বিএনপির নীতি নির্ধারক ও সমর্থকদের একটি বড় অংশ মনে করে আওয়ামীলীগের মতো বিরোধী দল দরকার। না হলে সরকার পরিচালনা করে মজা পাওয়া যায় না। তারা আরো মনে করে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ সংসদে একাই বিরোধী দলকে শুয়ে ফেলেছে। এই বিরোধী দল মাজুর বা দূর্বল। আজকে ঝিনাইদহে তারেক রেজাকে গ্রেফতার এবং এর আগে শাহবাগ থানার ভেতরে ডাকসু নেতাদের ওপর হামলা পুরানো রাজনৈতিক চরিত্রের বহি:প্রকাশ।
আওয়ামীলীগ যদি বিরোধী দলে থাকতো এই তিন মাসে সরকারকে কী ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হতো আমরা তা ভেবে দেখতে পারি।
১. আওয়ামীলীগ যদি বিরোধী দলে থাকতো জ্বালানী তেলের দাম বাড়া নিয়ে নিশ্চিত ভাবে হরতাল ডাকতো। বিশেষ করে ইরানের রাষ্ট্রদূত যখন নিজে বলেছিলেন তারা বাংলাদেশ সরকারের ভুমিকায় খুশী নন।
২. সারা দেশে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি সামাজিক - সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো রাস্তায় নেমে আসতো।
৩. পদ্মা ও তিস্তা ব্যারাজ নির্মানে দৃঢ় অবস্থান, প্রতিরক্ষা বাহিনী শক্তিশালী করার পদক্ষেপ ও সীমান্ত সুরক্ষায় বিজিবিকে সক্রিয় করার জন্য সরকারের ভারত বিরোধী পদক্ষেপ নেয়ার জন্য অভিযুক্ত করা হতো। বন্ধু রাষ্ট্রের সাথে সর্ম্পক খারাপ করা হচ্ছে, পাকিস্তানপন্থীদের লালন - পালন করার অভিযোগ আনা হতো।
এখন সংসদে ও সংসদের বাইরে জামায়াত ও এনসিপি বার বার বলছে সরকারের ভালো কাজে তারা সহায়তা করবে। বিএনপির নেতাকর্মীরা এ ধরনের বক্তব্যকে দেখছে দূর্বল বিরোধী দলের চরিত্র হিসাবে। কিন্তু তারা একবারও ভেবে দেখছে না নির্বাচনে তারা ২শর বেশি আসন পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্টতা পেলেও ভোটের চিত্র ভিন্নরকম বার্তা দিচ্ছে।
বিএনপি ৪৯ শতাংশ ভোট পেয়েছে অপরদিকে জামায়াত- এনসিপি ৩৮ শতাংশ ভোট পেয়েছে। জামায়াতের ভোট যদি ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০ শতাংশ হয়ে থাকে তাহলেও বাকি ১৮ শতাংশ ভোট এসেছে বিএনপির সমর্থকদের কাছ থেকে।
অপরদিকে সংখ্যালঘু ও আওয়ামীলীগের ২০ শতাংশ ভোট বিএনপি পেয়েছে। আওয়ামীলীগ ফিরে আসলে আওয়ামীলীগের ভোট সে দিকে চলে যাবে। তখন বিএনপির ভোট দাড়াবে ৩০ শতাংশের নীচে।
দিন যত যাবে বিএনপির পক্ষে মানুষের আওয়াজ কমে আসবে। কারন আওয়ামী সমর্থক যে ২০ শতাংশ ভোটার বিএনপিকে ভোট দিয়েছিলো তারা বিএনপির পক্ষে আওয়াজ তুলবে না। কারন তারা আছে আপার অপেক্ষায়। তারেক সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য ভারতও এখন আপা কার্ড খেলতে শুরু করেছে । এখন বিরোধী দলের ওপর সরকার যদি নিপীড়নের পথে যায় তাহলে বিএনপির পক্ষে ২৯ শতাংশ মানুষের আওয়াজ শুধু পাবে। ৫৮ শতাংশ মানুষ সরকারের বিরোধিতা করতে থাকবে। এর ফলে চারদিকে মনে হবে, সরকার দেশ চালাতে পারছে না। সরকারের ভালো পদক্ষেপ নিয়ে কোনো আলোচনাই হবে না।
ইতোমধ্যে আমরা তার প্রমান দেখতে পাচ্ছি। এই যে পদ্মা- তিস্তা নিয়ে দৃঢ় অবস্থান, সীমান্ত ও প্রতিরক্ষা নিয়ে সুদৃঢ় প্রসারী পরিকল্পনা, গ্রীস্ম মওসুমে বিদ্যুত সমস্যা নিয়ন্ত্রনে রাখার মতো বিষয় নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। অথচ এগুলো হতে পারতো সরকারের বড় অর্জন। যেগুলো নিয়ে গনমাধ্যমে কোনো আলোচনায় নেই। অদ্ভুত ভাবে সরকার সমর্থক টকশো জীবীরা বিরোধী দল কতটা ব্যর্থ তা নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত। ঠিক আওয়ামী আমলে সরকারের সমালোচনার চেয়ে বিএনপি - জামায়াতের আন্দোলন কেন ব্যর্থ তা নিয়ে যেমন আলোচনা হতো। তখন আওয়ামী টকশোজীবীরা বলতো বিএনপি জামায়াত না ছাড়লে দেশের রাজনীতি পরিশুদ্ধ হবে না। এখন বিএনপি সমর্থকরা একই ভাষায় বলেন, এনসিপি কেন জামাতের সাথে জোট করেছে। এতে এনসিপির ভবিষ্যত অন্ধকার। কি অদ্ভুত মিল।
আওয়ামী স্টাইলে টকশোজীবীদের এসব বক্তব্য আওয়ামী আমলের মতো মানুষের কাছে কানের অত্যাচার মনে হচ্ছে । এর সাথে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের থানার মধ্যে হামলা, নাসির উদ্দিন পাটোয়ারির ওপর হামলা কিংবা তারেক রেজাকে গ্রেফতারের মাধ্যমে জুলাইয়ের প্রজন্মের কাছে নৌকা আর ধানের শীষ দুই সাপের একই বিষ - বামদের এই শ্লোগান সামনে চলে আসছে।
এসব পদক্ষেপ থেকে বিএনপি কেমন বিরোধী দল চায় তার আলামত আমরা দেখতে পারছি। কিন্তু বিএনপিকে ভুলে গেলে চলবে না তারা ক্ষমতায় থাকতে আওয়ামীলীগকে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছে। দেশের ভঙ্গুর অবস্থায় দিল্লির আশ্রয়ে থাকা আওয়ামী শত্রুকে সামনে রেখে বিরোধী দলের ওপর দমন পীড়নের রাজনীতি বিএনপির জন্য আত্নহত্যার শামিল হতে পারে।
-আলফাজ আনাম, সাংবাদিক