রক্তের ভুল গ্রুপ নির্ণয় দেশে নতুন স্বাস্থ্য সমস্যার সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি অস্বাভাবিক হারে এ সমস্যা বেড়েছে। ফলে রোগীর শরীরে ভুল রক্ত পরিসঞ্চালন হচ্ছে। এতে অসংখ্য রোগী মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যায় পতিত হচ্ছে, এমনকি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। এজন্য মেয়াদোত্তীর্ণ ও ভেজাল রিএজেন্ট ব্যবহার এবং ‘ফরোয়ার্ড ও রিভার্স’ পদ্ধতিতে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় না করাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, দেশে বছরে প্রায় ৯ লাখ ৫০ হাজার ব্যাগ রক্ত পরিসঞ্চালিত হয়। প্রতিদিনের গড় হিসাব করলে প্রায় ২ হাজার ৬০০ ব্যাগ। এর মধ্যে যদি ১০ শতাংশ ভুল গ্রুপিং ও ভুল পরিসঞ্চালনের শিকার হয়, তাহলে ৯৫ হাজার মানুষের জীবন বিপন্ন হবে। যারা মূলত দুর্ঘটনা, অসুস্থতা বা অস্ত্রোপচারের রোগী।
গত ২২ নভেম্বর ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক মালিবাগ শাখা থেকে একজন রোগীর রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করা হয় ‘এবি’ পজিটিভ। সেই রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে তীব্র রক্তশূন্যতায় ভোগা ওই রোগীর শরীরে ‘এবি’ গ্রুপের রক্ত পরিসঞ্চালন করা হয়। কিন্তু রক্ত দেওয়ার পরও রোগীর রক্তশূন্যতার পরিবর্তন না হয়ে উল্টো তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরিস্থিতি বিবেচনায় পপুলার ডায়াগনস্টিকে ফের রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করে দেখা যায়, তার গ্রুপ ‘ও’ পজিটিভ। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগ থেকে ভুল গ্রুপিংয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
এর আগে ৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এনআইসিইউতে চিকিৎসাধীন এক শিশুর শরীরে একইভাবে ভুল গ্রুপের রক্ত পরিসঞ্চালন করা হয়। পপুলার ডায়াগনস্টিক ‘এ’ পজিটিভ গ্রুপ নির্ণয় করে। কিন্তু শিশুটির রক্তের গ্রুপ ছিল ‘বি’ পজিটিভ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এনআইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটির শরীরে ‘এ’ পজিটিভ রক্ত পরিসঞ্চালন করা হয়। ‘বি’ পজিটিভ রক্তের পরিবর্তে ‘এ’ পজিটিভ রক্ত দেওয়ায় শিশুটির শরীরে জন্ডিসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, তার রক্তের গ্রুপ ‘বি’ পজিটিভ। কিন্তু ‘এ’ গ্রুপ দেওয়ায় তার শরীরে একটি অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে এই শিশুর রক্তের প্রয়োজন হলে পরিসঞ্চালন করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
গত ১৫ মে, পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একজন রোগীর রক্তের গ্রুপ ‘এবি’ পজিটিভ নির্ণয় করা হয়, যা ছিল সম্পূর্ণ ভুল। পরবর্তী সময়ে ল্যাবএইড এবং উৎসর্গ ফাউন্ডেশন ব্লাড ব্যাংকে পরীক্ষা করা হলে তারাও রক্তের গ্রুপ ‘এবি’ পজিটিভ হিসেবে উল্লেখ করে। ষাটোর্ধ্ব এই নারী রোগীর রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা খুব কম থাকায় গ্রুপ নির্ণয়ের পর তার শরীরে তিন ব্যাগ রক্ত পরিসঞ্চালন করা হয়। এতে রোগীর কিডনি বিকল হয়ে পড়ে। অবস্থার অবনতি হলে রোগীকে ঢাকার পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে আনা হয়। সেখানে ফের তার রক্তের গ্রুপ ‘ফরোয়ার্ড ও রিভার্স’ পদ্ধতিতে নির্ণয় করে দেখা যায়, আগের সব প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট ভুল ছিল। তার প্রকৃত রক্তের গ্রুপ ছিল ‘এ’ পজিটিভ।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন ঘটনা দেশে একটি, দুটি বা তিনটি নয়, বরং নৈমিত্তিক বিষয়ে
পরিণত হয়েছে। কারণ, দেশের বেশিরভাগ ডায়াগনস্টিক, ব্লাড ব্যাংক এবং ক্লিনিকে রক্তের গ্রুপ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে ভেজাল রি-এজেন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে ভুল গ্রুপিংয়ের কারণে অস্ত্রোপচার ও মুমূর্ষু রোগীদের শরীরে ভুল রক্ত পরিসঞ্চালন হচ্ছে। যা রোগীর সুস্থতার পরিবর্তে জীবনকে বিপন্ন করে তুলছে।
জানতে চাইলে ধানমন্ডির পপুলার ডায়াগনস্টিকের ল্যাবরেটরির ম্যানেজার মো. আসাদুর রহমান বলেন, রক্তের গ্রুপ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে মাঝে মাঝে জটিলতা দেখা দেয়। তবে একাধিক রি-এজেন্ট ব্যবহার করে সেটি আমরা নিশ্চিত করার চেষ্টা করি। এই সমস্যা সমাধানে আমরা অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র কেনার পরিকল্পনা করেছি।
জানা গেছে, বাংলাদেশে রক্তের গ্রুপ নির্ণয়ের জন্য রি-এজেন্ট আমদানি হয় মূলত ভারত থেকে। ট্রেডসওয়ার্থ নামের একটি কোম্পানি ‘টিউলিপ’ নামের একটি মানসম্মত রি-এজেন্ট আমদানি করে থাকে। তবে সেটি ব্যয়বহুল হওয়ায় ছোট হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক ও ব্লাড ব্যাংকগুলো সেটি ব্যবহার করে না। অন্যদিকে, ‘ডায়ামেড’ নামে একটি কোম্পানি ‘র্যাপিড ল্যাব’ নামে একটি রি-এজেন্ট স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এইচএসএম ওপির মাধ্যমে সরকারি প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করত। তবে ওপি বাতিল হওয়ায় সেটির সরবরাহও বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে দেশের বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাটলাস’ নামের রি-এজেন্ট ব্যবহার করে থাকে, যেটি সঠিক প্রক্রিয়ায় অনুমোদন ছাড়াই কিছু অসৎ ব্যবসায়ী লাগেজে করে দেশে আনে। পরে সেগুলোর সঙ্গে পানি মিশিয়ে একটি ভায়ালকে একাধিক ভায়ালে রূপান্তর করে বিক্রি করে। যেগুলো রাজধানীসহ সারাদেশের হাসপাতালে ও ডায়াগনস্টিকে ব্যবহৃত হয় এবং ভুল গ্রুপ নির্ণয় হয়।
একজন পরিসঞ্চালন বিশেষজ্ঞ বলেন, লাগেজের মাধ্যমে আসা ‘অ্যাটলাস’ রি-এজেন্টের সঙ্গে ডিস্টিলড ওয়াটার মিশিয়ে স্বল্প দামে বিক্রি করা হয়। সাধারণত বিএমএ মার্কেট, টিকাটুলী কেমিক্যাল মার্কেট এবং মিটফোর্ডে এসব রি-এজেন্ট বিক্রি হয়, যেখানে ‘টিউলিপ’-এর একটি ভায়ালের দাম দেড় হাজার টাকা, সেখানে পানি মেশানো একটি ‘অ্যাটলাস’ ভায়ালের দাম মাত্র ৭০০ বা ৮০০ টাকা। ফলে সরকারি বড় প্রতিষ্ঠান এবং করপোরেট হাসপাতালগুলো ছাড়া বেশি দামে কেউ
রি-এজেন্ট কেনেন না। এতেই সমস্যা তৈরি হয়।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রক্তরোগ বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক ডা. এম এ খান বলেন, গ্রুপ নির্ণয় এবং পরিসঞ্চালনে যদি এমন ভুল হয়ে থাকে, সেটিকে অবশ্যই নোটিশ করতে হবে। তদন্ত করে প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করতে হবে। কারণ, এভাবে সিভিয়ার মিসম্যাচ হলে রোগীর কিডনি বিকল, মাল্টি অর্গান ফেইলিউর, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
সামগ্রিক বিষয়ে ব্লাড ট্রান্সফিউশন সোসাইটি অব বাংলাদেশের (বিটিএসবি) সভাপতি অধ্যাপক ডা. ফারহানা ইসলাম নীলা বলেন, শুধু ভেজাল নয়, ছোট ছোট ব্লাড ব্যাংকগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ রি-এজেন্ট ব্যবহার করে থাকে, যা থেকে কখনো সঠিক ফল পাওয়া সম্ভব নয়। তাছাড়া শুধু তিন ফোঁটা রি-এজেন্ট দিয়ে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করা অনুমোদিত নয়। সঠিকভাবে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করতে হলে অবশ্যই সেল ও সেরাম, ‘ফরোয়ার্ড ও রিভার্স’ পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। অন্যথায় মিসম্যাচ হবে এবং রোগীর কিডনি বিকল, এমনকি জীবন বিপন্ন হতে পারে।