Image description
দেড় লাখ ইভিএম কেনা হয় ৩,৮২৫ কোটি টাকায় । গুদামভাড়ায় গত বছরের পর্যন্ত ব্যয় ৩ কোটি ৯২ লাখ । গত বছরের জুন পর্যন্ত ব্যবহার উপযোগী ছিল ৫০ হাজার ইভিএম ।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করবে না নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) থেকেও ইভিএম-সংক্রান্ত অংশ বাদ দিয়েছে বর্তমান ইসি। ভবিষ্যতে ইভিএম ব্যবহার করা হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। অথচ ‘প্রায় অকেজো’ ইভিএমগুলো রাখতে প্রতি মাসে মাঠপর্যায়ে সাড়ে ৩৩ লাখ টাকা গুদামভাড়া দিতে হচ্ছে কমিশনকে।

এ ছাড়া বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির (বিএমটিএফ) ওয়্যারহাউসে ইভিএম রাখার ভাড়া হিসাবে বকেয়া রয়েছে ৬২ কোটি টাকার বেশি। প্রকল্পের ডিপিপিতে ইভিএম সংরক্ষণের বিষয়টি না থাকায় জটিলতার কারণে এই বকেয়া পরিশোধ করতে পারছে না ইসি। সশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৮ সালে দেড় লাখ ইভিএম কিনতে ৩ হাজার ৮২৫ কোটি টাকার প্রকল্প পাস করা হয়েছিল। ১০ বছরের আয়ুষ্কালের এসব যন্ত্রের বেশির ভাগই ৫ বছরের মাথায় বিকল ও অকেজো হয়ে গেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন বর্তমান কমিশন আরপিওর সংশোধনীতে ইভিএম-সংক্রান্ত অংশ বাদ দেওয়ায় যন্ত্রগুলোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে গেছে।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘ইভিএম নিয়ে একটি কমিটি গঠিত হয়েছে। তারা কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আমি জানি না। বিষয়টি সরকারের নজরেও দেওয়া হয়েছে। সবকিছু বিবেচনা করে ইভিএমের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

ইসি সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত নয়টি অঞ্চলের ৪১ জেলায় ইভিএম রাখার গুদাম ছিল। এগুলোর মধ্যে ২০২২ সালের ১ জুলাই ৩০টি, ২২ জুলাই একটি, ২০২৩ সালের ১ মে একটি, ১ জুন একটি, ১ জুলাই তিনটি, ১ আগস্ট একটি, ১ সেপ্টেম্বর দুটি, ১ অক্টোবর তিনটি গুদাম ভাড়া নেওয়া হয়। ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ভ্যাটসহ এসব গুদামভাড়া বাবদ দেওয়া হয়েছে ৩ কোটি ৯২ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতি মাসে ভ্যাটসহ ভাড়া দিতে হয়েছে ৩৩ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। চুক্তি অনুযায়ী, কোনো গুদামের ভাড়া প্রতি বর্গফুটে সর্বোচ্চ ১৫ এবং সর্বনিম্ন ৬ টাকা ৯০ পয়সা। বর্তমানে গুদামের সংখ্যা কিছু কমানো হয়েছে।

এ বিষয়ে ইসির অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজ বলেন, নিজস্ব গুদাম না থাকায় ইভিএম সংরক্ষণে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। ইভিএমের ভবিষ্যৎ নিয়ে কমিশন এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।

ইসি সূত্র জানায়, বিএমটিএফ ওয়্যারহাউসে ইভিএম রাখার বকেয়া ভাড়া বাবদ ৬২ কোটি টাকার বেশি দাবি করা হয়েছে। তবে প্রকল্পের ডিপিপিতে ইভিএম সংরক্ষণের বিষয়টি না থাকায় বকেয়া টাকার বিষয়ে জটিলতা থাকায় পরিশোধ করতে পারছে না ইসি। অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি চালাচালি করেও বিষয়টির সুরাহা হয়নি।

ইভিএমের বিষয়ে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে রাষ্ট্রের অর্থ ব্যয় করা সমীচীন নয়। ইভিএমসহ ব্যর্থ প্রকল্পের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন সিদ্ধান্ত ঠেকাতে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি।

সূত্র জানায়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নেওয়া ইভিএম প্রকল্পটির মেয়াদ ছিল ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল। ইসির চাহিদার ভিত্তিতে পরে ব্যয় না বাড়িয়ে মেয়াদ ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত করে তৎকালীন সরকার। এরপর আর মেয়াদ বাড়ানো হয়নি। বর্তমানে দেড় লাখের মধ্যে ৮৬ হাজারের মতো ইভিএম প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান বিএমটিএফে সংরক্ষিত রয়েছে। প্রায় ৬২ হাজার যন্ত্র রয়েছে মাঠপর্যায়ে। নির্বাচন ভবনে রয়েছে প্রায় ১ হাজার ২০০ ইভিএম।

সূত্র আরও জানায়, ইভিএমের আয়ুষ্কাল ১০ বছর ধরা হলেও ৫ বছরের মাথায় অধিকাংশ অকেজো হয়ে যায়। ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ৪৫ থেকে ৫০ হাজার ইভিএম নির্বাচনে ব্যবহার উপযোগী ছিল। ৬০ থেকে ৭০ হাজার ইভিএম বিকল, তবে মেরামতযোগ্য। বাকিগুলো মেরামতযোগ্য ছিল না। বিগত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে ইসি বলেছিল, ১ লাখ ১০ হাজার ইভিএম মেরামতের জন্য ১ হাজার ২৬০ কোটি টাকা চেয়েছিল বিএমটিএফ। তবে তৎকালীন সরকার সে টাকা দেয়নি। ফলে ইভিএমগুলো সেভাবেই পড়ে রয়েছে।

২০১১ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে একটি ওয়ার্ডে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তৈরি ইভিএম প্রথম ব্যবহার করা হয়। পরে ছোট ছোট আকারে ইভিএম ব্যবহার শুরু হয়। ২০১৩ সালে রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে একটি ইভিএমের সমস্যার কারণে পরে আর ইভিএম ব্যবহার করা হয়নি। এরপর কে এম নূরুল হুদা নেতৃত্বাধীন সাবেক কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়। বিএমটিএফ কমিশনের জন্য ইভিএম তৈরি করে। সেই ইভিএম ২০১৭ সালে রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে একটি ওয়ার্ডের ছয়টি কক্ষে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হয়। এরপর দেড় লাখ ইভিএম কিনতে ২০১৮ সালে ৩ হাজার ৮২৫ কোটি টাকার প্রকল্প পাস হয়। তবে ইভিএম কোথায় রাখা হবে, তা প্রকল্পে উল্লেখ না করেই একসঙ্গে এতগুলো কেনা হয়।

জানা যায়, ২০২৪ সালের ২৬ জুন একটি পৌরসভার সাধারণ ও চারটি পৌরসভার উপনির্বাচনে সর্বশেষ ইভিএম ব্যবহার করা হয়। ২০২৩ সালের ২৬ জুন পর্যন্ত ইসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইভিএমে ১ হাজার ১৪৩টি নির্বাচন করা হয়েছে। সেগুলো হলো একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৬টি আসনে, ১৩টি শূন্য আসনে উপনির্বাচন, সাতটি সিটি করপোরেশন, সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন ওয়ার্ডের ৭টিতে উপনির্বাচন, ৬১টি জেলা পরিষদে সাধারণ নির্বাচন, ১৮১টি পৌরসভার সাধারণ নির্বাচন, পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডের ১৩টিতে উপনির্বাচন, ২২টি উপজেলায় সাধারণ নির্বাচন, ৬টিতে উপনির্বাচন, ৬৩১টি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাধারণ নির্বাচন এবং ১৯৩টি ইউপির বিভিন্ন ওয়ার্ডে উপনির্বাচন।