রাজধানীর আকাশে-বাতাসে এখন কোরবানির ঈদের আগমনী বার্তা। খড়ের চেনা গন্ধ, চার পায়ার (গবাদি পশু) ডাক আর ব্যাপারীদের বিরামহীন হাঁকডাকে ঢাকার পশুর হাটগুলো সম্পূর্ণ নতুনরূপে সেজেছে। মাঠজুড়ে রেকর্ডসংখ্যক পশু আর উৎসুক জনতার উপচেপড়া ভিড় থাকলেও, কেনাবেচার মূল খাতা এখনো খোলা হয়নি বললেই চলে।
গাবতলীর ঐতিহ্যবাহী স্থায়ী হাট থেকে শুরু করে উত্তরের দিয়াবাড়ী কিংবা দক্ষিণের পোস্তগোলা—সর্বত্রই এখন চলছে ক্রেতা ও বিক্রেতার মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। বিক্রেতারা লালন-পালনের বিপুল খরচের দোহাই দিয়ে দাম হাঁকছেন চড়া, আর মধ্যবিত্ত ক্রেতারা পকেটের নাগাল বুঝে ‘অপেক্ষা করো এবং দেখ’ নীতিতে বাজার পর্যবেক্ষণ করছেন। এর মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ার টিকটকার ও ইউটিউবারদের কল্যাণে হাটগুলো খণ্ড খণ্ড বিনোদন ও সরাসরি সম্প্রচারের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, তবে হাটে প্রকৃত ক্রেতার দেখা মিলছে খুবই কম।
রাজধানীর প্রধান গাবতলী পশুর হাটে এবার দেশি খামারিদের প্রাধান্যই বেশি। সীমান্ত পেরিয়ে ভারতীয় পশুর অবৈধ অনুপ্রবেশে কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকায় স্থানীয় খামারিরা বুক বাঁধছেন ভালো মুনাফার আশায়। তবে হাটের ভেতরের বাস্তব চিত্র সাধারণ ক্রেতাদের জন্য খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়।
অস্তিত্বের সংকটে পটুয়াখালীর নদী-খালঅস্তিত্বের সংকটে পটুয়াখালীর নদী-খাল
মহিষ কিনলে গরু ফ্রি
কেরানীগঞ্জ থেকে আসা মজিবুর রহমানের এক টন ওজনের মহিষের দাম হাঁকা হয়েছে ২৫ লাখ টাকা। ক্রেতা আকৃষ্ট করতে তিনি অভিনব অফার দিয়েছেন—মহিষ কিনলেই দুই মণের একটি সাদা গরু সম্পূর্ণ ফ্রি!
অন্যদিকে জামালপুর থেকে আসা বিশ্ববিদ্যালয়ের চার গ্র্যাজুয়েটের ‘কেটুএন অ্যাগ্রো’ খামারের রাজকীয় গরুগুলো এবার গাবতলীর মূল আকর্ষণ, যেগুলোর একেকটির দাম চাওয়া হচ্ছে ১৫ লাখ টাকা। অন্যদিকে, নাটোর থেকে আসা খামারি সোহান তার বিশালাকার মহিষের নাম রেখেছেন ‘কিম জং উন’, দাম সাড়ে চার লাখ টাকা।
কিন্তু এসবের বিপরীতে মাঝারি ও ছোট ক্রেতাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। গাবতলীর হাটে তিন মণ মাংস মিলবে এমন গরুর দাম এক লাখ পাঁচ হাজার থেকে এক লাখ ১০ হাজার টাকা এবং চার মণ মাংসের গরুর দাম এক লাখ ৪০ থেকে এক লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠছে। গড়ে প্রতি মণ মাংসের দাম পড়ছে ৩২-৩৫ হাজার টাকা।
চুয়াডাঙ্গার শফি বিশ্বাস ১৪টি দেশি ষাঁড় এনে প্রতিটি দুই লাখ ১০ হাজার থেকে দুই লাখ ২০ হাজার টাকা দাম চাচ্ছেন। তার মতে, খাবারের দাম মানুষের খাবারের চেয়ে বেশি, ৩৫ হাজার টাকা মণ না বেচলে লোকসান হবে।
বাগেরহাটের আব্দুর রহিম ১৫টি গরু নিয়ে দুদিন ধরে বসে আছেন, অথচ এখনো কেউ দামই করেনি। মিরপুর পল্লবীর কাপড় ব্যবসায়ী হাজি মিরন মিয়া দুই সন্তানকে নিয়ে এসে বলেন, এখনই গরু কিনে রাখার জায়গা নেই ঢাকায়। ব্যাপারীরা দাম বেশি চাচ্ছেন, শেষ মুহূর্তে হয়তো কিছুটা কমবে।
‘দেশি’ বলদের কৌতূহল
গাবতলীর হাটে এবার কিছু বিশালাকার ভারতীয় সাদা বলদ গরুর দেখা মিলছে। তবে বিক্রেতারা জানান, এগুলো সদ্য আনা নয়, বরং এক থেকে দেড় বছর আগে দেশে এনে খামারে লালন-পালন করা হয়েছে। লক্ষ্মীপুরের ব্যাপারী মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন মজুমদার বলেন, ‘শুরুতে যখন এনেছিলাম, তখন এগুলো শুধু হাড় জিরজিরে ছিল। ধানের কুঁড়া, খেসারি, ভুট্টা ও ভুসি খাইয়ে এগুলোকে দেশি আবহাওয়া ও পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে মোটাতাজা করা হয়েছে।’
প্রতিটি গরুর দাম চার লাখ টাকা পর্যন্ত হাঁকা হচ্ছে, যেখানে ৭-৮ মণ মাংস পাওয়া যাবে। কাঁচা ঘাসের সংকট ও খড়ের চড়া দামের কারণে এবার শুধু আসল বা চালান উঠলেই তারা খুশি বলে জানান।
দিয়াবাড়ীতে ‘ফাটাকেষ্ট’ ও ‘রোনালদো’র মেলা
তুরাগ তীরের উত্তরা দিয়াবাড়ী হাটে এখন উৎসবের আমেজ। এই হাটের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কুষ্টিয়া থেকে আসা তোতাপুরী ক্রস জাতের বিশালাকার ছাগল, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ফাটাকেষ্ট’। চার বছর বয়সি তিন মণ ওজনের এই ছাগলটির দাম চাওয়া হচ্ছে তিন লাখ টাকা। এর শৌখিন মালিক তরিকুল জানান, তার এই আদরের পশুটি ঘাস-ভুসির পাশাপাশি নিয়মিত চা-বিস্কুট ও কোল্ড ড্রিংকস খেতে পছন্দ করে! তাকে দেখতে ও ছবি তুলতে ভিড় করছে শত শত শিশু।
একই হাটে নেদারল্যান্ডস ডেইরি লিমিটেডের আনা এলবিনো ও মুররা জাতের মহিষগুলো নজর কাড়ছে। এর মধ্যে ‘কালো মানিক’ ও ‘রোনালদো’ নামের দুটি মহিষের দাম যথাক্রমে আট লাখ ও সাত লাখ টাকা হাঁকা হয়েছে। নওগাঁর আব্দুল হালিম অবশ্য ছোট পশুর বাজার নিয়ে ইতিবাচক। তিনি সাতটি ভেড়া ও ৬১টি ছাগল নিয়ে এসেছেন, যার মধ্যে ১৯টি ইতোমধ্যে ভালো দামে বিক্রি হয়ে গেছে।
হাটের ইজারা রাজনীতি
চব্বিশের ৫ আগস্ট দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এবারের পশুর হাটগুলোর ইজারা প্রক্রিয়ায় কিছু দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। আওয়ামী সরকারের আমলে সমঝোতা ও একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের যে সংস্কৃতি ছিল, এবার সেখানে কিছুটা প্রতিযোগিতার ছোঁয়া মিলেছে। তবে রাজনৈতিক প্রভাব পুরোপুরি মুছে যায়নি। আওয়ামী আমলের তুলনায় এ বছর ঢাকার সব হাটের ইজারা মূল্য বাবদ আগের তুলনায় বেশি রাজস্ব এসেছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১১টি অস্থায়ী হাটের সরকারি নির্ধারিত মূল্য ছিল ১৬ কোটি ৬১ লাখ টাকা, যা এবার তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে দ্বিগুণেরও বেশি দামে অর্থাৎ ৩৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকায় ইজারা হয়েছে। দিয়াবাড়ী ১৬ ও ১৮ নম্বর সেক্টরের হাটটি এসএফ করপোরেশন ১৪ কোটি ১৫ লাখ টাকায় নিয়েছে।
অন্যদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১০টি অস্থায়ী হাট থেকে এসেছে ২৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। এখানে ডেমরার আমুলিয়া মডেল টাউন হাটটি সরকারি মূল্যের চেয়ে চারগুণ বেশি দামে দুই কোটি ১৫ লাখ টাকায় বিক্রি হলেও, সিকদার মেডিকেল কলেজ সংলগ্ন হাটে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। চার কোটি ২০ লাখ টাকার এ হাটটি মাত্র ১০ হাজার টাকা বেশি মূল্যে ইজারা দেওয়া হয়েছে, যা পুরোনো সিন্ডিকেটের চেনা রূপকেই মনে করিয়ে দেয়। আবার গোপীবাগের সাদেক হোসেন খোকা মাঠের হাটটি সরকারি মূল্যের চেয়ে ৫০ লাখ টাকা কমে দুই কোটি ৩০ লাখ টাকায় ইজারা দিতে বাধ্য হয়েছে সিটি করপোরেশন।
অব্যবস্থাপনায় নেতিবাচক ছায়া
হাটের জৌলুসের আড়ালে ফুটে উঠেছে অব্যবস্থাপনার চিত্র। গাবতলীতে বিক্রেতা রশিদ ব্যাপারী ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ করেন, ‘খুঁটি গাড়ার জন্য হাট মালিকদের দিতে হচ্ছে ৩০০ টাকা, অথচ বাঁশ ও নিজের শ্রম দিয়ে আমাদের নিজেদেরই খুঁটি গাড়তে হচ্ছে। হাটে এক ধরনের নীরব বিশৃঙ্খলা চলছে।’ শুধু গাবতলী নয়, উত্তরা দিয়াবাড়ীসহ সবকটি হাটেই অব্যবস্থাপনার চিত্র কম-বেশি ফুটে উঠেছে।
এছাড়া সবচেয়ে বড় উদ্বেগের নাম ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থা। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পশুবাহী ট্রাকের চাপে মিরপুর-আমিনবাজার রুটে তীব্র যানজট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দিন দিন বাড়ছে। ইজারার শর্ত অনুযায়ী প্রধান সড়ক ও ফুটপাত দখল করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও, বহু জায়গায় সীমানা পেরিয়ে পশু ও ট্রাকের অবস্থান যাতায়াতকারীদের ভোগান্তি বাড়ানোর স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। বৃষ্টি হলে হাটের ভেতরের বর্জ্য ও কাদা পরিস্থিতিকে আরো শোচনীয় করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ক্রেতারা।
নিরাপত্তা ও ডিজিটাল স্বস্তি
নেতিবাচক শত খবরের মাঝেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কড়া নিরাপত্তার আশ্বাস পাওয়া গেছে। হাটের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ ও র্যাবের পাশাপাশি এবার মাঠে বিশেষ নজরদারির কথা জানানো হয়েছে। জাল টাকা শনাক্তকরণে প্রতিটি হাটে বসানো হয়েছে স্বয়ংক্রিয় মেশিন। পকেটে করে লাখ লাখ টাকা বহনের ঝুঁকি এড়াতে গাবতলীসহ প্রধান হাটগুলোতে ব্যাংকিং বুথ ও ডিজিটাল লেনদেনের (ক্যাশলেস) বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে, যা সমসাময়িক বাজারে বড় ইতিবাচক দিক।
শেষ মুহূর্তের হিসাব
চাকরিজীবীদের ছুটি শুরু হলে হাটের পুরো দৃশ্যপট বদলে যাবে বলে মনে করছেন খামারি ও ইজারাদারেরা। বিশেষ করে আগামীকাল সোমবার থেকে পশু বেচাকেনা আরো বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। ঢাকার বাসাবাড়িতে পশু রাখার জায়গা সংকটের কারণে ক্রেতারা সাধারণত ঈদের শেষ দুই-তিনদিনে চূড়ান্ত কেনাকাটা সারতে চান। ঢাকার এই জাঁকজমকপূর্ণ কোরবানি হাট শেষ পর্যন্ত ক্রেতার সাধ্য আর বিক্রেতার লাভের সমীকরণ মেলাতে পারে কি না, তা দেখার জন্য আর মাত্র কয়েক দিনের অপেক্ষা।