বাংলাদেশের পাসপোর্টে এখন অনেক দেশই ভিসা দিচ্ছে না। বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশিদের ভিসা না পাওয়ার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে নেতিবাচক ভাবমূর্তি, জঙ্গিবাদ, ভারতে ভিসা ‘বন্ধ’, অবৈধ অভিবাসনসহ বেশ কিছু বিষয়। এই কারণগুলোর সম্মিলিত প্রভাবে বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা প্রাপ্তির প্রক্রিয়াকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
সম্প্রতি ডয়েচে ভেলের প্রতিবেদনে ভিসা না পাওয়া বিভিন্ন ব্যক্তি ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের আলোচনায় উঠে এসেছে বিভিন্ন কারণ।
প্রতিবেদনে আর্কিটেক্ট মো. মারুফ হাসান বলেছেন, কানাডা ও তুরস্কে পৃথকভাবে যাওয়ার জন্য ভিসার আবেদন করেছিলাম। দুই জায়গা থেকেই ভিসা দেয়নি। আমার মনে হয়েছে, সবাই মনে করছে, আমরা পালাতে চাচ্ছি। ভাবছে, আমরা একবার গেলে আর দেশে ফিরবো না। তা না হলে আমি বাংলাদেশের একজন নামকরা আর্কিটেক্ট, আমি ৬০ লাখ টাকার ব্যাংক ব্যালান্স দেখানোর পরও তারা বলছে, আমার টাকা নাকি অপর্যাপ্ত। এটা আসলে ভিসা না দেওয়ার একটা অজুহাত মাত্ৰ৷
সাবেক কূটনীতিক মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, আমাদের দেশে তো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা আছে। প্রতিবেশী দেশ ভারত যখন ভিসা বন্ধ করে দেয়, তখন সারা বিশ্বেই একটা খারাপ বার্তা যায়। অনেকেই মনে করে, প্রতিবেশীরা যখন ভিসা বন্ধ করেছে, ফলে এর ভেতরে নিশ্চয়ই খারাপ কিছু আছে। এই কারণে অনেকেই আমাদের ভিসার ব্যাপারে নেতিবাচক অবস্থান নিচ্ছে। পাশাপাশি আমাদের বদনাম ছড়িয়ে পড়েছে এখানে জঙ্গিবাদীদের বিস্তার শুরু হয়েছে। এটা নিয়ে বিভিন্ন দেশ চিন্তা করছে।
এমিরেটস এয়ারলাইন্সের কর্মকর্তা আজমাইন আশরাফ বলেন, এমিরেটস এয়ারলাইন্সে চাকরি করার কারণে প্রতি বছরই আমি পরিবার নিয়ে ভ্রমণ করার জন্য ফ্রি টিকিট পাই। এবার কর্তৃপক্ষ আমাদের যুক্তরাষ্ট্রের টিকিট দিয়েছিল। সেই কারণে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসে ভিসার আবেদন করেছিলাম। কিন্তু তারা ভিসা দেয়নি। আমি কিন্তু বহু দেশ ভ্রমণ করেছি। সেই বিষয়টাও তারা গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি। যেদিন আমার পাসপোর্ট ফেরত দিয়েছে সেদিন কাউকেই ওরা ভিসা দেয়নি। সেখানে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫টি পরিবার ছিল।
স্বর্ণকুটির ডেভেলপারের চেয়ারম্যান প্রদীপ চন্দ্র নন্দী বলেন, আমার ছেলে ইংল্যান্ডের স্কুলে পড়ে। কিছু আত্মীয়-স্বজনও আছে লন্ডনে। সে কারণে আমি লন্ডনে যেতে চেয়েছিলাম। দেশে আমার ৫টি প্রতিষ্ঠান আছে। প্রতি বছর আমি ৫ কোটি টাকারও বেশি সরকারকে ট্যাক্স দেই। ব্যাংকে শত শত কোটি টাকার লেনদেন। ৪০টিরও বেশি দেশ ভ্রমণ করেছি আমি। বুঝতে পারছি না কী কারণে তারা আমাকে ভিসা দেয়নি।
লেক্সাস ট্যুরস অ্যান্ড ট্র্যাভেলসের স্বত্বাধিকারী অজিত কুমার সাহা বলেন, দুই কারণে বাংলাদেশি পাসপোর্টে অনেক দেশ ভিসা দিচ্ছে না। প্রথমত, গত বছরের সরকার পরিবর্তনের পর একটা কথা খুব প্রচার পেয়েছে যে, দেশ থেকে ১০-১২ লাখ লোক পালিয়ে যাবে। অনেক দূতাবাস ভাবছে, কেউ গেলে আর ফিরবে না । দ্বিতীয়ত, পাসপোর্টের ভেরিফিকেশন তুলে নেওয়ার কারণে অনেক রোহিঙ্গার হাতে পাসপোর্ট চলে গেছে। ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভিয়েতনামসহ কয়েকটি দেশ বাংলাদেশের ভিসা বন্ধ করে দেওয়ায় অনেক দেশই নজরদারি বাড়িয়েছে।
ব্র্যাকের অভিবাসন প্রোগ্রামের পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশ নিয়ে একটা নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশিরা সাগর পাড়ি দিয়ে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করে। যিনি মেডিকেল নিয়ে যাচ্ছেন, আসলে তিনি রোগী না। যিনি ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে যাচ্ছেন তিনি টুরিস্ট না৷ একটা ধারণা তৈরি হয়েছে- বাংলাদেশিরা দেশ ছেড়ে চলে যেতে চান। এই বার্তা খুবই খারাপ। এর মূল কারণ এখানে সুশাসনের অভাব। ফলে অনেক ক্ষেত্রে লিগ্যাল ভিসা নিয়ে গেলেও হয়রানির শিকার হতে হয়।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আ ন হ মুনিরুজ্জামান বলেছেন, আমাদের ভাবমূর্তিতে অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটা ঠিক করতে পারছে না। তাদের কোনো চেষ্টাও দেখা যাচ্ছে না। পাশাপাশি আমাদের দেশের অনেক মানুষ মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত। এই মানবপাচারকে সারা বিশ্বেই অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। ফলে তারা বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেখলেই সতর্ক হয়ে যায়। এমনকি অনেকে আমাদের ভিসাও দিচ্ছে না। যারা দিচ্ছে, সেখানে যেতে গেলেও নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ট্র্যাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ এর সভাপতি রাফিউজ্জামান রাফি বলেছেন, ভারত, ইউএই, উজবেকিস্তান, কাতার, ভিয়েতনাম, ওমান, কুয়েত, বাহারাইন বাংলাদেশের পাসপোর্টধারীদের ভিসা দিচ্ছে না। থাইল্যান্ড কিছু ভিসা দিলেও অন্তত ৪৫ দিন সময় নিচ্ছে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, অষ্ট্রেলিয়া, জাপান খুবই কম ভিসা দিচ্ছে। মনে হচ্ছে, আমাদের পাসপোর্টের মান কমে যাচ্ছে। অর্থাৎ একেবারে তলানিতে। অনেক ক্ষেত্রে আমরা ভিসা নিয়ে মিসউইজ করেছি। ফলে তারাও কঠোর হয়েছে৷
সূত্র: আরটিভি