Image description
 
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) প্রায় ছয় বছর আগে ‘ঈদ সেলামি’ ঘিরে তুলকালাম হয়। উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে ছাত্রলীগ নেতাদের দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবির অডিও ফাঁস হয়। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম টিকে যান। তবে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পদ হারান যথাক্রমে রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং গোলাম রাব্বানী।

 

 

এ ঘটনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ২০১৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) তদন্ত কমিটি করে। এই কমিটি কাজে অপারগতা জানিয়ে নতুন কমিটি গঠনের পরামর্শ দেয়। কিন্তু দীর্ঘ ছয় বছরেও ইউজিসি কোনো কমিটি করেনি। তাদের বিরুদ্ধে ঘটনাটি চেপে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও এ ব্যাপারে নির্বিকার।

 

 

২০১৯ সালে উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের বিরুদ্ধে আন্দোলন হয় ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ ব্যানারে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের এই প্ল্যাটফর্মের সংগঠক ছাত্র ইউনিয়নের জাবি সংসদের নেতা রাকিবুল হক রনি স্ট্রিমকে বলেন, তৎকালীন প্রশাসন সবকিছু চেপে গিয়েছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে আশা করেছিলাম– তদন্ত হবে, দোষীরা শাস্তি পাবে। কিন্তু বর্তমান প্রশাসনও দুর্নীতিকে লায় দিতে একই পথে হাঁটছে।

 

 

এ ব্যাপারে উপাচার্য অধ্যাপক কামরুল আহসান স্ট্রিমকে বলেন, সরকার কোনো বিষয়ে তদন্তের উদ্যোগ নিলে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আবার প্রয়োজন আছে কিনা সেটি একটি বিষয়। তবে ইউজিসি কোনো সহায়তা চাইলে, আমরা করব।

 

 

২০১৮ সালের ২৩ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) জাবির অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পে এক হাজার ৪৪৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকা বরাদ্দ অনুমোদন দেয়। ২০১৯ সালের জুনে ছয়টি আবাসিক হলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়। এরপর তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতাদের বিরুদ্ধে প্রকল্প থেকে দুই কোটি টাকা ‘ঈদ সেলামি’ হিসেবে চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

 

 

এ ঘটনায় ২০১৯ সালের আগস্টে আন্দোলনে নামেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। কয়েক মাসব্যাপী ওই আন্দোলন এক পর্যায়ে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের অপসারণের দাবিতে রূপ নিয়েছিল। শেষমেষ উপাচার্য টিকে গেলেও, ছাত্রলীগের শীর্ষ পদ হারাতে হয় শোভন ও রাব্বানীকে।

 

 

উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে ছাত্রলীগকে চাঁদা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন উপাচার্য ফারজানা ইসলাম। তবে তিনি জানিয়েছিলেন, ছাত্রলীগের সে সময়ের নেতারা তাঁর কাছে কমিশন চেয়েছিলেন।

 

 

আন্দোলনকারীদের লিখিত অভিযোগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ইউজিসি তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করে। আহ্বায়ক করা হয় ইউজিসির তৎকালীন জ্যেষ্ঠ সদস্য অধ্যাপক দিল আফরোজ বেগমকে। ইউজিসির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সিনিয়র সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ গোলাম দস্তগীরকে মহাসচিব ও সদস্য করা হয় অধ্যাপক মুহাম্মদ আলমগীরকে। পরে কমিটির প্রধান হন অধ্যাপক মুহাম্মদ আলমগীর। অধ্যাপক মুহাম্মদ আলমগীর তদন্তে অপারগতা জানিয়ে ইউজিসির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগকে নতুন করে কমিটি করার পরামর্শ দেন।

 

 

তদন্ত কমিটির এক সদস্য স্ট্রিমকে বলেন, কমিটি কিছু কাজ করেছিল। ইস্যু ছিল দুটি– প্রকল্পে অনিয়ম ও পরিবেশগত দিক ঠিক না রাখা। আমরা তদন্তের সময় দরপত্রে অসঙ্গতি পেয়েছি। অনেকেই দরপত্র জমা দিতে পারেননি। কিন্তু কোনো এক কারণে ওই তদন্ত আর এগোয়নি।

 

 

তদন্ত কমিটির সদস্যসচিব মোহাম্মদ গোলাম দস্তগীর বর্তমানে ইউজিসির জেনারেল সার্ভিসেস অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের উপপরিচালক। তিনি বলেছেন, কমিটির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন করে তদন্তের জন্য বলা হয়েছিল। পরে কী হয়েছে, জানি না।

 

 

ইতিমধ্যে ছয়টি আবাসিক হলের নির্মাণকাজ শেষে শিক্ষার্থীরা বসবাস করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচার থিয়েটার হল, গ্রন্থাগার, শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোয়ার্টার নির্মাণও প্রায় শেষ। কিন্তু গত ছয় বছর ধরে ইউজিসি অনিয়ম তদন্তে গড়িমসি করে চলেছে। ইউজিসির কর্মকর্তারা জানান, ইউজিসির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগ বিষয়টি তদন্তে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। মাঝে কয়েকবার সরেজমিন পরিদর্শন ও নথিপত্র চাইলেও, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে এসব নেওয়ার বিষয়ে কোনো তৎপরতা নেই।

 

 

এ ব্যাপারে ইউজিসির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক শাহ মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম বলেছেন, আমরা নতুন করে তদন্ত কমিটি করিনি। কিন্তু প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নথি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে চেয়েছি। কিছু পেয়েছি। বাকিগুলোর জন্য শিগগির তাগাদা দেওয়া হবে।

 

 

তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক ভূমিকম্পে উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় নির্মিত হলে ফাটল দেখা দিয়েছে। আমরা হল পরিদর্শনে যাব। তখন উন্নয়ন প্রকল্পের সামগ্রিক বিষয় এবং অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখব।