Image description

বয়স তার কাছে একটি সংখ্যা মাত্র। শিশুদের কাছে গেলে তিনি হয়ে ওঠেন আরও প্রাণবন্ত। শিশুদের মাঝেই জীবনের এক মানে খুঁজে পেয়েছেন তিনি। তাদেরকে বিকশিত করার সুযোগ করে দিলেই জীবন হয় ধন্য।

৭৮ বছর বয়সী এই মানুষটির নাম লুৎফর রহমান। বাড়ি গাইবান্ধা সদর উপজেলার গিদারী ইউনিয়নের বাগুড়িয়া গ্রামের পাশে ব্রহ্মপুত্র নদীর একটি বাঁধে তার আবাস। তিনি তার কর্মের মধ্য দিয়ে পৌঁছে গেছেন অনন্য উচ্চতায়।

প্রায় ৫২ বছর ধরে গ্রামে ঘুরে ঘুরে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন তিনি। এজন্য সম্মানি হিসেবে নেন না নেওয়ার মতোই, দিনে কেবল এক টাকা।

এই সময়ে ব্রহ্মপুত্র, তিস্তায় গড়িয়েছে অনেক জল। জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে অনেক, মূল্য হারিয়েছে মুদ্রা। কিন্তু লুৎফর এক টাকাকে কখনো দুই টাকা করেননি। এজন্য তিনি এলাকায় ‘এক টাকার মাস্টার’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন ।

ছবি: টাইমস

লুৎফর রহমানের জন্ম ১৯৪৮ সালে জেলার ফুলছড়ি উপজেলার উড়িয়া গ্রামের এক ধনাঢ্য পরিবারে। বাবার নাম ফইমুদ্দিন ব্যাপারী।

ফুলছড়ি উপজেলার গুনভরী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৭২ সালে এসএসসি পাস করার পর পরিবারে নেমে আসে দুর্যোগ। ১৯৭৪ সালে ব্রহ্মপুত্র নদীর ভাঙনে সর্বস্বান্ত হয়ে যান বাবা। অর্থাভাবের লুৎফরের পড়াশোনা করতে পারেননি। তখন থেকে তিনি নদী পাড়ের সুবিধাবঞ্চিত ছেলে-মেয়েদের পড়ানো শুরু করেন। সেই অভ্যাস এখনও ছাড়েননি।

নদী ভাঙনের নিঃস্ব হওয়ার পর তার আশ্রয় হয় গাইবান্ধার সদর উপজেলার গিদারী ইউনিয়নের ওয়াপদা বাঁধে আশ্রয় নেন।

মের মাঝামাঝি সময়ে বিকাল সাড়ে ৪টা। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটির ঘণ্টা বেজে গেছে আরও আধা ঘণ্টা আগেই। কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের মোদনেপাড়া গ্রামের এক বাড়ির উঠান থেকে তখনও শব্দ আসছে ‘আয় ছেলেরা আয় মেয়েরা’। সেই বাড়িতে ঢুকে দেখা যায়, ২০ থেকে ২৫ জন শিক্ষার্থী এক সঙ্গে গোল হয়ে পড়ছে ‘এক টাকার মাস্টারের’ কাছে।

অনেক অবিভাবক সেখানে অপেক্ষা করছিলেন। প্রায় দেড় ঘণ্টা পড়া শেষে সবাই এক টাকা করে দিচ্ছেন লুৎফর রহমানকে হিসেবে।

স্থানীয়রা লুৎফরকে একজন ‘সাদা মনের মানুষ’ হিসেবেই দেখেন। এলাকার কিছু সংগঠন এমন পদকও দিয়েছে।

অভিভাবক মর্জিনা বেওয়া বলেন, ‘এক টাকার মাস্টারের কাছে আমার ছেলে-মেয়ে পড়ছে। এখন আমার নাতিরা পড়ে।’

‘সবার উন্নতি হলেও মাস্টারের জীবনের কোনো উন্নতি হয়নি’ শিক্ষক লুৎফরের জন্য সহানুভূমিও ঝরে পড়ে তার কণ্ঠে।

ছবি: টাইমস

অবিভাবক নামজা বেওয়া বলেন, ‘আমার ছয় মেয়েই এই স্যারের কাছে পড়ছে। তখন অনেক অভাব-অনটন ছিল। এখন আমার একটা মেয়ে মাস্টারি করে, একটা বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করে। শুধু আমারই না অন্যান্য মানুষের অনেকে ছেলে-মেয়ে স্যারের কাছে পড়ে মানুষ হয়েছে।’

সাবেক ছাত্র আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘আমার বয়স ৪০ বছর। আমার চেয়ে যাদের বয়স ১৫-১৬ বছর বেশি, তারাও নাকি স্যারের কাছে পড়েছেন।

‘স্যারের অনেক ছাত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু স্যার জীবনে কিছুই করতে পারে নাই’, তিনিও আক্ষেপ করলেন ছোট বেলার শিক্ষকের জন্য।

আরেক ছাত্র সৌরভ মিয়া বলেন, ‘ওনার চাহিদা টাকা না, মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে গ্রামের দরিদ্র শিশু বাচ্চারা যেন পড়াশোনার লাইনে থাকে।’

‘শিশুদের মারধর করে না আদর আর স্নেহ ভালোবাসা দিয়ে পড়ার তিনি,’ বলছিলেন এই শিক্ষকের বড় ছেলে লাবলু মিয়া।

তিনি বলেন, ‘অনেকদিন আমাদের না খেয়েও থাকতে হয়েছে। এখন আমার দুই ভাই ভালো রোজগার করি, বাবাকে মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরাতে নিষেধ করি, কিন্তু তিনি আমাদের কথা শোনেন না। পড়ানোই তার নেশা।’

ছবি: টাইমস

লুৎফর রহমান পুরনো দিনের ঝাঁপি খুলে বসলেন। টাইমসকে বললেন, ‘সে সময় ১০ ছাত্রকে পডিয়ে দশ টাকা পেয়েছি। সে টাকা দিয়ে বাজারে অনেক কিছু পাওয়া যেত।”

পরে এই পেশার মাঝেই আত্মতৃপ্তি খুঁজে পান এবং অন্য কোনো পেশার কথা কখনও চিন্তা করেননি, টাকার কথাও ভাবেননি।

লুৎফর বরলেন, “এই এলাকার বেশিরভাগ মানুষই গরিব। আমি টাকার জন্য পড়াই না। আমি পড়াই যাতে ছেলে-মেয়েরা শিক্ষিত হয়ে দেশের সম্পদে পরিণত হয়। পিতা-মাতার মুখে হাসি ফুটাতে পারে।”

হাজার হাজার ছেলে-মেয়ের মধ্যে অনেকে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, ব্যাংকার, আইনজীবী বা অন্য অনেক পেশার মানুষ, মুখ দিয়ে কথার পাশাপাশি যেন গর্ব ঝরছিল।

তার একটাই বাধা, সেটি হলো বয়স। মন এখনও তরুণ, তাই অতিক্রম করে চলছেন বয়সের বাধাও। এখনও সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাইলের পর মাইল সাইকেল চালিয়ে বাড়ি বাড়ি ছুটে চলেন।

তার এলাকার বেশিরভাগ মানুষ দরিদ্র কৃষক। তিনি জানেন, এই অভিভাবকরা টাকার অভাবে সন্তানদের ভালো শিক্ষক দিতে পারেন না, ভালো কোচিং বা স্কুলে দিতে পারেন না। তিনিই ভরসা। তাই যতদিন সম্ভব, ততদিন করে যেতে চান এই কাজ।

ছবি: টাইমস

সদর উপজেলার গিদারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হারুন-উর রশিদ ইদু টাইমসকে বলেন, ‘লুৎফর মাস্টার সম্পর্কে গাইবান্ধার সবাই অবগত। সমাজ ও দেশের সেবা করতে গিয়ে তিনি অনেক কষ্টের শিকার হয়েছেন। এমন এক গুণী মানুষ সমাজে খুবই কম পাওয়া যাবে।’

কলেজ শিক্ষক হারুন অর রশিদ বলেন, ‘তিনি একজন নির্লোভ, নিঃস্বার্থ মানুষ। লুৎফর রহমানের এই ত্যাগ, মমতা ও নিবেদন আজও এই গ্রামীণ জনপদের শিক্ষায় প্রেরণার বাতিঘর হয়ে জ্বলছে।’