Image description

দেশের সমুদ্র উপকূলবর্তী জেলা বরগুনা। দক্ষিণাঞ্চলের এ জেলা সাগর দুহিতা নামে পরিচিত। জেলার মাঝ দিয়ে প্রবাহিত প্রমত্তা নদী পায়রা এই আসনকে দুভাগে বিভক্ত করে রেখেছে। পায়রা নদীর পশ্চিমে বরগুনা সদর উপজেলা এবং নদীর পূর্বে আমতলী ও তালতলী উপজেলা। এ জেলায় রয়েছে ৬টি উপজেলা। সংসদীয় আসন দুটি। বরগুনা সদর, আমতলী ও তালতলী নিয়ে গঠিত বরগুনা-১ এবং পাথরঘাটা, বামনা ও বেতাগী উপজেলা নিয়ে গঠিত বরগুনা-২ আসন।

লন্ডনে অন্তর্র্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সফল বৈঠকের পরে পুরোদমে নির্বাচনী কর্মকান্ডে মনোনিবেশ করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। নিজেদের ঘর গোছানোর পাশাপাশি ভোটারদের মন জোগাতে নানামুখী তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন নেতাকর্মীরা। দেশের উপকূলীয় জেলা বরগুনার চিত্রও এর ব্যতিক্রম নয়।

বরগুনার আসন দুটিতে বরাবরই কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগের শক্ত অবস্থান থাকলেও সেই চিত্র এখন পাল্টে গেছে। এবার দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আসনটি দখলে মরিয়া বিএনপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জামায়াত ইসলামীর প্রার্থীরা। তবে শেষ মুহূর্তে স্বতন্ত্রপ্রার্থী বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থীও নির্বাচনে চমক দেখাতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জেলার দুটি আসনেই দলীয় প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। প্রার্থীরাও ভোটারদের মন জোগাতে কাজ শুরু করেছে। এখন পুরোদমে মাঠে নেমে পড়েছে জামায়াত, বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো। তবে এখন পর্যন্ত জেলায় জাতীয় নাগরিক পার্টি, গণঅধিকার পরিষদসহ অন্যান্য দলের তেমন কোনো কার্যক্রম চোখে পড়েনি। এসব দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে তারা দল গোছানো ও যোগ্যপ্রার্থী খোঁজার কাজ করছেন। নির্বাচনের দিনক্ষণ চূড়ান্ত হলে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করা হবে।  

বরগুনা-১ (সদর, আমতলী ও তালতলী) ॥ দেশের সর্ব দক্ষিণে অবস্থিত বরগুনা জেলার বরগুনা সদর, আমতলী ও তালতলী উপজেলা নিয়ে বরগুনা-১ আসনটি গঠিত। ২০০৮ সালে নতুন করে আসন বিন্যাসের আাগে বরগুনা সদর উপজেলাটি বরগুনা-১ আসনের অংশ ছিল এবং আমতলী ও তালতলী উপজেলা নিয়ে ছিল বরগুনা-৩ আসন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর পাল্টে গেছে এখানকার রাজনৈতিক হিসাব নিকাশ। আওয়ামী সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি, লুটপাট, অত্যাচার এবং সাবেক এমপি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর ছত্রছায়ায় বরগুনায় মাদক ব্যবসার সীমাহীন প্রসার ঘটায় মানুষ আওয়ামী লীগ থেকে একেবারে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। যে কারণে অবস্থার উন্নতি হয়েছে বিএনপিসহ অন্যান্য সমমনা রাজনৈতিক দলের। 
এ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও বরগুনা জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মোল্লা। তিনি নির্বাচনী আসনের প্রতিটি উপজেলার হাটবাজারে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রণীত ৩১ দফার লিফলেট বিতরণ ও জনগণের সঙ্গে কুশল বিনিময় এবং পথসভা করে যাচ্ছেন।

নজরুল ইসলাম মোল্লা বলেন, ‘রাজনীতির মাঠে বিএনপির পরীক্ষিত নেতা হিসেবে আমি জনগণের পাশে ছিলাম ও ভবিষ্যতেও থাকব। উন্নয়ন গণতন্ত্র ও জনঅধিকার প্রতিষ্ঠায় জনগণের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। দল আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে। আমি সকলের দোয়া ও সমর্থনে দলকে এই আসনটি উপহার দিতে চাই। অনুন্নত বরগুনাকে উন্নয়নের রূপ দিতে চাই। অন্যায়, অত্যাচার ও লুটপাটের রাজনীতি বরগুনা-১ আসন থেকে চিরতরে নির্মূল করতে চাই। সাধারণ মানুষ ও নতুন প্রজন্ম আমার প্রতি আস্থা রাখে, ইনশাআল্লাহ তারা ভোট দিয়ে আমাকে বিজয়ী করবে।’

এই আসনে অনেক আগেই জামায়াতে ইসলামী তাদের প্রার্থী করেছেন জেলা আমীর মাওলানা মহিব্বুল্লাহ হারুনকে। তিনি বলেন, ‘জনগণের অধিকার ও ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠাই আমাদের লক্ষ্য। যদি জনগণ আমাদের ওপর আস্থা রাখে, আমরা পরিবর্তনের রাজনীতি দেখাব। জনগণ এখন ইসলামি দলকে ক্ষমতায় দেখতে চায়। যেখানে যাচ্ছি জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন পাচ্ছি। আশা করছি আগামী নির্বাচনে জমায়াতে ইসলামীকে আসনটি উপহার দিতে পারব ইনশাআল্লাহ। আগামী নির্বাচনে বিপুল ভোটে আমি বিজয়ী হব।’ 
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বরগুনা জেলা শাখার প্রধান উপদেষ্টা পীর সাহেব কেওড়াবুনিয়া মাওলানা মাহামুদুল হোসাইন ওয়ালিউল্লাহ বরগুনা-১ আসনের মনোনীত প্রার্থী। তিনিও এই আসনে নির্বাচনের বিভিন্ন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি আশাবাদী, এবারের নির্বাচনে এই আসনের তিনটি উপজেলাতেও তারা বিপুল ভোটে বিজয়ী হবেন। দলীয় সূত্র জানায়, বরগুনায় তাদের অবস্থান খুবই মজবুত।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বরগুনা-১ আসনে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হবে। অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও চমক দেখাবে। প্রতিটি দলের প্রার্থীই জনপ্রিয়। ভোটের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত বলা যাচ্ছে না কে বিজয়ী হবেন। তবে তিনটি উপজেলায় বিএনপি ঐক্যবদ্ধ থাকলে ফল তাদের পক্ষে যেতে পারে বলে মনে করেন জনগণ।

এই আসনটিতে ভোটের দিক থেকে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে ইসলামী আন্দোলন। বিগত কয়েকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারা দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। আসনটিতে ইসলামী আন্দোলনের সম্ভাব্য প্রার্থী দলটির প্রধান উপদেষ্টা মাওলানা মাহমুদুল হোসাইন ওয়ালীউল্লাহ। ইসলামী আন্দোলনের জেলার সভাপতি মুফতি মো. মিজানুর রহমান বলেন, বরগুনায় আমাদের ভোটব্যাংক রয়েছে। বিগত নির্বাচনগুলোর ফলাফল বিশ্লেষণ করলে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। এই আসনে আসন্ন নির্বাচনে জয়ের বিষয়ে আমরা খুবই আশাবাদী। এই আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টি, গণঅধিকার পরিষদসহ অন্যান্য দলের তেমন কোনো কার্যক্রম নেই। তাদের তেমন কোনো তৎপরতাও লক্ষ্য করা যায়নি।

বরগুনা-২ (পাথরঘাটা, বামনা ও বেতাগী) ॥ এ আসনে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান, জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আলহাজ নূরুল ইসলাম মণি। তিনি এ আসন থেকে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি বিজ্ঞান এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবং প্যানেল স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেছেন। এখানে মূলত তার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তাই বিএনপিকে অন্য সব দল থেকে এগিয়ে রেখেছে। 
নূরুল ইসলাম মণি বলেন, ‘এ এলাকার সার্বিক উন্নয়ন আমার হাত দিয়ে হয়েছে। আমি এমপি হওয়ার আগে এখানে কিছুই ছিল না। আমি নির্বাচিত হয়ে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ, মন্দির, রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট, যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, মানুষের মানবিক উন্নয়নসহ যাবতীয় কাজ করেছি। মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নানা কাজ করেছি। এলাকায় অসংখ্য লোককে চাকরি দিয়েছি। এজন্য এলাকার মানুষ আমার পক্ষে অবস্থান করছে। আশা করছি আগামী নির্বাচনে আসনটি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উপহার দিতে পারব ইনশাআল্লাহ।’

এ আসনে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের মজলিসে শূরা সদস্য ডা. সুলতান আহমেদকে প্রার্থী করা হয়েছে। ইতোমধ্যে তিনি এলাকায় গণসংযোগ শুরু করেছেন। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে সারাদেশেই জামায়াতের অবস্থা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে ভালো। এ আসনেও এর ব্যতিক্রম নেই। ইতোমধ্যে তিনটি উপজেলায়ই সভা-সমাবেশ করেছি। এ সময়ে মানুষের যথেষ্ট সমর্থন পেয়েছি। আশা করছি, জনগণের এ ভালোবাসা আমাকে জয়ী হতে সাহায্য করবে।’

ইসলামী আন্দোলনের জেলার সভাপতি মুফতি মো. মিজানুর রহমানকে বরগুনা-১ আসনের মনোনীত প্রার্থী করা হয়েছে। তিনি বলেন, বরগুনায় আমাদের ভোটব্যাংক রয়েছে। বিগত নির্বাচনগুলোর ফলাফল বিশ্লেষণ করলে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। এ আসনেও ইসলামী আন্দোলনেরও কিছু রিজার্ভ ভোট রয়েছে। তিনিও এই আসনে নির্বাচনের বিভিন্ন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। আসন্ন নির্বাচনে জয়ের বিষয়ে তারা খুবই আশাবাদী। 
এ আসনেও জাতীয় নাগরিক পার্টি, গণঅধিকার পরিষদসহ অন্যান্য দলের তেমন কোনো কার্যক্রম নেই বললেই চলে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়েও তাদের তেমন কোনো তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। 
বরগুনার বিভিন্ন উপজেলার ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আসন্ন নির্বাচনে সৎ, যোগ্য এবং এলাকার উন্নয়নের জন্য নিবেদিতপ্রাণ প্রার্থীকেই তারা বেছে নেবেন। বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যার চিন্তায় ও মনে অপরিসীম দেশপ্রেম রয়েছে, ধর্মীয় মূল্যবোধের পাশাপাশি আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে যার পরিষ্কার অবস্থান থাকবে, এমন প্রার্থীকে ভোট দিতে চান জনগণ।