Image description

সিএনএনের বিশ্লেষণ 

 

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণের উপায় খুঁজছেন। আপাতদৃষ্টিতে দুই পক্ষ বিষয়গুলো নিয়ে সাধারণ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। বাস্তবে, ওয়াশিংটন ও তেহরান সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি মানসিকতা নিয়ে আলোচনার টেবিলে রয়েছে। 

যুক্তরাষ্ট্র এই আলোচনাকে দেখছে ক্ষমতার চোখ দিয়ে, আর ইরান দেখছে নিয়ন্ত্রণে রাখার মানসিকতা থেকে। ওয়াশিংটন চায় অর্থনৈতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে তেহরানকে নতিস্বীকার করাতে। অপরদিকে, ইরানের লক্ষ্য হলো মূল্যবান কিছু নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে তা ফেরত না দেওয়ার মাধ্যমে উল্টো যুক্তরাষ্ট্রকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে।

বাস্তবতা হলো–জিম্মি সংকট ক্ষমতার ভারসাম্যকে ভেঙে দেয়। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশের কূটনীতিক হিসেবেও টেবিলে ইরানের এই কৌশলের কাছে মার্কিন কর্মকর্তাদের অসহায় থাকতে হয়েছে। কারণ, তেহরান এমন কিছু নিজেদের দখলে রেখেছে, যা ওয়াশিংটন ফেরত চায়। নির্দিষ্ট মূল্য পরিশোধ করে জিম্মি উদ্ধার ছাড়া ওয়াশিংটনের আর কোনো বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে সময় সর্বদা ইরানের পক্ষে কাজ করে, কারণ তারা তাড়াহুড়ো না করে চাপ বাড়ার জন্য অপেক্ষা করে। 

২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে এভিন কারাগার থেকে পাঁচ মার্কিন নাগরিকের মুক্তির বিনিময়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় আটকে থাকা ইরানের ৬০০ কোটি ডলার কাতারে স্থানান্তর করতে সম্মত হয় যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েলে হামলার পর ওয়াশিংটন আবারও সেই অর্থ ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করে দেয়, যা আজও বহাল।

একই কৌশলের বড় প্রয়োগ, জিম্মি বিশ্ব অর্থনীতি 
বর্তমানে ইরান একই কৌশল আরও বড় পরিসরে প্রয়োগ করেছে। এবার তাদের জিম্মি কোনো মার্কিন নাগরিক নয়, বরং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ধমনি ‘হরমুজ প্রণালি’। বিশ্ব খনিজ তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ভয় দেখিয়ে এবং নিজস্ব কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এটি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। তেহরানের চোখে, হরমুজ প্রণালি এখন তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে মূল্যবান জিম্মি।

সম্প্রতি ইরানের সামরিক উপদেষ্টা মহসেন রেজাই এক সাক্ষাৎকারে জানান, ওয়াশিংটন যতক্ষণ না তাদের অবরুদ্ধ করে রাখা ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলার ফেরত দেবে, ততক্ষণ এই প্রণালি বন্ধই থাকবে। এই অর্থের মধ্যে ২০২৩ সালের সেই ৬০০ কোটি ডলারও রয়েছে। অর্থাৎ, ইরানের কাছে বর্তমান আলোচনাটি আরেকটি জিম্মি চুক্তি, যেখানে এবার জিম্মি খোদ বিশ্ব অর্থনীতি এবং দাবির অঙ্ক চার গুণ বড়। 

মার্কিন চাপের সীমাবদ্ধতা 
ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বন্দরগুলো অবরোধ করে তেল রপ্তানি বন্ধের মাধ্যমে তেহরানের ওপর প্রচণ্ড অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছে। ফলে ইরান তীব্র মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব ঘাটতিতে পড়ে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে রয়েছে। কিন্তু তেহরানের কট্টরপন্থি নেতৃত্ব জনগণের এই অর্থনৈতিক কষ্টকে পরোয়া করে না।

সামরিকভাবে হরমুজ প্রণালি মুক্ত করার মার্কিন চেষ্টাও মুখ থুবড়ে পড়েছে। ট্রাম্প যদি আবারও সামরিক পথ বেছে নেন, তবে ইরানের পক্ষ থেকে যুদ্ধ আরও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। মহসেন রেজাইয়ের মতে, অবরোধ না তুললে তারা যুদ্ধকে ভারত মহাসাগর, বাব আল-মান্দেব প্রণালি এবং লোহিত সাগরে টেনে নিয়ে যাবে। অর্থাৎ, তারা আরও নতুন জিম্মি তৈরি করবে। 

ওয়াশিংটনের সামনে তিনটি পথ 
এই কারণে আলোচনা এখন পুরোপুরি স্থবির। ওয়াশিংটনের সামনে এখন তিনটি পথ খোলা রয়েছে। প্রথম পথ হলো ধৈর্য ধরা। অর্থাৎ বিশ্ববাজারের সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ এবং তেলের দাম বাড়ার ধাক্কা সহ্য করে ইরানের অভ্যন্তরীণ ভাঙনের জন্য দীর্ঘকাল অপেক্ষা করা। দ্বিতীয় পথ নতিস্বীকার করা। অর্থাৎ ট্রাম্পের জন্য প্রচণ্ড অবমাননাকর হলেও, ইরানকে কোটি কোটি ডলার দিয়ে পূর্বাবস্থায় ফিরে যাওয়া। আর তৃতীয় উপায় হলো আবারও সর্বাত্মক যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাওয়া।

অন্যদিকে, ইরানের ক্ষেত্রে হিসাবটি আরও সোজা, মূল্যবান সম্পদটি দখলে রাখো এবং অপেক্ষা করো। যতক্ষণ না এই সমীকরণের পরিবর্তন ঘটবে, ততক্ষণ ইরান সহজে হাল ছাড়বে না। দুই পক্ষ ছাড় না দিলে আলোচনাও এ অচলাবস্থায় আটকে থাকবে।