অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া তড়িঘড়ি করে নতুন ‘ইজারা নীতিমালা’ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে (বেবিচক) আড়ালে রেখে নীতিমালা প্রণয়নের এ উদ্যোগ ফ্যাসিস্টের দোসরদের স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্য বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তারা বলেন, বিতর্কিত খসড়া নীতিমালা কার্যকর হলে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা হুমকিতে পড়বে। তৈরি হবে অপারেশনাল জটিলতা। প্রশ্নের মুখে পড়বে বেবিচকের স্বাধীনতা। এমনকি আইকাও’র নিষেধাজ্ঞার কবলেও পড়তে পারে বাংলাদেশ।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম যুগান্তরকে বলেন, সিভিল এভিয়েশনের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করলে দেশের বিমান খাতে নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এয়ারপোর্টের ইজারা নীতিমালা তৈরি করার মতো কাজ এখন করার সময় নয়। যে পদক্ষেপ সিভিল এভিয়েশনের ক্ষমতা ক্ষুণ্ন করে বা রেগুলেটরের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে, তা পুনরায় আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার দিকে নিয়ে যেতে পারে। সূত্রমতে, মন্ত্রণালয়ের কাঁধে বন্দুক রেখে একটি মহল বিমানবন্দরের বিভিন্ন ব্যবসাসংক্রান্ত ইজারা নীতিমালা প্রণয়নে তোড়জোড় শুরু করেছে। এতে ইন্ধন দিচ্ছে আমলাদের একাংশ। নীতিমালা প্রণয়নের ফাঁকফোকর দিয়ে প্রভাবশালীরা তাদের প্রতিষ্ঠানের নামে বিমানবন্দরের বিভিন্ন স্থাপনায় ইজারা কার্যক্রম নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। বিশেষ করে থার্ড টার্মিনালের দোকান, লাউঞ্জ থেকে শুরু করে অন্যান্য স্থাপনা নিজেদের নামে বন্দোবস্ত করে নিতে তারা মরিয়া।
মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নতুন নীতিমালা কার্যকর হলে তা কতিপয় পলাতক ব্যবসায়ী ও চোরাচালানিদের ফিরে আসার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তখন তারা বিমানবন্দরগুলোকে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে ফেলার চেষ্টা করতে পারে। নতুন নীতিমালা কার্যকর করা হলে সিভিল এভিয়েশন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
বেবিচক বিষয়টি জানতে পেরে গত ২৯ অক্টোবর বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়কে একটি চিঠি পাঠায়। তাতে এই নীতিমালা প্রণয়নের ফলে যেসব নেতিবাচক বিষয়ের অবতারণা হবে সে বিষয়ে মতামত দেয়। যাতে স্পষ্টভাবে জানানো হয়, ‘সর্বোচ্চ দরদাতাকে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ইজারা প্রদান করলে যাত্রীসেবা নিশ্চিতকরণ সম্ভব নয়। কারণ সর্বোচ্চ দরদাতা যাত্রীদের কাছে উচ্চমূল্যে সেবা বিক্রয় করবে, যা এই নীতিমালার উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। এছাড়া এই প্রক্রিয়ায় দরপত্র উন্মুক্তকরণের মাধ্যমে নিরাপত্তাঝুঁকিও রয়েছে। এসব কারণে ইজারা নীতিমালা-২০১৯ (৪) (অ) (ঙ)-এর মতো এটি আবেদনের ভিত্তিতে হওয়া উচিত।’ চিঠিতে আরও বলা হয়, ওই এলাকা এয়ার সাইডে হওয়ায় এখানে ইজারা দেওয়া, নবায়ন করা জনস্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তা বিবেচনায় ইজারা নীতিমালা-২০১৯ (৪) নির্দেশনা মোতাবেক আবেদনের ভিত্তিতে করা আবশ্যক।’ অতি সংবেদনশীল সময়ে এমন সিদ্ধান্ত সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে উল্লেখ করে এতে আরও বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের নির্বাচনসংশ্লিষ্ট সময়টিতে হাজারো মানুষের জীবিকা ঝুঁকিতে পড়ে গেলে রাজনৈতিকভাবে নেতিবাচক বার্তা যাবে।’
বেবিচকের মতে, এ নীতিমালা কার্যকর হলে তাদের তদারকির ক্ষমতা কমে যাবে। তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বাধা সৃষ্টি হবে। নিরাপত্তাভঙ্গ বা অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সমস্যা তৈরি হবে। যে কোনো বিরোধ আদালতে গেলে বছরের পর বছর মামলাজট চলবে। এর নেতিবাচক দিক হচ্ছে, বিমানবন্দর নিরাপত্তা দুর্বল হবে, সরকার হারাবে রাজস্ব।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, দেশের ৮টি বিমানবন্দরে বর্তমানে প্রায় ২৫০ প্রতিষ্ঠান ২০১৯ সালের নীতিমালা অনুযায়ী ব্যবসা করছে। এতে ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ রয়েছে শতকোটি টাকা। এই পুরো শিল্পটি অনেক চেষ্টায় একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো পেয়েছে। নতুন নীতিমালা কার্যকর হলে ছয় মাসেই পুরো শিল্প ভেঙে পড়বে-এমন শঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইজারা নিয়ে নিয়মমাফিক ব্যবসা পরিচালনা করছেন এমন একজন ব্যবসায়ী যুগান্তরকে বলেন, আমাদের প্রতিটি ব্যবসা যাত্রীসেবার সঙ্গে যুক্ত। হঠাৎ দরপত্র করলে আমরা সবাই বাইরে চলে যাব। নতুনরা টাকার জোরে আসবে, সেবার মানে কেউ গুরুত্ব দেবে না।’
শুধু বেবিচক নয়, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, এই নীতিমালা কার্যকর হলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশন (আইকাও)-এর বিধিমালা-এনেক্স ৯, ১৪, ১৭ ও ১৯ লঙ্ঘনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এনেক্স ১৭ অনুযায়ী, বিমানবন্দরের সীমিত এলাকায় প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের একমাত্র দায়িত্ব ‘উপযুক্ত বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের’, অর্থাৎ বেবিচকের।
সাবেক একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, ‘সর্বোচ্চ দরদাতা’ ভিত্তিতে লিজ দিলে নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাবে। এর ফলে স্মাগলিং, অবৈধ প্রবেশ এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান লঙ্ঘনের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কালোতালিকাভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
তড়িঘড়ি করে নীতিমালা তৈরির নেপথ্যে আমলাদের কোন অংশ কাজ করছে সে বিষয়ে কিছু ধারণা পাওয়া গেছে। অভিযোগ উঠেছে, এর পেছনে রয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের একজন যুগ্মসচিব। তিনি ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের আমলে রাতের ভোটের অন্যতম রূপকার হিসাবে পরিচিত। বর্তমানে কারাবন্দি সচিব মুহিবুল হকের সহযোগী হিসাবে চিহ্নিত। তিনি মন্ত্রণালয়ে ফ্যাসিবাদী সরকারের স্বার্থ রক্ষা করে যাচ্ছেন।
এদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ৬ আগস্ট ওই যুগ্মসচিবকে বদলির আদেশ দেয়। তার নাম অনুপ কুমার তালুকদার। তাকে পরিচালনা কমিশনে যুগ্মপ্রধান হিসাবে বদলি করা হয়। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ১৩ আগস্টের মধ্যে যোগদানের শর্ত থাকলেও তিনি বিশেষ ক্ষমতাবলে বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়েই থেকে যান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, নীতিমালার খসড়া প্রণয়নের বিষয়টি তিনি অবগত নন। সরাসরি সম্পৃক্তও নন। প্রাথমিক কিছু বৈঠকে অংশ নিলেও শেষ মিটিংয়ে ছিলেন না। নীতিমালা এখনো কার্যকর হয়নি। তাই এটি তড়িঘড়ি করে কারও স্বার্থে করার অভিযোগ সঠিক নয়। আইকাও বিধিমালা লঙ্ঘনের প্রশ্নে তিনি বলেন, এনেক্স ৯ সেবা-সুবিধার কথা বলা আছে। তবে নীতিমালা কীভাবে হবে তা নির্দিষ্ট করা নেই। নিরাপত্তার বিষয়টি এনেক্স ১৭-তে এলেও প্রস্তাবিত নীতিমালায় কোনো নিরাপত্তাঝুঁকি আছে এমন তথ্য তিনি জানেন না।