গোটা জাতির কাছে ‘আপসহীন’ এক আবেগের নাম খালেদা জিয়া। আপসহীন এবং খালেদা জিয়া যেন সমার্থক শব্দ। আপসহীন শব্দটি উচ্চারণ করা মাত্রই যে কেউ বুঝতে পারেন কার কথা বলা হচ্ছে। যিনি সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য-বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে জেল-জুলুমসহ নানামুখী ষড়যন্ত্র গভীর দেশপ্রেম দিয়ে মোকাবিলা করেছেন। কিন্তু নিজের সুবিধার জন্য বিন্দুমাত্র আপস করেননি। দেশ ছাড়েননি। সব সময় নেতাকর্মীদের আগলে রেখেছেন। নিজের যোগ্যতায় তিনি এখন দেশের সত্যিকারের রাজনৈতিক অভিভাবক। জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। দলমত নির্বিশেষে গণতন্ত্রকামী প্রতিটি মানুষের কাছে প্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
দীর্ঘদিন থেকে নানামুখী জটিল রোগে ভুগছেন তিনি। অসুস্থ হয়ে অনেকটা সংকটাপন্ন অবস্থায় ২৩ নভেম্বর থেকে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী রাজধানীর এভায়কেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তার আশু সুস্থতা কামনা করে যে যার অবস্থান থেকে দোয়া করছেন। কেউ কেউ ফেসবুকে দিয়েছেন আবেগঘন স্ট্যাটাস। ভোটের মাঠের রাজনীতি নিয়ে যতই মতবিরোধ আর দ্বন্দ্ব থাকুক না কেন-খালেদা জিয়া প্রশ্নে সবাই এক। বাংলাদেশের সব মানুষকে যিনি আজীবন হৃদয়ে ঠাঁই দিয়েছেন, সেই ৮০ বছর বয়সি নেত্রীর জন্য দোয়া আর ভালোবাসা একাকার হয়ে মিশে গেছে এভারকেয়ারের পথে। আরও সহজ করে বলা যায়, সব পথ মিশে গেছে যেখানে। এছাড়া সব ভেদাভেদ ভুলে রাজনীতিবিদ ছাড়াও সমাজের সব শ্রেণিপেশার মানুষ রাজনীতির অভিভাবকের খবর জানতে ছুটছেন হাসপাতালে। কেউ কেউ গণমাধ্যম ছাড়াও বিভিন্ন সূত্র থেকে আপডেট খবর নিচ্ছেন। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিবৃতি দিয়ে খালেদা জিয়ার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন। একই সঙ্গে তার উন্নত চিকিৎসায় সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। এছাড়া সার্বক্ষণিকভাবে সরকারের তরফ থেকে খালেদা জিয়ার চিকিৎসার খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে বিএনপির নেতাকর্মী-সমর্থক ছাড়াও জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ সব রাজনৈতিক দল উদ্বেগ জানিয়ে ও সুস্বাস্থ্য কামনা করে সবার কাছে দোয়া চেয়েছে। সরকারের বেশ কয়েকজন উপদেষ্টাসহ সব দলের শীর্ষ নেতারা খালেদা জিয়াকে একনজর দেখতে ছুটে যান হাসপাতালে। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী সব শক্তির এক ধরনের জাতীয় ঐক্য জনগণের সামনে ইতিবাচকভাবে ফুটে উঠেছে। পাশাপাশি খালেদা জিয়া প্রশ্নে গণতন্ত্রকামী সব শক্তি যে এক-তা আরও একবার প্রমাণিত হলো।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের মতে, খালেদা জিয়া শুধু বিএনপির নয়, দেশের সব রাজনৈতিক শক্তির কাছেই তিনি একজন মুরব্বি ও অভিভাবক। বিএনপি চেয়ারপারসনকে দেখতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের এই ভিড় প্রমাণ করে তিনি জাতীয় ঐক্যের প্রতীক।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মাহবুব উল্লাহ মনে করেন, খালেদা জিয়ার দেশপ্রেম ও গণতন্ত্রের প্রতি আপসহীন অবস্থান প্রশ্নাতীত। এছাড়া খালেদা জিয়া এমন একজন গণতান্ত্রিক নেতা, যার রাজনৈতিক অভিভাবকত্ব এখন প্রতিষ্ঠিত। যিনি দেশ ও দেশের মানুষকে ভালোবাসেন এবং দেশের মঙ্গলের জন্যই সারাজীবন উৎসর্গ করেছেন। এই ত্যাগ স্বীকার করতে গিয়ে ফ্যাসিস্ট শাসকদের হাতে তাকে বারবার চরমভাবে নির্যাতিত হতে হয়েছে। নির্যাতনের ফলে অসুস্থ হয়েছেন এবং তার জীবন বিপন্ন অবস্থায় পড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই দেশের প্রতিটি দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল এবং সব মানুষ তার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধাবোধ প্রকাশ করছে। এটি একজন রাজনৈতিক অভিভাবকের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার প্রকাশ ছাড়া আর কিছু নয়। এছাড়া তিনি এখন সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে।
তিনি আরও বলেন, জেল থেকে মুক্ত হওয়ার পর খালেদা জিয়া দেশের রাজনীতিতে একজন দিশারির ভূমিকা পালন করেছেন। দেশের একজন মুরব্বি ও অভিভাবক হিসাবে তার নীরব ও নিঃশব্দ অনেক ভূমিকা দৃশ্যমান। মূলত তার উপস্থিতিই কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্রের জন্য বড় অনুপ্রেরণার শক্তি। তার এই অভিভাবকত্বকে সব রাজনৈতিক দল শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করেছে। এই অভিভাবকসুলভ চরিত্র তাকে আজীবন অমর করে রাখবে। ইতোমধ্যে ইতিহাসে তার গৌরবোজ্জ্বল স্থান নির্ধারিত হয়ে গেছে।
আরেক বিশ্লেষক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, খালেদা জিয়া রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে এত বছর ধরে দেশের গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যুদ্ধ করেছেন। অনেক কষ্ট পেয়েছেন, জেলে গেছেন এবং অনেক কটুকথা শুনেছেন। কিন্তু তিনি তার উত্তরে কাউকে কটুকথা বলেননি। বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে, অনেক অপমান করা হয়েছে। এজন্য তিনি অনেক কষ্ট পেয়েছেন, কষ্ট করেছেন। কিন্তু বিএনপি চেয়ারপারসন দেশ ছেড়ে যাননি। খালেদা জিয়া সব সময় বলেছেন, ‘এই দেশ আমার, এই দেশ ছেড়ে কোনো দিনই যাব না, এই জনগণের সঙ্গে আমি থাকব।’ সেজন্য সব রাজনৈতিক দল, মত, নির্বিশেষে সবার কাছে তিনি একটি জায়গায় পৌঁছে গেছেন। যাকে আমরা বলি ‘মুরব্বি’। যার দিকে সবাই উপদেশের জন্য তাকিয়ে থাকে। সে রকম একটা জায়গায় তিনি পৌঁছে গেছেন।
খালেদা জিয়া তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, সাবেক সেনাপ্রধান ও মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডারের স্ত্রী ও সাবেক ফার্স্ট লেডি। এসব পরিচয় ছাপিয়ে ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তীতে তিনি হয়ে উঠেন জাতির অনন্য এক অভিভাবক। দলমত নির্বিশেষে সব শ্রেণিপেশার মানুষের কাছে তিনি শ্রদ্ধার পাত্র। গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করে আপসহীন খেতাব পাওয়া অশীতিপর এই নেত্রী এখন হাসপাতালে শয্যাশায়ী। ভুগছেন জটিল নানা রোগে। ৬ দিন ধরে রাজধানীর এভারকেয়ারের সিসিইউতে চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে তাকে চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা। সঙ্গে ভার্চুয়ালি যুক্ত আছেন বিদেশি চিকিৎসকরাও।
বিএনপি চেয়ারপারসনের শারীরিক এমন অবস্থায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় বিএনপির নেতাকর্মীসহ গোটা জাতি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতির সংবাদে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তার সার্বিক শারীরিক অবস্থার ব্যাপারে আমরা নিয়মিত খোঁজখবর রাখছি।’ হেফাজতে ইসলামের নেতারাও হাসপাতালে গিয়ে খালেদা জিয়ার খোঁজ নেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় যুগান্তরকে বলেন, যে মানুষটি গণতন্ত্র ও ভোটের অধিকার নিয়ে ৪০ বছর সংগ্রাম করেছেন। যে মানুষটি জীবনে অন্যায়ের সঙ্গে কোনোদিন আপস করেননি। যে মানুষটি হাসিমুখে কারাগারকে বরণ করেছেন। তিনি আজ সংকটাপন্ন। তিনি বলেন, আমাদের নেত্রী হাসিমুখে কারাগারে গেলেও ফিরে আসেন গুরুতর অসুস্থ অবস্থায়। অথচ যথাসময়ে উন্নত চিকিৎসা হলে আজ খালেদা জিয়ার এ অবস্থা হতো না। গয়েশ্বর বলেন, খালেদা জিয়া জাতির বটবৃক্ষ। যার ছায়ায় আমরা এবং দেশের মানুষ স্বস্তি পান।
আমার বাংলাদেশ (এবি পার্টি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, খালেদা জিয়া বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের প্রতিনিধিত্ব করেন। দীর্ঘ প্রতিকূলতা, সীমাহীন চাপ ও কঠিন বাস্তবতার মাঝেও তিনি যে দৃঢ়তা, সাহস ও আপসহীন নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছেন, তা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে উজ্জ্বল অক্ষরে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তার সুস্থতা শুধু নিজের দলের জন্য নয়; বরং দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ, গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা এবং মানবিক মূল্যবোধ রক্ষার জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে ক্ষমতার ট্রানজিশনাল পর্যায়ে তার মতো অভিজ্ঞ নেত্রীর উপস্থিতি জাতীয় স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর বলেন, দেশের গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংগ্রামে আপসহীন লড়াকু নেত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। জাতীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে তার দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ ও দৃঢ় অবস্থান দেশের জন্য এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তার সুস্থতা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার জন্য অপরিহার্য।
শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের এক অনন্য অনুপ্রেরণা বলে মন্তব্য করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের এক অনন্য অনুপ্রেরণা। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার আন্দোলনে তিনি কয়েক দশক ধরে অবিচল ভূমিকা পালন করেছেন। ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রচক্রের লাগাতার নির্যাতন, মিথ্যা মামলার পরিক্রমা এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ভয়াবহতার মাঝেও তার অটল মনোবল ও আপসহীন অবস্থান বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি বলেন, ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থান, স্বৈরতন্ত্রবিরোধী সংগ্রাম এবং পরবর্তী সময়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রত্যেকটি পর্বে খালেদা জিয়ার দৃঢ়তা, দেশপ্রেম ও নেতৃত্ব জাতীয় জীবনে গভীর প্রভাব রেখেছে। বাংলাদেশের বহু প্রজন্ম তাকে দেখেছে সাহস, সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতীক হিসাবে।
ফেসবুক পোস্টে ইসলামি বক্তা ড. মিজানুর রহমান আজহারি লেখেন, নানা বিভক্তি ও বিভাজনের এ দেশে সর্বজন শ্রদ্ধেয় মানুষের সংখ্যা একেবারেই নগণ্য। কিন্তু খালেদা জিয়া এ ক্ষেত্রে অনন্য। দেশপ্রেম ও অতুলনীয় ব্যক্তিত্বের কারণে তিনি প্রায় সবার কাছে বিশেষ সম্মানের ও শ্রদ্ধার আসন অলংকৃত করেছেন। এই মুহূর্তে গোটা জাতি তাকে আন্তরিক দোয়ায় স্মরণ করছে। দলমত নির্বিশেষে অগণিত মানুষের এমন দোয়া ও ভালোবাসা পাওয়া সত্যিই পরম সৌভাগ্যের।
খালেদা জিয়ার দ্রুত সুস্থতা কামনায় সারা দেশের ছাত্রসমাজকে দোয়া ও প্রার্থনার আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। এক বিবৃতিতে বলা হয়-বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির ইতিহাসে খালেদা জিয়া সংগ্রামী পথচলার এক অনন্য প্রতীক। দৃঢ় মনোবল, অদম্য সাহস ও নেতৃত্বের গুণে তিনি তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। গণতান্ত্রিক আন্দোলনে খালেদা জিয়ার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফ্যাসিবাদী দমনপীড়ন, গুম-খুন, বিচারিক হত্যাকাণ্ড ও রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে তিনি সব সময় উচ্চকণ্ঠ ছিলেন।