Image description

বিএনপির বাইরে পৃথক তিনটি জোট গঠনের চেষ্টা চলছে দেশের রাজনীতিতে। নির্বাচনের আগে ইসলামপন্থি দলগুলোকে নিয়ে একটি জোট গঠনের চেষ্টা জামায়াতে ইসলামীর। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও আমার বাংলাদেশ পার্টিসহ সাতটি দল মিলে চেষ্টা করছে আরেকটি জোট গঠনের। যদিও মতদ্বৈততার কারণে ওই জোট গঠনের উদ্যোগ কিছুটা থমকে গেছে। অন্যদিকে, বাম দলগুলো চেষ্টা করছে পৃথক আরেকটি জোট গঠনের। জোট গঠন হলে সেটি হবে আসন সমঝোতার মধ্য দিয়ে। তবে বিএনপি মনে করছে, সাবেক ২০ দলীয় জোটসহ আরও কিছু দল নিয়ে বৃহত্তর জোট গঠন করতে পারলে তারা নির্বাচনি বৈতরণী পার হতে পারবে। ফলে আপাতত অন্য তিন পক্ষের জোট গঠনের উদ্যোগকে বিএনপি চাপ হিসাবে দেখছে না।

দলটির নেতাদের দাবি, অন্যদের জোট বিএনপির অগ্রযাত্রাকে থামাতে পারবে না। তাছাড়া সম্ভাব্য এসব জোটের প্রভাব তৃণমূলে তেমন একটা পড়বে না বলেও মনে করেন তারা। তাদের মতে, বাংলাদেশের নির্বাচনে ভোটাররা সাধারণত প্রতীক দেখে ভোট দেন। এক্ষেত্রে ধানের শীষ ও নৌকা সবচেয়ে পরিচিত প্রতীক বলে মনে করা হয়। যদিও এর ভিন্নমতও রয়েছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। তাদের মতে, প্রতিপক্ষ শক্ত জোট গড়তে পারলে তা ভোটারদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলতে পারে। সেক্ষেত্রে বিএনপির জন্য কিছুটা চাপও সৃষ্টি করতে পারে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এসব তথ্য।

বিএনপি নেতারা জানান, ক্ষমতায় গেলে সব দলকে নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করা হবে এমন ঘোষণা বিএনপি আগেই দিয়ে রেখেছে। ফলে অন্য জোটের সঙ্গেও আসন সমন্বয় করতে পারে বিএনপির সম্ভাব্য এই জোট।

আসন্ন নির্বাচনের আগে ত্রিমুখী জোট গঠন হলে কতটা চাপে পড়বে বিএনপি-এ প্রসঙ্গে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু যুগান্তরকে বলেন, আমি তেমনটা মনে করি না। বিএনপি একটি মূলধারার দল। এসব জোট করে বিএনপির অগ্রযাত্রা বন্ধ করা যাবে বলে মনে করি না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, যারা বিএনপির প্রতিপক্ষ, তারা যদি জোট করে শক্তিশালী হয় সেটা বিএনপির জন্য চাপ হবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফ্রন্ট গঠনের একটা ইতিহাস আছে। যুক্তফ্রন্টের আমল থেকে পরবর্তীতে দেখা গেছে এর একটা শক্তি আছে। ৫ জন লোক আলাদাভাবে নির্বাচন করলে এক রকম, আর একত্র হয়ে নির্বাচন করলে আরেক রকম। মানুষের ওপর একটা মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব সৃষ্টি হয়। কাজেই এই প্রভাব তো হবেই। এটাকে হিসাবের মধ্যে নিতে হবে।

জানা যায়, আড়াই দশক ধরে একে-অপরের মিত্র ছিল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। রাজপথের লড়াই আর ভোটের হিসাব মিলিয়েছে তারা একসঙ্গে। কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থান ও তার পরের পরিস্থিতি পালটে দিয়েছে সব হিসাব। ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগ না থাকায় আসন্ন নির্বাচনে এই দল দুটিই এখন পরস্পরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। তাই ভোটের মাঠে এতদিন যারা এক সুরে কথা বলেছে, এখন তারাই আক্রমণের তির ছুড়ছে একে-অপরকে লক্ষ্য করে।

অন্যদিকে জামায়াত ৭টি দল নিয়ে নির্বাচনি আসন সমঝোতার পথে হাঁটছে। ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্বে থাকা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি, বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনসহ কয়েকটি দল নিয়ে নির্বাচনি জোট গঠনের প্রস্তুতি প্রায় শেষ দিকে। বাম ধারার রাজনৈতিক দলগুলোরও নির্বাচনি জোট গঠনের প্রস্তুতি চলছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচন করতে পারছে না। তবে দলটির স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। জাতীয় পার্টি নির্বাচনে থাকতে পারবে কিনা বা কীভাবে থাকবে, তা এখনো পর্যন্ত অস্পষ্ট। এমন অবস্থায় ত্রিমুখী জোট নিয়ে না ভাবলেও, যুগপৎ আন্দোলনে যুক্ত থাকা মিত্র দল ও জোটের বাইরেও বাম-ডান, মধ্যম ও ইসলামপন্থি অনেক দল নিয়ে ‘বৃহত্তর জোট’ গঠনে তৎপর হয়েছে বিএনপি।

দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির নেতৃত্বে একটি বৃহৎ জোট গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। এ নিয়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দল ও জোট ছাড়াও যুগপতের বাইরে হাসিনা সরকারবিরোধী মনোভাবাপন্ন দলগুলোর সঙ্গেও আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছে। ফ্যাসিবাদবিরোধী ও গণতান্ত্রিক দেশপ্রেমিক যেসব রাজনৈতিক দল নির্বাচনি জোটে আসতে চাইবে, তাদের সবাইকেই এর অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল যুগান্তরকে বলেন, এখন কিছু আছে জোট, কিছু আছে সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচন। বিএনপি প্রকাশ্যে রাজনীতি করে। আমাদের সঙ্গে কারও জোট হলে ঘোষণা দিয়েই হবে বলে আমার ধারণা। অন্যরা যেটা করছে সেটা তাদের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে, নিজেদের আলাদা বৈশিষ্ট্য রাখার জন্যই করছে। আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী জোট কিংবা নির্বাচনকালীন সমঝোতার কথা যারা বলেন, তাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে বিএনপিকে পরাভূত করা। এখন বিএনপিকে যদি জনগণ পরাভূত না করে তাহলে যারাই জোট কিংবা ভোট করেন তাদের পক্ষে ফলাফল যাবে বলে আমরা মনে করি না। অনেকবার বিএনপির দেশ পরিচালনা দেখেছি। তাতে কিছুটা ভুলত্রুটি আছে, তার চাইতে সফলতা অনেক বেশি আছে। এসব পরিকল্পনা জনগণের কাছে তুলে ধরব। ফলে আমার মনে হয় না কোনো জোট বিএনপির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পেরে উঠবে।

ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনে থাকা বেশকিছু দল বিভিন্ন জোটে গেলেও তাদের সঙ্গে আসন সমন্বয় করতে পারে বিএনপি। এ প্রসঙ্গে দলটির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স যুগান্তরকে বলেন, কোনো জোটের কারণে বিএনপি চাপে পড়ার কোনো সুযোগ নেই। এটি বাংলাদেশের সর্ব বৃহৎ দল। জনগণের ভালোবাসা ও সমর্থনে সিক্ত, অভিজ্ঞ রাজনৈতিক দল। বিএনপি কোনো সময় এককভাবেই নির্বাচন করে ক্ষমতায় গিয়েছে, আবার কখনো জোটগতভাবে নির্বাচন করেও ক্ষমতায় গেছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বেই জোটের রাজনীতি আছে, আবার একক ফোরামের রাজনীতিও আছে। এখানে কেউ জোট করলেই যে বিএনপিকে চাপে পড়তে হবে, বিষয়টি এমন নয়। ইনশাআল্লাহ আগামীতে জোট করার কোনো প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। তবে আমাদের সঙ্গে রাজপথে অন্যান্য যারা ছিলেন তাদের সঙ্গে আসন সমন্বয় করে আমরা নির্বাচনের দিকে যাব। এমনকি এখন যেসব জোট হচ্ছে তাদের সঙ্গেও আমাদের আসন সমন্বয় হতে পারে। জোট হলেই যে বিএনপি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তা কিন্তু না।

নানামুখী জোট হলেও তৃণমূলে কোনো প্রভাব পড়বে না বলে মনে করেন বিএনপির জেলা পর্যায়ের নেতারা। তারা বলছেন, দেশের মানুষ রাজনৈতিক দল ও প্রতীক দেখে ভোট দেয়। সেক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে বড় দলগুলোর প্রভাব বেশি থাকে। সাধারণ ভোটারদের কাছে ছোট দল কিংবা জোটের নেতারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অপরিচিত। ফলে জোট নিয়ে তৃণমূল ভাবছে না। এ প্রসঙ্গে বিএনপির কুমিল্লা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ মো. সেলিম ভূঁইয়া যুগান্তরকে বলেন, সামনে নির্বাচন, এখন ছোট ছোট দলগুলোর নানামুখী জোট হবে। এসব নিয়ে বিএনপি কিংবা তৃণমূলের নেতাকর্মীরা চিন্তিত নন। ভোটের মাঠে এসব জোটের তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না। বিগত নির্বাচনেও এমন অনেক জোট হয়েছে। ভোটের বাস্তবতায় টিকতে পারেনি। ঢাকার রাজনীতির সঙ্গে তৃণমূলের ভোটের মাঠের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা।