বাংলা গানের জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, জনপ্রিয় ‘প্রেমের মানুষ ঘুমাইলে চাইয়া থাকে’ গানের কিংবদন্তি গীতিকার ও পল্লি বাউল জবান আলী আর নেই। মঙ্গলবার (২৬ মে) সন্ধ্যা সাতটায় সুনামগঞ্জ পৌর শহরের হাছননগর এলাকায় নিজ বাসভবনে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতা ছাড়াও গত এক বছর ধরে তিনি ফুসফুস ও কণ্ঠনালির সমস্যায় ভুগছিলেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, চার ছেলে ও পাঁচ মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তাঁর প্রয়াণে দেশের সংগীত অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
জবান আলী কেবল গান লিখতেনই না, সুরের মায়ায় তা গেয়ে শোনাতেনও। গানই ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র ধ্যানজ্ঞান। আজীবন অতি সাধারণ বেশভূষা আর জীবনযাপন করা এই গুণী মানুষটি গানের ভণিতায় নিজেকে ‘পল্লিবাউল’ হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। সহজ-সরল জীবনের কথা এবং মানুষের ভেতরের অন্তর্নিহিত রূপটিই তিনি ফুটিয়ে তুলতেন তাঁর লেখনীতে।
শৈশব ও কৈশোরের সন্ধিক্ষণ থেকেই গানের প্রতি অন্যরকম এক টান তৈরি হয় জবান আলীর। এরপর জীবনের প্রায় পুরোটা সময়ই সঁপে দিয়েছেন সুরের সাগরে। দীর্ঘ সংগীত জীবনে তিনি সাত শতাধিক গান রচনা করেছেন। ২০০৯ সালে সুনামগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরি’ থেকে তাঁর ৭০টি গান নিয়ে ‘দর্পণে দর্শন’ নামে একটি গানের বই প্রকাশিত হয়েছিল।
জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ জবান আলীর লেখা গান গেয়ে ব্যাপক শ্রোতাপ্রিয়তা পান। জবান আলীর ‘দর্পণে দর্শন’ বইয়ের শুরুতেই কুমার বিশ্বজিৎ মন্তব্য করেছিলেন, “জবান আলী ফকির, আপনাদের জন্ম হয়েছে বলে আমাদের সংগীত এত সমৃদ্ধ, এত মধুর...।”
কুমার বিশ্বজিতের কণ্ঠে জবান আলীর ‘প্রেমের মানুষ ঘুমাইলে চাইয়া থাকে...’ গানটি দেশ-বিদেশে ব্যাপক সাড়া ফেলে। পরবর্তীতে এই গানটি ‘পিরিতের আগুন জ্বলে দিগুন’ চলচ্চিত্রে কণ্ঠশিল্পী বেবী নাজনীন ও মনির খানের গলাতেও শ্রোতারা শোনেন। এছাড়াও কুমার বিশ্বজিতের কণ্ঠে তাঁর ‘আমার মাথাটা ঘুরায়, কলিজা কামড়ায়’ গানটিও বেশ জনপ্রিয়তা পায়। পরবর্তীতে অলক বাপ্পা, কাজী শুভ, খায়রুল ওয়াসী, ঝুমার মতো প্রথিতযশা শিল্পীরাও তাঁর গান গেয়েছেন।
জবান আলীর রক্তেই ছিল সংগীতের ধারা। তাঁর বাবা আবদুল মতলিব ফকির এবং দাদা আবদুল গণি ফকিরও গানের জগতের মানুষ ছিলেন। বাবার হাত ধরেই তাঁর গানে হাতেখড়ি। পড়াশোনা করেছিলেন সরকারি জুবিলী উচ্চবিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত। এরপর পারিবারিক টানাপোড়েনের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি ঘটলেও, মনের ভেতর চেপে রাখা গানের খাতায় নিয়মিত লিখতে শুরু করেন তিনি।
প্রেম-বিরহ, আধ্যাত্মিকতা ও সৃষ্টি কর্তার প্রতি গভীর ভক্তির পাশাপাশি সমাজের নানা অসংগতিও উঠে আসত জবান আলীর গানে। কর্মের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি লিখেছিলেন, ‘কর্মের ভেতরে ধর্ম জন্ম জন্মান্তর, আমি কই আগে কর্ম কর।’
জীবনের শেষ সময়ে এসে নিজের গানগুলো নিয়ে আরেকটি বই প্রকাশের তীব্র ইচ্ছা ছিল এই বাউল সাধকের। সে লক্ষ্যে একটি পাণ্ডুলিপিও সম্পূর্ণ প্রস্তুত করে রেখেছিলেন তিনি। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে, সেই বইটি আর নিজের চোখে দেখে যেতে পারলেন না। বই প্রকাশের আগেই তিনি পাড়ি জমালেন না ফেরার দেশে ।তাঁর রেখে যাওয়া সৃষ্টি বাংলা লোকসংগীতের ভাণ্ডারে চিরকাল অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে।