মধ্যপ্রাচ্য সংকটকে কেন্দ্র করে দেশে তৈরি হওয়া জ্বালানি তেলের অস্থিরতার পেছনে শুধু বৈশ্বিক বাজার নয়, কাজ করেছে শক্তিশালী একটি অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেটও। সংকটের সে সময়ে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ জ্বালানি আমদানি করা হলেও বাজারে স্বস্তি ফেরেনি। তবে দাম বাড়ানোর পর রাতারাতি উধাও হয়ে যায় সংকট। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বৈধ সরবরাহব্যবস্থার বাইরে চোরাই পথে আসা জ্বালানিই দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণ করছে দেশের বড় অংশের বাজার। আর অবৈধ এ বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ এখনো আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতেই রয়ে গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে সৃষ্ট যুদ্ধাবস্থার প্রভাবে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়। এর বড় ধাক্কা লাগে দেশের প্রায় সব খাতে। মার্চের শুরু থেকে এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত দেশে দেখা দেয় তীব্র জ্বালানি সংকট। দেশের বিভিন্ন পাম্পে দিনের পর দিন দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় যানবাহনগুলোকে। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যায়, শিল্পকারখানার উৎপাদনও হুমকির মুখে পড়ে।
তবে চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্য বলছে, ওই সময় বাংলাদেশ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ জ্বালানি আমদানি করেছে। এরপরও সংকট কাটেনি। সরকার প্রথমে ভর্তুকি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। পাম্পে সরবরাহ বাড়ানো হয়, বিভিন্ন স্থানে অভিযানও চালানো হয়। কিন্তু তাতে পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। পরে ১৯ এপ্রিল সরকার সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিলে রাতারাতি পরিস্থিতি বদলে যায়। পাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইন উধাও হয়ে যায়, জেনারেটরের জ্বালানির জন্য তদবির করা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোয়ও তেলের সংকট কেটে যায় নিমেষেই।
দুই মাস ধরে চলতে থাকা জ্বালানি তেলের সংকট দাম বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে গায়েব হয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে আমার দেশ-এর অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। মূলত সরকারি বিপণনব্যবস্থার বিপরীতে চোরাই পথে আনা বিপুল পরিমাণ অবৈধ তেলের বৈধ বাজার রয়েছে বাংলাদেশে। এর বড় অংশটিই নিয়ন্ত্রণ করছে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী-এমপি ও আমলাদের ঘনিষ্ঠ একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। জুলাই বিপ্লবের পর বড় বড় মাফিয়া পালিয়ে গেলেও এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে জ্বালানি তেলের বাজার। এ কারণেই বিপুল পরিমাণ তেল আমদানি করেও সুফল পায়নি সরকার। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে দাম বাড়াতে হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বৈধভাবে বিপিসির অধীন পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানি জ্বালানি বিপণনের দায়িত্বে থাকলেও বাস্তবে বাজারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করা হয় অবৈধ সরবরাহের মাধ্যমে। ইরান ইস্যুতে উত্তেজনা শুরুর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল ডিজেলের দাম ছিল ৯০ ডলারের নিচে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরুর দিন ডিজেল কেনা হয় প্রতি ব্যারেল ৮৮ দশমিক ৪৪ ডলারে। পরিবহন ব্যয়, ভ্যাট ও ট্যাক্সসহ প্রতি লিটার ডিজেলের আমদানি খরচ পড়ে ৬৬ থেকে ৬৮ টাকা। খোলা বাজারে তা বিক্রি হতো ১০০ টাকায়। অর্থাৎ প্রতি লিটারে প্রায় ৩৪ টাকা লাভ ছিল। পেট্রোল ও অকটেনের ক্ষেত্রেও লাভের পরিমাণ ছিল কাছাকাছি।
ফলে স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপক লাভজনক এ খাতের ওপর নজর পড়ে লুটেরা চক্রের। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার বাইরে পতিত সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় বিশাল বাজার গড়ে তোলে চক্রটি। বিভিন্ন পন্থায় আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জাহাজে করে তেল এনে বিক্রি করত লোকাল বাজারে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে গেলে ২৩ মার্চ প্রতি ব্যারেল ডিজেলের দাম ওঠে ২১৩ ডলার ৩২ সেন্টে। ফলে আমদানি খরচ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২০০ টাকা প্রতি লিটারে। কিন্তু মূল্যস্ফীতির আশঙ্কায় সরকার স্থানীয় বাজারে দাম বাড়ায়নি। এতে বেশি দামে তেল এনে কম দামে বিক্রি করা অলাভজনক হয়ে পড়ে সিন্ডিকেটের জন্য। ফলে তারা চোরাই পথে তেল আনা বন্ধ করে দেয়। আর এতেই তীব্র আকার ধারণ করে সংকট।
দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ তেলের ওপর বাজার নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতাও কমে যায়। দেশে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেইÑসরকারের বারংবার এমন দাবি সত্ত্বেও বাস্তবে সরবরাহ পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। বিপিসি আগের বছরের তুলনায় সমপরিমাণ, এমনকি কোথাও কোথাও বেশি তেল সরবরাহ করে। তারপরও তৈরি হয় তেলের তীব্র সংকট।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ১৯ এপ্রিল সরকার ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারে ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ায়। এরপর থেকেই দ্রুত কমতে থাকে সংকট। ছোট হয়ে আসতে থাকে পাম্পের সামনের যানবাহনের লাইন। ২৫ এপ্রিলের মধ্যেই পরিস্থিতি প্রায় স্বাভাবিক হয়ে আসে।
গত ১৯ মে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল ডিজেলের দাম ছিল ১৭১ ডলার আর অকটেন বিক্রি হয় প্রতি ব্যারেল ১৫৬ ডলার করে। অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রতি লিটার তেলের দাম ১৫ থেকে ২০ টাকা বৃদ্ধি আর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল ৪২ থেকে ৪৫ ডলার কমে যাওয়ার পর সামঞ্জস্যতা এসেছে।
৭০ দিনে ৯৭ জাহাজ জ্বালানি আমদানি
চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমস সূত্র জানিয়েছে, চলতি সংকটকালে জ্বালানি আমদানিতে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে বাংলাদেশ। ১ মার্চ থেকে ৯ মে পর্যন্ত মাত্র ৭০ দিনে ৯৭টি জাহাজে ২৭ লাখ টনের বেশি জ্বালানি আমদানি করা হয়। এর মধ্যে ছিল ডিজেল, এলপিজি, এলএনজি, জেট ফুয়েল, ফার্নেস অয়েল, অকটেন ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল।
কাস্টম হাউসের তথ্য বলছে, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে গত ৭০ দিনে ২০ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকার ২৬ লাখ ৮৩ হাজার টন জ্বালানি এসেছে বাংলাদেশে। এর মধ্যে একক হিসেবে পরিশোধিত ডিজেল এসেছে ৩০টি জাহাজে। ২৪টি জাহাজে আমদানি করা হয় এলপিজি এবং ২০টিতে এলএনজি। এছাড়া জেট ফুয়েল-ফার্নেস অয়েল, অকটেন ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেলবাহী আরো ২৩টি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে নোঙর করেছে।
এ সময় শুধু জ্বালানি খাত থেকেই চট্টগ্রাম কাস্টমস প্রায় দুই হাজার ৯১৪ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করে। ২০২৫ সালের একই সময়ে আমদানি করা হয়েছিল মাত্র ১৫ লাখ ২৯ হাজার টন জ্বালানি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ১২ লাখ টন বেশি জ্বালানি আমদানি করেও সংকট কাটানো সম্ভব হয়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিপিসির মার্কেটিং বিভাগের সাবেক মহাব্যবস্থাপক (বর্তমানে অন্য ডিপার্টমেন্টে কর্মরত) জানান, বছর বছর জ্বালানি তেলের চাহিদা বেড়েছে ১০ থেকে ১২ শতাংশ হারে। অথচ বিপিসি ও বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে জ্বালানি খাতের পুরোটাই বেসরকারি পর্যায়ে চোরাই পথে আসা তেলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। সদ্য অবসরে যাওয়া পদ্মা অয়েল কোম্পানির মার্কেটিং বিভাগের এক জিএম জানান, চোরাই পথে ঠিক কী পরিমাণ তেল দেশে ঢুকছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান কারো কাছে নেই। তবে বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলোর পর্যবেক্ষণ, বিপিসি যা বিক্রি করে চোরাই পথে তার দ্বিগুণ তেল আসে। সংকটের এ সময়ে চোরাই পথের তেল বন্ধ হয়ে গেলে বিপদে পড়ে বিপিসি। সীমিত সক্ষমতার সবটুকু ব্যবহার করে অতিরিক্ত ১২ লাখ টন জ্বালানি তেল বিপণন করেছে। সরকারের আরো তেল আনার আগ্রহ থাকলেও বিপণন সক্ষমতা না থাকায় তা সম্ভব হয়নি। দেশের বাজারে তেলের দাম বাড়ার পর ফের চোরাই পথে তেল আসা শুরু হয়েছে। এতেই জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা ফিরেছে।
যেভাবে আসে চোরাই তেল
রাষ্ট্রীয় বিপণন প্রতিষ্ঠান পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার চাহিদা অনুযায়ী তেল আমদানি করে বিপিসি। বড় বড় অয়েল ট্যাংকারে করে এ তেল আসে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে। সেখান থেকে লাইটার জাহাজে করে আনা হয় চট্টগ্রাম বন্দরের ডলফিন জেটিতে। সেখান থেকে খালাস হয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে ক্রুড অয়েলের ক্ষেত্রে ইস্টার্ন রিফাইনারি আর পরিশোধিত তেলের ক্ষেত্রে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার ডিপোতে চলে যায়। এসব ডিপো থেকে লাইটার ট্যাংকারে করে পাঠানো হয় দেশের বিভিন্ন ডিপোতে।
অবৈধ তেলও প্রায় একই পদ্ধতিতে দেশে আনা হয়। চট্টগ্রাম বন্দর বাংকারিং সুবিধাসম্পন্ন হওয়ায় বিদেশি জাহাজগুলো জ্বালানি সংগ্রহের অজুহাতে বন্দরের জলসীমায় প্রবেশ করতে পারে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে সিন্ডিকেট বহির্নোঙরে অবস্থানরত জাহাজ থেকে লাইটার ট্যাংকারে তেল খালাস করে। বাইরে থেকে বোঝার উপায় থাকে না সেটি লোডিং নাকি আনলোডিং। এছাড়া জাহাজভাঙা শিল্পে আসা জাহাজ ব্যবহার করেও জ্বালানি আনার অভিযোগ রয়েছে।
আওয়ামী মাফিয়াদের নিয়ন্ত্রণ
মূলত পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এ খাতে অনুপ্রবেশ ঘটে দলটির মাফিয়াদের। লাইটার অয়েল ট্যাংকারই চোরাই তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণের প্রধান মাধ্যম। তাই আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা, মন্ত্রী, এমপি ও আওয়ামীপন্থি আমলাদের সবাই লাইটার ট্যাংকার কিনে অবৈধ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিপিসির জ্বালানি সরবরাহে নিয়োজিত ১৬২টি অয়েল ট্যাংকারের মধ্যে ১১৮ ট্যাংকারের মালিকই পতিত আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। গত দেড় বছর ধরে তারা পালিয়ে থাকায় কেউ কেউ স্টাফ দিয়ে আবার কেউ প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের কথিত নেতাদের পার্টনার বানিয়ে ব্যবসা চালাচ্ছেন। অর্থাৎ জ্বালানি খাতের পুরো নিয়ন্ত্রণ এখনো আওয়ামী লীগ নেতাদের হাতেই রয়ে গেছে।
বিপিসি সূত্র জানায়, জ্বালানি তেল পরিবহনে সংশ্লিষ্ট আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীরের নামে রয়েছে এমটি অনিম জালাল, ওটি নেয়ামত ও এমটি সুলতানা নামের তিনটি জাহাজ। নারায়ণগঞ্জের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের ছেলে ইমতিনান ওসমানের নামে রয়েছে এমটি সি ব্রিজ ও জেডএন-১ নামের দুটি জাহাজ। শামীম ওসমানের আত্মীয় আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল কবির খানের নামে রয়েছে এমটি রাশেদ, এমটি রিদা-১-সহ কয়েকটি জাহাজ।
এছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল অফিসার ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আলাউদ্দিন মোহাম্মদ নাসিম, পুলিশের সাবেক আইজি বেনজীর আহমেদ, ঢাকা দক্ষিণের সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপস, তাপসের ভায়রা হাসানুল বারী, আওয়ামী লীগ নেতা ও ঢাকা ক্লাবের সাবেক সভাপতি কেএম জামান রোমেল, নোয়াখালীর সাবেক এমপি মো. ইব্রাহিম, সাবেক চসিক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের নামেও একাধিক জ্বালানিবাহী জাহাজ রয়েছে। এছাড়া ময়মনসিংহের ইঞ্জিনিয়ার মাহাবুব কবির, নরসিংদীর শফিকুল আমিন ভূঁইয়া, শেখ হাফিজুর রহমান, খালেদ এইচ খান, চট্টগ্রাম নগর থেকে নির্বাচিত সাবেক সংসদ সদস্য এমএ লতিফ, নরসিংদীর সাবেক সংসদ সদস্য সিরাজুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ট্যাংকার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. ওয়াহিদ মিয়ার নাম রয়েছে জাহাজ মালিক হিসেবে। বেনজীর আহমেদের জাহাজটি আওয়ামী লীগ সরকারের শেষদিকে দেশ ছাড়ার আগে বিক্রি করে দেন বলে জানা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিপিসির বহরে থাকা সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীরের তিনটি জাহাজ এখন পরিচালনা করেন ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির নেতা মুনতাসীর মামুনের ভাতিজা ইয়ামিন। শামীম ওসমানের দুটি জাহাজ দেখভাল করেন তার সুপারভাইজার কামরুল ইসলাম। তবে নারায়ণগঞ্জের এক বিএনপি নেতা বর্তমানে জাহাজ দুটির তত্ত্বাবধান করছেন। ঢাকা ক্লাবের সাবেক সভাপতি কেএম জামান রোমেলের দুটি জাহাজ দেখাশোনা করেন রেজাউল করিম বাদল। খান গ্রুপের তোফায়েল কবির খানের সাত-আটটি ট্যাংকার আগে শামীম ওসমানের ছেলে অয়ন ওসমানের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এখন এগুলো দেখাশোনা করেন সাইয়েদ গোলাম রূপস। জ্বালানি তেল পরিবহনের লাইসেন্স নিয়ে সাগরে নামলেও এদের মূল ব্যবসা চোরাই পথে তেল এনে তা খোলা বাজার ও বিভিন্ন কোম্পানির কাছে বিক্রি করা।
বিশ্লেষকদের মত
ইস্টার্ন রিফাইনারির সাবেক মহাব্যবস্থাপক ইঞ্জিনিয়ার মানজারে খোরশেদ আলম জানান, রাষ্ট্রীয় বিপণনব্যবস্থার বাইরে অদৃশ্য একটি শক্তি বহু বছর ধরে জ্বালানি তেলের বিরাট বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। বিষয়টি বিপিসিসহ জ্বালানি সংশ্লিষ্টদের কাছে ওপেন সিক্রেট। কিন্তু পতিত সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা থাকায় কেউ এ বিষয়ে কিছু বলতে পারেনি। বাজারে ওই অদৃশ্য শক্তির অংশীদারত্ব কত শতাংশ, সে ব্যাপারেও সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। কিন্তু সংকটকালীন আড়াই মাসে দ্বিগুণ তেল এনেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা যায়নি। এতে বোঝা যায়, বিপিসির অংশের চেয়ে বাজারে অদৃশ্য সিন্ডিকেটের অংশীদারত্ব বেশি ছিল। এ সংকটে একটি সুযোগ এসেছেÑএ খাতের লিকেজগুলো খুঁজে বের করা। দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাতারাতি সব সংকটের সমাধান হয়ে গেল, এটাও কোনো স্বস্তির কথা নয়। তাই সরকারের উচিত জ্বালানি খাতের ওপর মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা। নইলে বৈশ্বিক কারণে যেকোনো সময় এমন সংকট আবার আসতে পারে। সে সময় প্রকৃত চিত্র সম্পর্কে জানা না থাকলে বিপদ বাড়বে।
বিপিসির বক্তব্য
বিপিসির বাণিজ্য ও অপারেশন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসাইন জানান, দাম বাড়ানোর পর থেকে কীভাবে সংকটের সমাধান হয়ে গেল, সে প্রশ্ন তারও। কিন্তু কোনো উত্তর জানা নেই। সাংবাদিকদের উচিত অনুসন্ধান করে কারণ খুঁজে বের করে বিপিসিকে জানানো। এর বেশি কিছু জানতে চাইলে বিপিসির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানান তিনি।
এ বিষয়ে বিপিসির চেয়ারম্যান রেজানুর রহমানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।