Image description
ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত : ৩৬ মাসের রায় বিশ্লেষণ

রাজধানীর কাফরুল থানা এলাকা থেকে মাদকসহ গ্রেপ্তার হন মো. মেহেদী হাসান। অভিযোগের সত্যতা পেয়ে ২০১৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর আদালতে চার্জশিট জমা দেয় পুলিশ। বিচার শুরুর পর মামলার এজাহারকারী ছাড়া অন্য ছয়জন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসেননি। ফলে একজন সাক্ষীর ওপর নির্ভর করে আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করা ঠিক নয় উল্লেখ করে ২০২২ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তাঁকে খালাস দেন আদালত।

এই মামলার মতো একই কারণে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ৩৬ মাসে নিষ্পত্তি হওয়া মামলার ৭৯ শতাংশ আসামি খালাস পেয়েছেন। বিচারপ্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষ এই আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী ইশরাত হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রায়ে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ার প্রধান কারণ হলো তদন্ত, প্রমাণ সংগ্রহ ও আদালতে উপস্থাপন, এই তিন পর্যায়ে বিভিন্ন ঘাটতি তৈরি হওয়া। অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীরা আদালতে নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য দেন না।

ভীতি বা প্রভাবের কারণে বক্তব্য পরিবর্তন করেন। অথবা তদন্তে তাঁদের জবানবন্দি সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করা হয় না। ঘটনাস্থলের ফরেনসিক, ডিজিটাল বা বস্তুগত প্রমাণ ঠিকভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ না হওয়ায় সেগুলো আদালতের মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্যতা হারায়। প্রমাণের চেইন অব কাস্টডি ভেঙে যাওয়াও বড় কারণ।

তিনি বলেন, ‘তদন্তে সময়ক্ষেপণ, প্রমাণ হারিয়ে যাওয়া বা দুর্বল অভিযোগপত্র আদালতে অভিযোগের উপাদান স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়। অনেক সময় রাষ্ট্রপক্ষও প্রমাণের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে পারে না। সাক্ষীদের সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হয় না এবং মামলাটি আদালতে প্রমাণিত হয় না। এসব কারণে আদালতে অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে শেষ পর্যন্ত আসামিরা খালাস পান।

ঢাকা মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, ‘অভিযোগপত্রে অনেক ভাসমান সাক্ষী থাকেন। তাঁদের পাওয়া যায় না। অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত বিচার মামলায় আসামির সঙ্গে বাদীপক্ষ আপস-মীমাংসা করে ফেলে। এসব কারণে অভিযুক্ত আসামিরা খালাস পেয়ে যান। তবে সাক্ষীদের হাজিরে সিআরপিসি সংশোধন করা হয়েছে। কোনো সাক্ষী অসুস্থ থাকলে বা আদালতে উপস্থিত হতে না পারলে অনলাইনে তাঁদের সাক্ষ্য গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এখন আর সাক্ষীর অভাবে কোনো আসামি সুবিধা পাবেন না। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।’

ওই ৩৬ মাসে নিষ্পত্তি হওয়া মামলার রায় বিশ্লেষণে আরো দেখা গেছে, এই সময় রায়ে ৩২ হাজার ২১০টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এসব মামলায় মোট আসামি ৩২ হাজার ৩৫০ জন। তাঁদের মধ্যে বিচারপ্রক্রিয়া শেষে মাত্র ছয় হাজার ৯৮৩ জনের সাজা হয়েছে। আর অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস পেয়েছেন ২৫ হাজার ৩৬৭ জন।

চলতি বছর জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় হাজার ৬১৪টি মামলা রায়ে নিষ্পত্তি হয়েছে। এসব মামলায় ছয় হাজার ৬৪৫ আসামিকে অভিযুক্ত করা হয়। রায়ে সাজা হয় এক হাজার ৪০৪ জনের, আর খালাস পেয়েছেন পাঁচ হাজার ২৪১ জন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৭৭৭ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৫৩৬ জন, মার্চে ৫১৬ জন, এপ্রিলে ৬৪৪ জন, মে মাসে ৯১৫ জন, জুনে ৫৪৫ জন, জুলাইয়ে ৭৮২ জন এবং আগস্টে ৫৪৮ জন আসামি খালাস পেয়েছেন।

এর আগে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চার মাসে পাঁচ হাজার ৭১৭টি মামলা রায়ে নিষ্পত্তি হয়। এতে এক হাজার ৩০ জন আসামির সাজা হয়। আর খালাস পান চার হাজার ৬৯১ জন আসামি।

২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১১ হাজার ৪৭০টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এসব মামলায় দুই হাজার ৬২৯ জন আসামির সাজা হয়। আর বেকসুর খালাস পান আট হাজার ৯৫৬ জন।

২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে আট হাজার ৪০৯টি। এসব মামলায় মোট আসামি আট হাজার ৪১৮ জন। তাঁদের মধ্যে সাজা হয়েছে এক হাজার ৯২০ জনের। খালাস পেয়েছেন ছয় হাজার ৪৭৯ জন।

আইনজ্ঞরা বলছেন, মামলা টিকছে না মূলত তদন্তের কিছু দুর্বলতার কারণে। ঘটনাস্থলের ফরেনসিক ও বস্তুগত প্রমাণ সঠিকভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ না করা, সাক্ষী দ্রুত শনাক্ত ও জবানবন্দি রেকর্ড না করা, সাক্ষী ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, প্রমাণের চেইন অব কাস্টডি ভেঙে যাওয়া, তদন্তে সময়ক্ষেপণ এসবের মধ্যে অন্যতম। ফলে বৈজ্ঞানিক ও প্রমাণভিত্তিক তদন্ত নিশ্চিত করা, ফরেনসিক টিমকে দ্রুত যুক্ত করা, ডিজিটাল ও নথিভুক্ত প্রমাণের সঠিক সংরক্ষণ, সাক্ষী সুরক্ষা ও ১৬৪ ধারার জবানবন্দি দ্রুত গ্রহণ, তদন্ত কর্মকর্তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও ক্ষেত্রভিত্তিক বিশেষায়িত দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ প্রয়োজন।

ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা চাই বিচারব্যবস্থায় প্রকৃত অপরাধীর সাজা নিশ্চিত হোক। পাশাপাশি কেউ যেন আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বের হতে না পারে সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।’