সিলেটে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ‘কিশোর গ্যাং’। চলছে খুনাখুনির মহোৎসব। আহত হচ্ছে অনেকেই। দিন দিন কিশোর গ্যাংয়ের কর্মকাণ্ড অসহনীয় মাত্রায় পৌঁছে যাচ্ছে। নগরের চুরি, ছিনতাই সহ নানা ঘটনায় উঠে আসছে কিশোর গ্যাংয়ের নাম।
পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, কিশোর গ্যাংয়ের লাগাম টেনে ধরতে মাঠ পর্যায়ে পুলিশ কাজ করছে। কিন্তু আদতে সেটি কতোটুকু কার্যকর করা হচ্ছে, এ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, কিশোর গ্যাংয়ে রয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব। শেল্টার দাতারা অদৃশ্য থেকে তাদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দেয়ার কারণে বর্তমান পরিস্থিতি খুনাখুনির পর্যায়ে চলে গেছে। ১৫ দিনের ব্যবধানে কিশোর গ্যাংয়ের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে সিলেটে দু’টি আলোচিত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে অপরাধ জোন বালুচরে ও অপরটি হচ্ছে বাদামবাগিছায়। নগরের নয়াসড়কে কিশোর গ্যাংয়ের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এক পক্ষ আরেক পক্ষকে কুপিয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাতে নগরের বাদামবাগিচায় কিশোর গ্যাংয়ের বিরোধে স্কুলছাত্র শাহ মাহমুদ হাসান তপু খুন হয়েছে। সে ওই এলাকার কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। নিজেদের মধ্যে আধিপত্যকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। যারা খুন করেছে তারাও বয়সে কিশোর। এ ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত জাহিদ হাসানকে প্রধান আসামি করে তপুর পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ জানায়, নিহত তপু ও হত্যাকারী জাহিদ পরস্পর বন্ধু। এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত ছিল তারা। কিশোর গ্যাং নিয়ে বিরোধের জেরে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে তপুকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে জাহিদসহ কয়েকজন। কিশোর গ্যাং নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণে তপুকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন নগর পুলিশের এডিসি (মিডিয়া) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামও। তিনি বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের দুই গ্রুপের দ্বন্দ্বের কারণে এই হত্যাকাণ্ড। শুক্রবার বিকালে নগরের নয়াসড়ক এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে এক কিশোর গুরুতর আহত হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, দুই কিশোর গ্রুপের মধ্যে পূর্ব শত্রুতা নিয়ে সংঘর্ষ বাধে। একপর্যায়ে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তারা পরস্পরের ওপর হামলা চালায়। এতে একজন কিশোর গুরুতর আহত হয়। সঙ্গে থাকা বন্ধুরা দ্রুত তাকে সিএনজি অটোরিকশায় করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। তবে আহত কিশোরের নাম-পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কাজিটুলা ও জেলরোড এলাকার কিশোরদের মধ্যে স্কুলকেন্দ্রিক পূর্ব বিরোধ থেকেই এই সংঘর্ষের সূত্রপাত বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের বিশেষ শাখার (সিটিএসবি) উপ-কমিশনার মো. তারেক আহমেদ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘ধারণা করা হচ্ছে, দুই কিশোর গ্রুপের আগের কিছু বিরোধ থেকেই সংঘর্ষ হয়েছে। কিশোর অপরাধ দমনে পুলিশ জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছে।’ এদিকে, ১০ই নভেম্বর কিশোর গ্যাংয়ের মধ্যে বিরোধের জের ধরে ছুরিকাঘাতে আহত হন বালুচর এলাকার বাসিন্দা মো. ফাহিম আহমদ। চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুইদিন পর তিনি মারা যান। ফাহিম স্থানীয় কিশোর গ্যাংয়ের একটি পক্ষকে নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে পুলিশ জানায়।
হত্যাকারী আলী হোসেন বাইল্যাও কিশোর গ্যাংয়ের আরেক গ্রুপের টিম লিডার। বালুচর এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ফাহিম খুনের আগে টিবি গেইটে খুন করা হয়েছিল কলেজছাত্র আরিফকেও। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এসব খুনাখুনির ঘটনা ঘটে। ফাহিম খুনের পর এলাকার সোনার বাংলা, জোনাকি, আল ইসলাহ ও দুই নম্বর মসজিদের গলিতে আর কিশোর গ্যাংরা বসে না। তবে, তারা পার্শ্ববর্তী বাগান এলাকায় নতুন করে আস্তানা গড়ে তুলেছে বলে জানিয়েছেন। কিশোর গ্যাংয়ের এই অপরাধ কর্মকাণ্ড নিয়ে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের তরফ থেকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। তিনি মানবজমিনকে জানিয়েছেন, কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ কর্মকাণ্ড রুখতে পুলিশ সতর্ক রয়েছে। নগরে কিশোর থাকবে কিন্তু কোনো গ্যাং থাকবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।