সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরের বিশাল ভূমিভান্ডার দখল করতে ‘ফিল্মি স্টাইল’ কৌশল নেয় চট্টগ্রামের প্রভাবশালী গোষ্ঠী। তারা শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিনের নেতৃত্বাধীন ছিন্নমূল পরিবারের সদস্যদের ঢাল হিসাবে ব্যবহার করেছে। জমি দখলমুক্ত করার অভিযান ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ বায়েজিদ বাইপাস সড়ক অবরোধে এসব পরিবারকে ব্যবহার করত। আওয়ামী লীগ আমলের ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ প্রকাশ্যে উচ্ছেদ অভিযান চালানোর কথা বললেও নিজেও করেছেন দখল। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ইউনূস সরকারের সময়ও দখল করে প্রভাবশালী চৌধুরী পরিবার। ছিন্নমূল পরিবারের সদস্যরা বারবার এখান থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তাদের জোর করে আটকে রাখা হতো। তারা বের হওয়ার চেষ্টা করলেই চলত নির্যাতন। আওয়ামী লীগের শেষ ৫ বছর প্রভাবশালীরা পাহাড় দখলের প্রতিযোগিতা চালায়।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, আওয়ামী লীগ আমলে জঙ্গল সলিমপুরের এই জমি উদ্ধারে যেমন উদ্যোগ নেওয়া হয়, তেমনই উজাড়ও হয়েছে। বিগত সরকারের সময় জেলা প্রশাসনের প্রতিবেদনে ৯শ একর জমি উদ্ধারের কথা বলা হয়। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সেগুলোও দখল হয়েছে। ভূমি রেকর্ডপত্রের তথ্য অনুযায়ী সবই এখন উজাড়। কোনো ফল পায়নি প্রশাসন। বিপরীতে শক্তিশালী করেছে ছিন্নমূল জনগোষ্ঠীকে। জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমূল বস্তিতে বসবাসকারী কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া যায়। নামপরিচয় গোপন রাখার শর্তে একাধিক ব্যক্তি যুগান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগ আমলের শেষ ৫ বছরে জঙ্গল সলিমপুরের সর্বনাশ হয়েছে।
গরিব মানুষের সামনে রেখে পেছনে থেকে পাহাড়, গাছ, বালু বিক্রি করে প্লটের ব্যবসা করেছেন প্রভাবশালীরা। এখন বলির পাঁঠা ইয়াসিনসহ তার সাঙ্গোপাঙ্গরা। এভাবেই শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে নেপথ্যের গডফাদাররা। যে কারণে দিনের পর দিন ভূমি অফিসের খাস তালিকা থেকে জমির পরিমাণ কমেছে।
পুলিশের তালিকায় ইয়াসিনকে শীর্ষ সন্ত্রাসী করে রাখা হলেও প্রভাবশালীদের তদবিরে তাকে সেভাবে গ্রেফতার করা হয়নি। ২০২২ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান ইয়াসিনকে গ্রেফতারের পর প্রভাবশালীরা সরকারের মাস্টার প্ল্যানই নস্যাতের উদ্যোগ নেয়। ছিন্নমূল পরিবারের ২০/২৫ জনকে সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত করে ফায়দা লুটেছে প্রভাবশালীরা।
প্রশাসনও স্বীকার করেছে ‘ঘটনা সত্য’ : ছিন্নমূল পরিবারের দেওয়া এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন জেলা প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা। জেলা প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। প্রভাবশালীদের টার্গেট হওয়ার ভয়ে কেউই এখন আর মুখ খুলতে চান না। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মর্যাদার একজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ২০২২ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মমিনুর রহমান যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, সেটি যদি কার্যকর করা হতো আজ শত শত একর জমি এভাবে বিলীন হয়ে যেত না। দেশের শাসনভার যারা নিয়ন্ত্রণ করেন, তাদের উপস্থিতিতে নেওয়া সিদ্ধান্ত হারিয়ে গেছে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, একদিকে দখলমুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা অভিনব কৌশলে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। ১৫ বছরে চট্টগ্রাম জেলায় পাহাড়ধসে অন্তত আড়াইশ মানুষ মারা যায়। হাজারেরও বেশি আহত হয়েছে। জঙ্গল সলিমপুরে পাহাড় এবং টিলা কেটে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় অবৈধ এবং অপরিকল্পিত বসতি স্থাপনের ফলে এখানেও যে কোনো সময় পাহাড়ধসে জানমালের অকল্পনীয় ক্ষয়ক্ষতি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। জঙ্গল সলিমপুরে গত কয়েক বছরে পাহাড়ধসের ঘটনায় অনেক প্রাণহানি ঘটেছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বর্ষা মৌসুমে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে বসবাসকারীদের সরিয়ে নেয় জেলা প্রশাসন। অন্যদিকে ভূমিদস্যুরা নিরীহ ও ছিন্নমূল মানুষকে ব্যবহার করে পুনরায় তাদের এসব ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাস করতে বাধ্য করে। পাহাড়গুলো নিজেদের দখলে রাখতেই এমন কৌশল নেয়। দিনে-রাতে পাহাড় কেটে দখলস্বত্ব বিক্রয় করে ভূমিদস্যুরা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। ফলে প্রতিনিয়ত পরিবেশ ভারসাম্যহীন হচ্ছে।
আছে মন্তব্য, নেই উদ্যোগ : আওয়ামী লীগের সময়ে গড়ে ওঠা প্রভাবশালীরা কতটা শক্তিশালী ছিল, এর প্রমাণ পাওয়া যায় মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়ন সংক্রান্ত সভার কার্যবিবরণীতে। সভায় উপস্থিত ছিলেন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রাণালয়ের তৎকালীন সচিব, গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানরা। কার্যবিবরণীতে উল্লিখিত প্রতিনিধিদের মতামত উপেক্ষা করে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের দখল বাণিজ্য চালানো হয়।
সভায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগরের অবৈধ দখলদারদের পেছনে যেসব গডফাদার আছেন, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। এ কাজে বাধা দেওয়ার জন্য কোনো ধরনের তদবির হলে তিনি মোকাবিলা করবেন বলে আশ্বস্ত করেন। এছাড়াও তিনি উচ্ছেদ কর্যক্রমে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন সব ধরনের সহযোগিতা করার আশ্বাস দেন। জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই-এর তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল টিএম জোবায়ের বলেন, জঙ্গল সলিমপুরের সন্ত্রাসীদের আটক করে আইনের আওতায় আনতে হবে। সরকারের সদিচ্ছা বাস্তবায়নে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ও ডিসির নেতৃত্বে টাস্কফোর্স গঠন করে কাজ করলে কিছু সময় লাগতে পারে, কিন্তু তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
সেখানে উপস্থিত অতিরিক্ত আইজিপি বলেন, জঙ্গল সলিমপুরের অবৈধ দখলের বিষয়টি দিনদিন বড় পর্যায়ে চলে গেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসন চাইলে সব বাধাবিপত্তি অতিক্রম করা সম্ভব। সরকার যদি শক্ত থাকে, তবে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা সম্ভব। উচ্ছেদের জন্য কর্মপরিকল্পনা করতে হবে। এক্ষেত্রে উচ্ছেদকালীন প্রয়োজনে সর্বোচ্চসংখ্যক ফোর্স মোতায়েন করা হবে। সিডিএ সরেজমিন মাস্টার প্ল্যান প্রস্তুত করবে; কিন্তু এর আগে অবৈধ দখলদারদের অবশ্যই উচ্ছেদ করতে হবে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব শহীদ উল্লাহ খন্দকার বলেন, প্রথমে সম্পূর্ণ জায়গা উচ্ছেদ করে খালি করা দরকার। একই সঙ্গে সিডিএ-এর মাস্টার প্ল্যান প্রণয়নের কাজও চালু রাখতে হবে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, অনেক সময় ভালো উদ্যোগকে আইনের ফাঁক-ফোকর ব্যবহার করে নস্যাৎ করা হয়। এজন্য আগে থেকেই এ বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়া দরকার। জমি বিভিন্ন সংস্থার অনুকূলে বরাদ্দের বিষয়ে আলোচনার আগে মাস্টার প্ল্যান করা জরুরি। তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম বাংলাদেশের কমার্শিয়াল লাইফলাইন। সুতরাং এ ধরনের অবৈধ দখলদারদের অবিলম্বে উচ্ছেদ করে এ লাইফলাইনকে সমুন্নত রাখতে হবে। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগ যে কোনো ধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছে।
র্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, সন্ত্রাসীরা যত শক্তিশালী হোক না কেন, আইন তাদের চেয়েও অনেক শক্তিশালী। তারা যাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এসব কর্মকাণ্ড ঘটাচ্ছে, তাদের থেকে সন্ত্রাসীদের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। উচ্ছেদ কার্যক্রমে খুব বেশি সময় নেওয়ার সুযোগ নেই।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, উচ্ছেদের পর ভূমির ব্যবহার না করলে জায়গা সরকারের দখলে রাখা সহজ হবে না। মাস্টার প্ল্যান এবং অবৈধ দখল উচ্ছেদের কাজ একই সঙ্গে চলমান রাখতে তিনি অনুরোধ করেন। তিনি বলেন, এখান থেকে সব অবৈধ দখলদারকে উচ্ছেদ করতে হবে। অবৈধ দখলদারদের এখানেই পুনর্বাসন করার কোনো সুযোগ নেই। পুনর্বাসনযোগ্যদের প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ, গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের মাধ্যমে পুনর্বাসন করা যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, প্রত্যাশী সংস্থার চাহিদার ওপর ভিত্তি করে ভূমি বরাদ্দ না করে মাস্টার প্ল্যানের মাধ্যমে একটি টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করে প্রত্যাশী সংস্থাকে ভূমি বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে।
চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি আনোয়ার হোসেন বলেন, অবৈধ দখলদারকে উচ্ছেদ করার পর তারা যাতে পুনরায় জায়গা বেদখল করতে না পারে, সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এজন্য চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের সভাপতিত্বে একটি কমিটি গঠন করা যেতে পারে। এ কমিটিতে বিভিন্ন অংশীজনকে অন্তর্ভুক্ত করে কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে।
সেনাবাহিনীর পক্ষে উপস্থিত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মশিউর রহমান বলেন, এ অবৈধ দখলদারকে উচ্ছেদ করার কার্যক্রম অত্যন্ত সুচিন্তিত ও পরিকল্পিতভাবে করা প্রয়োজন। তাদের পুনর্বাসনের বিষয়টিও অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার কামরুল হাসান বলেন, ৭০০ একর জায়গা উচ্ছেদ করে দখলমুক্ত করা হয়েছে। দখলমুক্ত জায়গা কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে বাউন্ডারি দেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে পুনরায় বেদখল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক বলেন, ভূমিদস্যুরা জালজালিয়াতির মাধ্যমে বিভিন্ন ডকুমেন্ট তৈরি করে জমি দখল করে। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের জাল ডকুমেন্ট তৈরি করতে না পারে, সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। আইজি প্রিজন ব্রিগেডিয়ার জেনালের এএসএম আনিসুল হক বলেন, এসব জালজালিয়াতি এবং অবৈধ দখলের পেছনে একশ্রেণির অসাধু সরকারি কর্মচারী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য জড়িত থাকেন। তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, যেসব সরকারি কমকর্তা-কর্মচারী ওই এলাকায় জমি কিনেছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার এসএম শফিউল্লাহ বলেন, উচ্ছেদের জন্য একটি নির্দিষ্ট টাইমলাইন নির্ধারণ করা জরুরি। জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগরের অবৈধ দখলদারদের অতি দ্রুত উচ্ছেদপূর্বক এ এলাকায় সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নতুবা শুধু চট্টগ্রাম নয়, ভবিষ্যতে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগরের দুষ্কৃতকারীরা হুমকি হয়ে উঠবে।