Image description

ফ্রান্সে অনিয়মিত অবস্থায় থাকা ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে বিবেচিত বিদেশিদের প্রশাসনিক আটক কেন্দ্রে (সিআরএ) রাখার সময়সীমা বাড়ানোর একটি বিল অনুমোদন দিয়েছে দেশটির সংসদ।

 

ফ্রান্সের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির পর গত বুধবার উচ্চকক্ষ সিনেটও সিনেটে ভোটাভুটির মাধ্যমে বিলটি পাস হয়। দুই সপ্তাহ আগে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতেও বিলটি অনুমোদিত হয়েছিল।

 

যদিও দুই কক্ষের অনুমোদিত সংস্করণের মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। ফলে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে সংসদ সদস্য ও সিনেটরদের নিয়ে একটি যৌথ কমিশন গঠন করা হবে বলে জানানো হয়েছে।

 

প্রস্তাবিত এই আইনের আওতায় ফরাসি ভূখণ্ড ছাড়ার নির্দেশ পাওয়া এবং জননিরাপত্তার জন্য ‘বাস্তব, বর্তমান ও গুরুতর’ হুমকি হিসেবে বিবেচিত বিদেশিদের প্রশাসনিক আটকের সর্বোচ্চ সময়সীমা সাত মাস বা ২১০ দিন পর্যন্ত বাড়ানো হবে।

 

বর্তমানে ফ্রান্সে প্রশাসনিক আটকের সর্বোচ্চ সময়সীমা ৯০ দিন। আর সন্ত্রাসবাদে দণ্ডিত বিদেশিদের ক্ষেত্রে তা ১৮০ দিন পর্যন্ত। নতুন এই আইনের মাধ্যমে সেই সময়সীমাও বাড়িয়ে ২১০ দিন করা হবে।

 

তবে এই বিশেষ বিধানের আওতায় কারা পড়বেন, সেটি নিয়ে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি ও সিনেটের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।

 

সরকার ও ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির সংসদ সদস্যরা চান, যেসব বিদেশি ব্যক্তির বিরুদ্ধে ‘কারও ওপর হামলা’র মতো অপরাধে অন্তত তিন বছরের কারাদণ্ড হয়েছে, তাদের এই আইনের আওতায় আনা হোক। অন্যদিকে সিনেট ‘অনুপাতিকতা’ বজায় রাখার কথা বলে কেবল গুরুতর অপরাধ ও এমন কিছু অপরাধকে অন্তর্ভুক্ত করতে চায়, যেগুলোর শাস্তি কমপক্ষে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড।

 

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরো ন্যুনেজ এই আইনের ‘প্রয়োজনীয়তা’ তুলে ধরে বলেছেন, ২০১৭ সাল থেকে ফ্রান্সে ৩৪টি সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে এবং ‘‘এসব ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়া আমাদের দায়িত্ব৷’’

 

সিনেট আরও একটি বিধান যুক্ত করেছে, যাতে একই ব্যক্তিকে বারবার প্রশাসনিক আটকে রাখার ক্ষেত্রে মোট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। সাধারণ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩৬০ দিন এবং বিশেষ বিধানে ৫৪০ দিন পর্যন্ত আটক রাখা যাবে।

 

বিলে সন্ত্রাসবাদবিরোধী আরও কিছু ব্যবস্থা রাখা হয়েছে৷ এর মধ্যে রয়েছে আচরণগত সমস্যাযুক্ত উগ্রপন্থি ব্যক্তিদের জন্য ‘মনোরোগ পরীক্ষার নির্দেশনা’ চালুর প্রস্তাব।

আটকের সময় যত বাড়ে, বহিষ্কার তত কম হয়

ফ্রান্সের প্রশাসনিক আটক কেন্দ্র বা সিআরএ নিয়ে বিতর্ক নতুন করে সামনে আসে ২০২৪ সালে শিক্ষার্থী ফিলিপিন হত্যাকাণ্ডের পর। এ ঘটনায় মরক্কোর সন্দেহভাজন এক নাগরিককে ঘটনার ঠিক আগে সিআরএ থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে ফ্রান্স ছাড়ার আইনি নির্দেশও ছিল।

 

ফ্রান্সে অনিয়মিত অবস্থায় থাকা বিদেশিদের বহিষ্কারের ঝুঁকি এড়াতে প্রশাসনিক আটক কেন্দ্রে রাখা হয়।

 

তবে বামপন্থি দলগুলো পুরো বিলটির তীব্র সমালোচনা করেছে। তাদের অভিযোগ, এটি ‘নিরাপত্তাকেন্দ্রিক অতিরঞ্জন’।

 

ফরাসি সোশ্যালিস্ট পার্টির (পিএস) সিনেটর ক্রিস্তফ শাইয়ু বলেছেন, আটকের সময় অনির্দিষ্টভাবে বাড়ালেই যে বহিষ্কার কার্যকরভাবে বাড়বে, তা নয়।

 

অন্যদিকে রিপাবলিকান (এলআর) দলের সিনেটর ও বিলটির প্রতিবেদক এরভে রেনো বলেছেন, ‘প্রশাসনিক আটকই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি। নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি এমন বিদেশিদের বহিষ্কার করতে চাইলে কিছু মাত্রার কঠোরতা মেনে নিতে হবে।’

 

গত মঙ্গলবার লা সিমাদসহ কয়েকটি মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ফ্রান্সের মূল ভূখণ্ডে প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ বিদেশিকে সিআরএতে আটক রাখা হয়েছে। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ২২৮।

 

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিদের ৬০ শতাংশের বেশি শেষ পর্যন্ত মুক্তি পেয়েছেন, ‘মূলত আদালতের সিদ্ধান্তের কারণে।’

 

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, সিআরএগুলো মূলত আটকে রাখার জায়গায় পরিণত হয়েছে। দ্রুত বহিষ্কারের যে মূল উদ্দেশ্যে এগুলো তৈরি হয়েছিল, তা আর কার্যকর থাকছে না।

 

তাদের ভাষায়, ‘যত বেশি সময় ধরে আটক রাখা হয়, বহিষ্কার কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা তত কমে যায়।’

 

সূত্র : ইনফোমাইগ্র্যান্টস