ব্যাংকগুলোর করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতের বিপুল অর্থ গেছে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল এবং শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। একটি ফরেনসিক অডিটে উঠে এসেছে এ তথ্য। এতে দেখা যায়, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) প্রত্যক্ষ প্রভাবে এসব অনুদান দেওয়া হয়। ওই সময়ে বিএবির চেয়ারম্যান ছিলেন নজরুল ইসলাম মজুমদার। তিনি ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসাবে পরিচিত ছিলেন। অডিট অনুযায়ী, ওই সময়ে ব্যাংকগুলো থেকে মোট ১ হাজার ২৪৩ কোটি টাকা অনুদান গেছে প্রধানমন্ত্রীর তহবিল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট এবং সূচনা ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। ফরেনসিক অডিটটি করেছে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি প্রতিষ্ঠান ‘এ কাশেম অ্যান্ড কোং’। ২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নজরুল ইসলাম মজুমদারের মেয়াদ শেষ হয়। এরপর গঠিত নতুন বিএবি বোর্ড এই অডিটের উদ্যোগ নেয়।
এর মধ্যে বিএবি সরাসরি সদস্য ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ১০৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করে পরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পাঠায়। বাকি ১ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা বিএবির পাঠানো অনুরোধপত্রের ভিত্তিতে ব্যাংকগুলো সরাসরি দেয়। অডিটররা আরও ৫৬৫ কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য পেয়েছেন, যা একই ধরনের প্রতিষ্ঠানে দেওয়া হয়েছিল। তবে এ অর্থ বিএবির অনুরোধে দেওয়া হয়েছিল কি না, তার পক্ষে কোনো চাহিদাপত্র বা দালিলিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সব মিলিয়ে ১০ বছরে ২৯টি ব্যাংক ১ হাজার ৮০৯ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছে। এটি ব্যাংকগুলোর মোট করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর ব্যয়ের প্রায় ২৪ শতাংশ। অডিটে বলা হয়, এসব অনুদান অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাংকগুলোর নিজস্ব সিএসআর পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
অডিটে দেখা গেছে, ত্রাণ, বন্যা মোকাবিলা ও শিক্ষা সহায়তার নামে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে ১ হাজার ১১১ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টে ৩৭৪ কোটি টাকা অনুদান দেওয়া হয়। এর প্রায় অর্ধেক অর্থ ব্যয় হয়েছে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে।
সূচনা ফাউন্ডেশন পেয়েছে প্রায় ২৬ কোটি টাকা। বাকি অর্থ বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন, শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদ এবং ২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টের চেয়ারপারসন ছিলেন। আর তার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ ছিলেন সূচনা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারপারসন।
এছাড়া বিএবির সদস্য ব্যাংকগুলোকে চাপ দিয়ে সূচনা ফাউন্ডেশনের হিসাবে ৩৩ কোটি ৫ লাখ টাকা জমা করানোর অভিযোগও রয়েছে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। অডিট অনুযায়ী, শুধু মুজিববর্ষ উদযাপনের জন্যই ১৭৩ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছিল। এর বাইরে ৭৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে ক্রীড়া আয়োজন এবং শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের ওপর নির্মিত একটি চলচ্চিত্রের স্পন্সরশিপে।
অডিটররা গত এক দশকে ৫৩৩ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেন ও ব্যয়ের তথ্যও পেয়েছেন। এসব ব্যয়কে ‘অযোগ্য’ বা ‘সমর্থনহীন’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে, কারণ এগুলোর সঙ্গে ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সম্পর্ক পাওয়া যায়নি অথবা প্রয়োজনীয় নথিপত্র ছিল না। প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব ব্যয় সম্ভাব্য আর্থিক অব্যবস্থাপনার ইঙ্গিত দেয়।
এর মধ্যে প্রায় ৪৭০ কোটি টাকার অনুদানের তথ্য সদস্য ব্যাংকগুলো দিলেও তা নথিপত্র দিয়ে যাচাই করা যায়নি। অডিটে আরও ২৪ কোটি ৮০ লাখ টাকার অনুদানের তথ্য পাওয়া গেছে, যেগুলোর পক্ষে প্রাপকের স্বীকৃতি বা ব্যাংকিং নথি নেই। এছাড়া সমাপনী ব্যাংক হিসাবে ১৪ লাখ টাকা কম দেখানোর তথ্যও পাওয়া গেছে। ৯৯ লাখ টাকার নগদ অনুদান এবং অস্তিত্বহীন সরবরাহকারীর কাছ থেকে বা প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়া ৭৬ লাখ টাকার কেনাকাটার তথ্যও মিলেছে।
অডিটররা আরও কিছু অনিয়ম শনাক্ত করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে নথিপত্রহীন ওভারটাইম বিল, ব্যবসায়িক লেনদেনে ব্যক্তিগত ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার, কর্মচারীদের অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে টাকা পাঠানো, একটি চেকে একাধিক ভেন্ডারকে অর্থ পরিশোধ করা, অনিয়মিত প্রশিক্ষণ ও মিটিং খরচ, অনুমোদনহীন সম্মানি বৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য ভুয়া ইনভয়েস বা বিল। অডিটে আরও দেখা গেছে, অনুমোদন ছাড়াই ৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা এক খাত থেকে অন্য খাতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এক ঘটনায় ফিলিস্তিনিদের সহায়তার নামে তোলা অর্থ পরে অটিস্টিক শিশুদের একটি বিশেষায়িত স্কুলে দেওয়া হয়। আরেক ঘটনায় সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে সহায়তার কথা বলে অর্থ তোলা হলেও সেই অর্থের মধ্যে ১ কোটি টাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার কাছে অ্যাকাউন্ট-পেয়ি চেকের মাধ্যমে পাঠানো হয়।
পুরো সময় নজরুল ইসলাম মজুমদার বিএবির চেয়ারম্যান ছিলেন। নাসা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা নজরুলকে ২০২৪ সালের ২ অক্টোবর ঢাকার গুলশান এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। পরে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় যাত্রাবাড়ীতে এক আন্দোলনকারী নিহত হওয়ার মামলায় তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। তার বিরুদ্ধে ৭৮১ কোটি ৩১ লাখ টাকার অজ্ঞাত সম্পদ অর্জন এবং ১৬ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্যভিত্তিক অর্থ পাচারের অভিযোগও রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক এক্সিম ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে। এর মাধ্যমে সেখানে নজরুলের দীর্ঘদিনের প্রভাবের অবসান ঘটে। গণ-অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা ভারতে চলে যান। আর সায়মা ওয়াজেদ বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন।