Image description

আগের দিনই (৪ঠা আগস্ট, ২০২৪) নিরাপত্তা সংক্রান্ত জাতীয় কমিটির বৈঠক শেষে শেখ হাসিনা একটি বিবৃতি দেন। তিনি বিক্ষোভকারীদের সন্ত্রাসী ও অগ্নিসংযোগকারী হিসেবে অভিহিত করেন। বিবৃতিতে বলা হয়, যারা হিংসা চালাচ্ছে তারা কেউ ছাত্র নয়, সন্ত্রাসবাদী। এরা জাতিকে অস্থিতিশীল করে তুলতে চাইছে। তাই তিনি এই সন্ত্রাসীদের কড়া হাতে দমন এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে দেশের মানুষের প্রতি আহ্বান জানান। 

তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে পালিয়ে আসার দিন (৫ই আগস্ট, ২০২৪) সকাল থেকেই গণভবনে শুরু হয়ে গিয়েছিল ব্যস্ততা। প্রধানমন্ত্রীর প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি মহম্মদ তোফাজ্জেল হোসেন মিঞা সকালেই এসে হাজির। তার কিছুক্ষণের মধ্যে আসেন জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল  (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক। ডিজিএফআই ও এনএসআই প্রধানরা ফোনে জানালেন দেশের গুরুতর পরিস্থিতি, বিশেষ করে ঢাকার সর্বশেষ পরিস্থিতি।

প্রধানমন্ত্রী এনএসআই প্রধানকে নির্দেশ দিলেন ঢাকার পরিস্থিতি নিয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করতে। সেইসঙ্গে পুলিশ সকাল থেকে জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে কতোটা কার্যকর ভূমিকা পালন করছে সে সম্পর্কেও জানাতে বললেন। আধঘণ্টার মধ্যেই এনএসআই প্রধান ফোন করে হাসিনাকে বিস্ফোরক পরিস্থিতির দুঃসংবাদ জানান। আরও জানান, সকালের দৈনিক সংবাদপত্রগুলোতে প্রকাশিত একটি ছবি ইন্ধন দিয়েছে পরিস্থিতির অবনতির। ছবিটি ছিল, ফার্মগেটে পুলিশের গুলিতে আহত গোলাম নাফিজের  দেহ পুলিশ একটি রিকশার পা দানিতে রেখে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে। সব সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত সেই অমানবিক দৃশ্যটি আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও গভীর বিতৃষ্ণা জাগিয়ে তোলে। হাসপাতালে নিয়ে গেলে তাকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়। 

মেজর জেনারেল মোরশেদ প্রধানমন্ত্রীকে জানান, মানুষের ক্রোধ এখন তুঙ্গে। তাই তার আর গণভবনে থাকা নিরাপদ নয়। তিনি নিশ্চিত গোয়েন্দা তথ্য পেয়েছেন যে, আন্দোলনকারীরা গণভবনে ঝাঁপিয়ে পড়ার পরিকল্পনা করছে। তাই প্রধানমন্ত্রীর দ্রুত গণভবন ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত। কেবিনেট সেক্রেটারি, ডিজিএফআই, এনএসআই প্রধানরা, এসবির প্রধান এবং অন্যান্য পুলিশ, সেনা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা গণভবনে আসতে থাকেন। সকলের মুখেই উদ্বেগজনক খবর। সকলে প্রধানমন্ত্রীকে জানান, আন্দোলনকারীরা ব্যারিকেট ভেঙে এগিয়ে চলেছে। সকাল পেরোনোর আগেই তারিক আহমেদ  সিদ্দিকী পরিস্থিতি বুঝে নিয়ে ভারতের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে শুরু করেন।  পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে গেলে তিনি একটি তাৎক্ষণিক ব্যবস্থার কথা ভেবে ফেলেন। অবশ্য আগেই  ভারত থেকে সংকেত পাঠানো হয়েছিল  যে, ভারত হাসিনাকে নিরাপদে চলে আসার ব্যবস্থা করবে। ২রা আগস্ট, ২০২৪ ভারত হাসিনাকে বিপদ সংকেত বার্তা পাঠিয়েছিল। বলেছিল, কোটা আন্দোলন হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। কিছু বাইরের শক্তি এই আন্দোলনকে পরিচালনা করছে। সেইসঙ্গে জানানো হয়েছিল,  জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে ভারত হাসিনাকে আশ্রয় দিতে তৈরি। পরদিন সোমবার সকালেই ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ও নিরাপত্তা এজেন্সির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ঢাকায় পৌঁছেছিলেন। তাৎক্ষণিকভাবে হাসিনাকে উদ্ধার করার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। বাংলাদেশের সেনাপ্রধান ও বিমানবাহিনীর প্রধান এবং এনএসআই প্রধানকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছিল। 

এদিকে ৫ই আগস্ট দুপুরেই নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধানকে নিয়ে সেনাপ্রধান হাজির হন গণভবনে। অফিসের চেম্বারে হাসিনা তখন ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে আলোচনা করছিলেন। তিন প্রধান সটান সেখানে ঢুকে প্রধানমন্ত্রীকে এক্ষুণি গণভবন ছাড়ার কথা বলেন। তারা জানান, তিনি যদি গণভবনের বাসভবনে থাকেন তবে তার নিরাপত্তার কোনো গ্যারান্টি দেয়া সম্ভব নয়। সেনাপ্রধান তাকে ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিয়ে দ্রুত গণভবন ছাড়তে জোরাজুরি করতে থাকেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সময়েই চারিদিক থেকে বিক্ষোভকারীদের বিপুলসংখ্যায় জমায়েতের খবর আসতে থাকে। 

সম্প্রতি ভারতে প্রকাশিত সাংবাদিক-লেখক দীপ হালদার, জয়দীপ মজুমদার ও শহিদুল হাসান খোকনের লেখা ‘ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশ: দ্য স্টোরি অব অ্যান আনফিনিশড রেভ্যুলেশন’  শিরোনামে একটি বইয়ে ২০২৪ সালের ৪ ও ৫ই আগস্ট গণভবনের অভ্যন্তরে কী হয়েছিল তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।

বইয়ে লেখকরা লিখেছেন, জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান আবারো হাসিনাকে বলেন, সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই। তাকে এক্ষুণি গণভবন ছাড়তে হবে। এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান জানান, ভারতে উড়ে যাবার জন্য  তেজগাঁও বিমান ঘাঁটি ও কুর্মিটোলায় বিমানবাহিনীর ঘাঁটিতে দুটি ট্রান্সপোর্ট বিমান তৈরি রয়েছে। ভারতের এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই হাসিনাকে নিয়ে বিমানের ভারতের আকাশে প্রবেশের অনুমতি দিয়ে রেখেছিল। কিন্তু তখন পর্যন্ত হাসিনা গণভবন ছাড়তে সম্মত ছিলেন না। 

ঘরের মধ্যে থাকা তিন বাহিনীর প্রধানরা ছাড়াও উপস্থিত অন্যরা তখন তার বোন রেহানাকে ধরেন হাসিনাকে রাজি করানোর জন্য। রেহানা ২রা আগস্ট থেকেই গণভবনে এসে থাকছিলেন। রেহেনার বোঝানোর  পরেও হাসিনা গোঁ ধরে থাকেন। তখন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়াতে হাসিনাপুত্র সজীব ওয়াজেদকে ফোনে ধরা হয়। সজীব তার মাকে বলে গণভবন ছেড়ে এক্ষুণি ভারতে উড়ে যাও। তখনো তিনি তা খারিজ করে দেন। তিনি ঘরের মধ্যে থাকা সকলের উদ্দেশ্যে বলেন, দেশ ছেড়ে যাবার চেয়ে মৃত্যু ভালো। 

এরপরই আসে ভারতের এক উচ্চপর্যায়ের কর্মকতার ফোন। হাসিনার সঙ্গে খুব সংক্ষিপ্ত কথোপকথন হয়। এরপর ওয়াকার বলেন, তিনি যদি গণভবন না ছাড়েন তাহলে যে শুধু নিজের জীবন বিপন্ন করবেন তাই নয়, এখানে যারা রয়েছেন তাদের এবং তার নিরাপত্তায় নিযুক্ত স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের সদস্যদের জীবনও বিপন্ন হবে। ততক্ষণে খবর আসতে থাকে, যে পথে হাসিনাকে উদ্ধার করে তেজগাঁও বিমান ঘাঁটিতে নেয়া হবে সেই বেগম রোকেয়া এভিনিউ দিয়ে এবং অন্যান্য পথ দিয়ে গণভবনের দিকে এগিয়ে আসছে জনতার স্রোত। তখনই পরিকল্পনা বদল করা হয়। বিমানবাহিনীর প্রধান সম্ভাব্য পরিস্থিতি বুঝে একটি এমআই১৭ হেলিকপ্টারকে প্রস্তুত রেখেছিলেন। 

বেলা দুটোর দিকে শেখ হাসিনা রাজি হন। বিক্ষোভকারীরা ততক্ষণে গণভবনের দিকে ধেয়ে আসতে শুরু করেছে। কিন্তু হাসিনা একটি  ভাষণ রেকর্ড করতে চান। এখন এবং আর কখোনই সেটা সম্ভব নয় বলে জানানো হয় তাকে।  

রেহানা টেনে-হিঁচড়ে হাসিনাকে গাড়িতে তুলে ছিলেন

বোন শেখ রেহানা প্রকৃতপক্ষে শেখ হাসিনাকে টেনে-হিঁচড়ে অপেক্ষমাণ গাড়িতে তুলেছিল। হেলিপ্যাডে নিয়ে যাবার জন্য গাড়িটি তৈরি করে রাখাই ছিল। ততক্ষণে প্রধানমন্ত্রীর কয়েকজন ব্যক্তিগত সহকারী তার জামাকাপড় ও ব্যক্তিগত কিছু জিনিসপত্র কয়েকটি স্যুটকেসে ভরে দেয়। গণভবনের হেলিপ্যাডে অপেক্ষমাণ এমআই ১৭  হেলিকপ্টারের পাইলটকে ইঞ্জিন চালু করতে বলা হয়। বলা হয় দ্রুত উড্ডয়নের জন্য প্রস্তুত থাকতে। কয়েকজন সিকিউরিটি ফোর্সের সদস্যসহ হাসিনা ও রেহানা ওঠে বসেন হেলিকপ্টারে। অবশেষে ২টা ২৩ মিনিট নাগাদ গণভবনের হেলিপ্যাড থেকে হেলিকপ্টারটি উড়ে যায়। ২টা ৩৫ মিনিটে হেলিকপ্টারটি পৌঁছায় তেজগাঁও বিমান ঘাঁটিতে। সেখানে তখন প্রস্তুত একটি সি ১৩০ জে সুপার হারকিউলিস বিমান। ইঞ্জিন চালু করে রাখা ছিল। তেজগাঁওয়ে পৌঁছানো মাত্রই হাসিনা ও রেহানাকে  তুলে দেওয়া হয় বিমানটিতে। ২টা ৪২ মিনিটে বিমানটি উড়ে যায়। ২০ মিনিটে  পশ্চিমবঙ্গের মালদহের উপর দিয়ে ভারতের আকাশসীমায় প্রবেশ করে বিমানটি। বিমানটির কোড ছিল এজেএএক্স ১৪৩১।  বিমানটি উড্ডয়নের সময় এক পশলা বৃষ্টিও হয়েছিল। 

সমপ্রতি ভারতে প্রকাশিত সাংবাদিক-লেখক দীপ হালদার, জয়দীপ মজুমদার ও শহিদুল হাসান খোকনের লেখা ‘ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশ: দ্য স্টোরি অব অ্যান আনফিনিশড রেভ্যুলেশন’  শিরোনামে একটি বইয়ে ২০২৪ সালের ৪ ও ৫ই আগস্ট গণভবনের অভ্যন্তরে কী হয়েছিল তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।

লেখকরা লিখেছেন,  ভারতের আকাশসীমায় প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে ভারতের কয়েকটি জেট বিমান হাসিনা ও রেহানাকে বহনকারী বিমানটিকে পাহারা দিয়ে নিয়ে গিয়েছিল গাজিয়াবাদের হিন্দন বিমান ঘাঁটিতে। সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ সেটি সেখানে পৌঁছেছিল। হাসিনাকে অভ্যর্থনা জানাতে উপস্থিত ছিলেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ও জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তারা।

বরাত জোরে হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে যেতে পেরেছিলেন। সিকিউরিটি ফোর্সের সদস্যরাও বরাত জোরে বেঁচে গিয়েছিলেন। গণভবনের হেলিপ্যাড থেকে হেলিকপ্টারটি উড্ডয়নের ২৫ মিনিটের মধ্যে বিশাল জনতা গণভবনের গেট ভেঙে ভিতরে পৌঁছে গিয়েছিল। বাইরে থাকা সেনা সদস্যরা কোনোরকম বাধা দেবার চেষ্টা করেননি।  ভিতরে সিকিউরিটি ফোর্সের কাছে তখন ছিল প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র। বিপদ বুঝে তারা সেগুলো গণভবনের পিছনের দিকে বেসমেন্টে  একটি ভল্টে সেসব  ঢুকিয়ে তালা দিয়ে পিছনের গেট দিয়ে পালিয়ে সংসদ ভবনে চলে গিয়েছিল। আর তার ঠিক ৫ মিনিট পরেই উন্মত্ত জনতা গণভবনে ঢুকে ভাঙচুর ও লুটপাট শুরু করেছিল।
এই ভাবেই যবনিকা পতন হয়েছিল শেখ হাসিনার ১৫ বছর ৭ মাসের বিতর্কিত শাসনের। (শেষ)