ব্যাংক, শপিংমল ও সরকারি অফিসে ড্রিল করানো হলে মৃত্যু ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে।
৪. বিল্ডিং কোড কঠোর বাস্তবায়ন : নতুন নির্মাণে ভূমিকম্প সহনীয় নকশা নিশ্চিত করতে হবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবন পর্যায়ক্রমে ভেঙে পুনর্নির্মাণ করতে হবে।
৫. ভূমিকম্প-বীমা চালু : মানুষকে আর্থিক সুরক্ষার জন্য সরকার-সমর্থিত বীমা মডেল চালু করতে হবে।

বাস্তবসম্মত অর্থায়ন-মডেল 
(ফান্ডিং মডেল) 

১. দুর্যোগ প্রস্তুতি করপোরেশন (সিডি-সি মডেল) : বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ অনুযায়ী ‘কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন’-এর মতো একটি জাতীয় বিশেষ তহবিল তৈরি করা যেতে পারে।
২. আন্তর্জাতিক সহায়তা তহবিল : ডব্লিউ-এফ-পি, ডব্লিউ-এইচ-ও, এ-ডি-বি, জাইকা এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির যৌথ তহবিল।
৩. নগর উন্নয়ন বন্ড : ভূমিকম্প প্রতিরোধে সিটি করপোরেশন ‘রিস্ক-রিডাকশন বন্ড’ ইস্যু করতে পারে।
৪. সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি মডেল) : অফিস টাওয়ার, হাসপাতাল, স্কুল ভবন প্রতিরোধযোগ্য করার জন্য সহযোগিতা চুক্তি।
ভূমিকম্প সময় জানিয়ে আসে না। কিন্তু তার আগমনের আগে কিছু সংকেত প্রযুক্তি শনাক্ত করতে পারে-এটাই প্রাথমিক সতর্কতার শক্তি। আধুনিক পৃথিবী এখন আগাম সতর্কতার ওপর ভর করে কোটি কোটি মানুষের প্রাণ বাঁচাচ্ছে। বাংলাদেশও সেই পথেই এগোচ্ছে। আমাদের দেশে প্রযুক্তির অগ্রগতি, সিসমিক নেটওয়ার্ক শক্তিশালীকরণ, সচেতনতা বৃদ্ধি, ভবন নিরাপত্তা এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া- এইসবই ভবিষ্যৎ দুর্যোগ রোধের মূল চাবিকাঠি।
প্রাথমিক সতর্কতা শুধু একটি প্রযুক্তি নয়- এটি জীবন রক্ষার সবচেয়ে আধুনিক, কার্যকর ও মানবিক ব্যবস্থা। বাংলাদেশের জন্য এর গুরুত্ব আজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
* বিশ্বব্যাংক দুর্যোগ প্রস্তুতি প্রতিবেদন
* বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘হসপিটাল প্রিপেয়ার্ডনেস গাইডলাইন’
* বিশ্ব খাদ্য সংস্থা ‘ইমার্জেন্সি রেসপন্স রিপোর্ট’
* জাতিসংঘ দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস কার্যালয় (ইউ-এন-ডি-আর-আর)
* জাতিসংঘ মহাসচিবের দুর্যোগ ঝুঁকি সম্পর্কিত ভাষণ
* জাইকা বাংলাদেশ ভূমিকম্প ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রকল্প
লেখক : ব্যাংক কর্মকর্তা