Image description
 

বাংলাদেশের ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়ার মতো নেত্রীর জীবন বিশ্লেষণ করলে একটি কঠিন সত্য সামনে আসে: শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব হলো এমন একটি ভূমিকা, যেখানে ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য রাষ্ট্রের প্রয়োজনে স্বেচ্ছায় বিসর্জন দিতে হয়। দীর্ঘ চার দশক ধরে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দেওয়া, তিনবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এবং একাধিকবার কারাবরণ—এই সবকিছু মিলিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত সত্তা অনিবার্যভাবে রাজনীতির সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে।

 


খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক যাত্রা শুরুর পর থেকেই তাঁর পারিবারিক জীবন ক্রমশ জনপরিসরের আড়ালে চলে যায়। স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুর পর যখন তিনি রাজনীতির গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন, তখন তাঁর পরিচিতি আর শুধু একজন স্ত্রী বা মা হিসেবে থাকেনি; তিনি হয়ে ওঠেন একটি আদর্শের প্রতীক।

প্রধানমন্ত্রী এবং দলীয় প্রধান হিসেবে তাঁর দিনের বেশিরভাগ সময় ব্যয় হয়েছে রাষ্ট্রীয় কাজ ও রাজনৈতিক সংগ্রামে। এর ফলে দুই পুত্র—তারেক রহমান ও প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকো-এর জন্য তিনি স্বাভাবিক পারিবারিক সময় দিতে পারেননি। রাজনীতি ও রাষ্ট্রের প্রতি কর্তব্যের দাবি ব্যক্তিগত সম্পর্কের দাবিকে স্থায়ীভাবে ছাপিয়ে গেছে।

 

এমনকি ব্যক্তিগত জীবনের চরমতম ক্ষতি (যেমন: সন্তানের অকালমৃত্যু) তাঁকে জনসমক্ষে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবেই বহন করতে হয়েছে। একজন সাধারণ মানুষের মতো ব্যক্তিগত শোক বা আবেগ প্রকাশের সুযোগ তাঁর ছিল না।

 

রাজনৈতিক আদর্শের প্রতীক হওয়ার কারণে খালেদা জিয়া তাঁর ব্যক্তিগত স্বাধীনতা চিরতরে হারিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রটোকল এবং গণনজরদারির কারণে তাঁর চলাফেরা ও গতিবিধি সবসময় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত ছিল।

তাঁর ব্যক্তিগত আবেগ, স্বাস্থ্য এবং গতিবিধি সবকিছুই রাষ্ট্রের সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। একসময় দেশের সর্বোচ্চ নির্বাহী থাকা সত্ত্বেও, তিনি স্বেচ্ছায় নিজেকে এমন এক কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ করেছেন, যেখানে তাঁর নিজস্ব মানবিক দুর্বলতা বা চাওয়া-পাওয়ার কোনো স্থান নেই।

তাঁর জীবনের এই বিসর্জন শেষ বয়সে এসেও শেষ হয়নি। দীর্ঘ রাজনৈতিক চাপ, কারাবাস এবং চলমান স্বাস্থ্য জটিলতা প্রমাণ করে যে তাঁর শরীরের অসুস্থতাও আর ব্যক্তিগত বিষয় থাকেনি। তাঁর চিকিৎসা, মুক্তি এবং সুস্থতা সংক্রান্ত প্রতিটি বিষয় জাতীয় রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে।

বর্তমানে তিনি হাসপাতালের সিসিইউতে চিকিৎসাধীন। অন্য কোনো সাধারণ নাগরিকের ক্ষেত্রে যা একান্ত ব্যক্তিগত বা পারিবারিক যত্নের বিষয়, বেগম খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে তা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।

বেগম খালেদা জিয়ার মতো জননেত্রীর জীবন হলো ব্যক্তিগত ত্যাগের এক নীরব দলিল। শীর্ষ নেতৃত্ব হলো এমন একটি ভূমিকা যেখানে নিজের আকাঙ্ক্ষা, পরিবার এবং স্বাভাবিক জীবনের সুযোগকে রাষ্ট্রের বৃহত্তর প্রয়োজনে রাজনীতি এবং ইতিহাসের কাছে উৎসর্গ করতে হয়। আর এই নিঃশর্ত উৎসর্গই তাঁকে ইতিহাসের পাতায় স্থায়ীভাবে স্থান করে দিয়েছে।

শেখ ফরিদ

কবি ও গণমাধ্যমকর্মী