নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী দেশের বিদ্যমান সংবিধান সংশোধনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। তবে এই প্রক্রিয়াটি এককভাবে নয়, বরং যুগপৎ আন্দোলন এবং রাজনৈতিক জোটে থাকা শরিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে ঐকমত্যের ভিত্তিতেই করতে চায় দলটি। বিএনপির নীতিনির্ধারণী সূত্র থেকে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা জানান, বর্তমান সংবিধানের বেশ কিছু ধারা ও উপধারা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংবিধানে ক্ষমতার ভারসাম্য আনা জরুরি। আর এই পরিবর্তনের রূপরেখা তৈরি করা হবে জোটবদ্ধ শরিক দলের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে।
সংবিধান সংশোধনের এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধীদলীয় জোটকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিলেও তাদের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। এরই মধ্যে জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে সংবিধান সংশোধনের সঙ্গে তারা নেই। রাষ্ট্র সংস্কারের অংশ হিসেবে বিদ্যমান সংবিধান সংস্কারের পক্ষে তারা। কিন্তু ক্ষমতাসীন বিএনপি জানিয়েছে, সংবিধানসংশ্লিষ্ট বেশ কিছু বিষয় তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে ছিল। জনগণ ভোট দিয়ে তাদের সেই ইশতেহার পালন করতে ম্যান্ডেট দিয়েছে। তাই তাদের ওই ম্যান্ডেটকে সম্মান জানাতেই বিদ্যমান সংবিধান সংশোধনের কাজ শিগগিরই হাত দেওয়া হবে। আগামী ৭ জুন থেকে শুরু হতে যাওয়া সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করা হবে। ওই কমিটি গঠনের আগমুহূর্ত পর্যন্ত বিএনপির পক্ষ থেকে বিরোধী জোটের এমপিদের সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করা হবে। শেষ পর্যন্ত তারা কমিটিতে না এলে বিএনপি তাদের জোটের শরিক দলগুলোকে নিয়ে কমিটি গঠন করে সংবিধান সংশোধন করবে।
সংসদের প্রথম অধিবেশনে সরকারি জোটের পক্ষ থেকে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হয়। এজন্য ১৭ সদস্যের তালিকার প্রস্তাব করা হয়। এতে সরকারদলীয় জোট থেকে ১২ ও বিরোধীদলীয় জোট থেকে ৫ জন নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সরকারদলীয় জোট থেকে ৭ জন এবং গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) ও স্বতন্ত্র থেকে ৫ জনকে রাখার সিদ্ধান্ত হয়। বিরোধী দলের কাছে ৫ জনের নাম চাওয়া হলেও কারও নাম দেওয়া হয়নি। যে কারণে আটকে যায় বিশেষ কমিটি গঠন।
জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়, সংবিধান সংশোধনে তারা আগ্রহী নয়। সংবিধান সংস্কারের জন্য জনগণ তাদের ম্যান্ডেট দিয়েছে। তাই জামায়াত সংশোধনে নেই, সংস্কারে আছে। এ প্রসঙ্গে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সিরাজগঞ্জ-৪ আসন থেকে নির্বাচিত এমপি রফিকুল ইসলাম খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘শুরু থেকেই সংবিধান সংস্কারের পক্ষে আমাদের মত, সংশোধন নয়। আমরা দলীয় অবস্থান পরিবর্তন করিনি। অর্থাৎ আমরা সংবিধান সংশোধনে নেই।’
তবে সরকারদলীয় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিরোধী জোটের জন্য অপেক্ষা করব। আশা করি, তারা এ উদ্যোগে ইতিবাচক সাড়া দেবে।’ অন্যদিকে সরকারদলীয় এমপি শাহাদাত হোসেন সেলিম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘জন-আকাক্সক্ষার সঙ্গে মিল রেখে সংবিধানকে সংশোধন করতে হবে। সংসদীয় গণতন্ত্রে সুন্দর চর্চা হয় যদি সবাই সেখানে থাকে। আর যদি সবার অংশগ্রহণ না থাকে তাহলে সেটা তো স্থগিত রাখা যাবে না। কাজ চলমান থাকবে। বিএনপি সেই কাজ করার মতো প্রয়োজনীয়সংখ্যক সমর্থন পেয়েছে।’ তিনি বলেন, জনগণের প্রতি বিএনপির যে অঙ্গীকার রয়েছে অর্থাৎ সংবিধানের যেসব ধারা সংযোজন বা বিয়োজন করা প্রয়োজন বিএনপি তা করবে। সংশ্লিষ্টরা জানান, বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে সাংবিধানিক সংস্কারে ৩৫টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে।
২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সেগুলো বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে এ ইশতেহারে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে সংবিধানে পুনঃস্থাপন করা, জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন, একজন উপরাষ্ট্রপতির পদ সৃষ্টি, প্রধানমন্ত্রী পদে এক ব্যক্তির সর্বোচ্চ ১০ বছর থাকার বিধান, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য সৃষ্টি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, সংসদে ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ প্রবর্তন, দুইজন ডেপুটি স্পিকার পদ সৃষ্টি, উচ্চকক্ষে ১০ শতাংশ নারী রাখা, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন, দলনিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের দুইজন বিচারপতির মধ্য থেকে একজনকে প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ দেওয়া ইত্যাদি।