আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই ভোটের সমস্যা ও সময়ের ব্যবধান বুঝতে মক ভোটিংয়ের আয়োজন করে নির্বাচন কমিশন। গতকাল শনিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে শেরেবাংলানগর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত এই ভোট শেখানো ও সমস্যা বোঝার কার্যক্রম চলে। এতে না বুঝেই ‘হ্যাঁ’ ‘না’-এর গণভোট দিয়েছেন বলে জানান ভোটাররা।
মক ভোটিংয়ে অংশ নিয়ে ভোটার মুন্সি রইছ উদ্দীন বলেন, ‘হ্যাঁ-না জানি না।লেখাও বুঝি নাই। লেখা পড়ার টাইমও নাই। না বুঝেই ভোট দিয়ে আসছি।’ আরেক ভোটার আবু হানিফও একই কথা জানান।
হাফিজুর রহমান নামের আরেক ভোটার বলেন, ‘গণভোট দিয়েছি, কিন্তু না দেখে, না পড়ে। আগে থেকে আরো জানা থাকলে ভালো হতো।’
তবে ভোট দিতে গিয়ে কোনো সমস্যায় পড়েননি বলে জানান আবুল কালাম নামের এক ভোটার। তিনি বলেন, “হঠাৎ করে ভোট হলো। আগে থেকে কিছু জানতে পারিনি। তবে আমি ‘না’ ভোট দিয়েছি।”
সরেজমিনে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে শেরেবাংলানগর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে দেখা যায়, বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের বাইরে নারী ও পুরুষ ভোটারদের স্লিপ সংগ্রহের জন্য পৃথক তিনটি করে ছয়টি বুথ স্থাপন করা হয়েছে। ভোটাররা প্রথমেই ওই বুথগুলোতে যাচ্ছেন এবং নিজেদের জাতীয় পরিচয়পত্র দেখিয়ে ভোটার স্লিপ সংগ্রহ করছেন। পরে একে একে ভোটাররা কেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করছেন। সাধারণ নির্বাচনের মতোই ভোটকেন্দ্রের বাইরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করতে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের দেখা যায়। তাঁরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ভোটকেন্দ্রের ভেতরে দেখা যায়, নারী ও পুরুষ ভোটারদের জন্য পৃথক দুটি করে চারটি ভোটকক্ষ করা হয়েছে।
এ সময় ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করেন নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আজকের মক ভোটিং মূলত অনুশীলন। এখান থেকে ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য অভিজ্ঞতা ও স্ট্র্যাটেজি নির্ধারণ করা হবে। ভোটাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিচ্ছেন। ভিন্ন রঙের দুটি ব্যালট দেখে গণভোট ও জাতীয় নির্বাচনের পার্থক্য সহজেই বুঝতে পারছেন। ভোটের পরিবেশও সুষ্ঠু রয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘এই অনুশীলন কমিশনকে সময়, ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়ের হিসাব বুঝতে সাহায্য করবে। ভোটের হার যতই হোক, লক্ষ্য সবসময় শতভাগ ভালো করা। ভোটার প্রচার-প্রচারণা চলমান থাকবে এবং ভোটারদের অভিজ্ঞতাকেই সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে। আজকের (শনিবার) আয়োজন কমিশনের জন্য একটি শেখার প্ল্যাটফর্ম।’
ভোটের এক পর্যায়ে বিশৃঙ্খলা : সকাল সোয়া ৯টার দিকে ভোটকেন্দ্র পরিদর্শনে আসেন নির্বাচন কমিশনার (ইসি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মোহাম্মদ সানাউল্লাহ। ১৫ মিনিট তিনি ভোটকেন্দ্রের চারপাশ পরিদর্শন করেন। এরপর সাড়ে ৯টার দিকে ভোটকক্ষে প্রবেশ করেন। সে সময় ভোটকক্ষে বিশৃঙ্খল অবস্থা দেখে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং ভোট দিতে কত সময় লাগে তা বুঝতে নিজেই তদারকি শুরু করেন। এ সময় আবুল ফজল মোহাম্মদ সানাউল্লাহ বলেন, ‘কিছুই হচ্ছে না। শুধু এখানে নাটক করার জন্য এ কাজটা নয়। এ রকম বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা থাকলে এ কাজ করে লাভ নেই।’
কমিশনের কর্মকর্তাদের তিনি বলেন, ‘১০ জন ভোটারকে দ্রুত প্রবেশ করতে বলেন।’ ১০ জন মহিলা ভোটার প্রবেশের পর তিনি তাঁদের লাইন ধরে দাঁড়াতে বলেন। এ সময় কর্মকর্তাদের তিনি বলেন, ‘আমরা মূলত কী দেখছি? আমরা দেখতে চাই, ভোটার কক্ষে প্রবেশের পর ভোট কার্যক্রম শেষ করে বের হয়ে যেতে কতক্ষণ সময় লাগে। কারণ, এখানে দুটি ব্যালট পেপার রয়েছে। সাধারণত সংসদ নির্বাচনে একটি ব্যালট পেপার থাকে। এবার একই সঙ্গে গণভোট হওয়ার কারণে দুটি ব্যালট পেপার থাকবে। দুই ব্যালট পেপারে ভোট দিতে একজন ভোটার কতক্ষণ সময় নিচ্ছে তা জেনে ভোট দেওয়ার সময়টা আমাদের হিসাব করে বের করতে হবে। এর ওপর ভিত্তি করে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, আমাদের গোপন কক্ষের সংখ্যা বাড়াতে হবে কি না, বুথের সংখ্যা বাড়াতে হবে কি না, কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়াতে হবে কি না। সুতরাং কত সময় লাগছে তা জানা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
এরপর তিনি কমিশনের কর্মকর্তাদের সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দেন। তাঁর নির্দেশনার পরে আবার নতুন করে ভোটারদের সারিতে দাঁড় করানো হয়। মক ভোটার, মক পর্যবেক্ষক, মক সাংবাদিক, কে কোথায় থাকবেন, কী দায়িত্ব পালন করবেন, সেগুলো বুঝিয়ে দেন। এর পরে কেন্দ্রে শৃঙ্খলা আসে।
ভোট পড়েছে ৭০.৪ শতাংশ : গতকালের এই মক ভোটিংয়ে ৭০.৪ শতাংশ ভোট পড়ছে বলে জানিয়েছেন ভোটকেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার জাহাঙ্গীর আলম। মক ভোটিং শেষে তিনি এই তথ্য জানান। তিনি বলেন, ‘মক ভোটিংয়ে নির্ধারিত ৫০০ ভোটারের মধ্যে ৭০.৪ শতাংশ ভোট পড়েছে। অর্থাৎ ৩৫২ জন ভোট দিয়েছেন।’ তবে মক গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয়েছে কি না সে সম্পর্কে কোনো তথ্য জানাননি। সংসদ ভোটের ব্যালট পেপারেও কোনো দলের প্রতীক রাখা হয়নি।
জাহাঙ্গীর আলম আরো বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনাররা বুথগুলোতে নানা ধরনের ভোটারদের নিয়ে ভোট দেওয়ার সময় পর্যালোচনা করেছেন। এটা নিয়ে একটা প্রতিবেদন আসবে। এর ভিত্তিতে সামগ্রিক বিষয়গুলো নির্ধারণ করবে নির্বাচন কমিশন।’
তিনি বলেন, ‘ইসির এই মক ভোটিংয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ, বস্তিবাসী, শিক্ষার্থী, তৃতীয় লিঙ্গের, প্রতিবন্ধী ও নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (ইটিআই) প্রকল্পের ভোটাররা অংশ নেন।