Image description

পূর্ব ঘোষিত সম্ভাব্য সময়সীমা অনুযায়ী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আর মাত্র দুই সপ্তাহ বাকি। তাই নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনীতিতে এখন পর্যন্ত চারটি নির্বাচনী জোট গঠন নিয়ে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি ও জাতীয় পার্টির একাংশকে কেন্দ্র করে চারটি জোট গঠন নিয়ে শেষ মুহূর্তের সমীকরণ মেলানোর চেষ্টা চলছে দলগুলোর মধ্যে। এই মুহূর্তে আসন বণ্টন নিয়ে দেনদরবারে ব্যস্ত দলগুলো। হিসাবমতো, আগামী ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে। আর জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করতে হলে ইসিকে তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ফলে তফসিলের আগেই জোটের হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন হবে। সে হিসাবে কে কোন জোটে যাচ্ছে এবং কোন জোট কত বড় বা ছোট হবে তা দৃশ্যমান হবে চলতি সপ্তাহে।

নির্বাচনকে লক্ষ্য করে বিএনপির নেতৃত্বে একটি জোট এবং জামায়াতের নেতৃত্বে আর একটি জোট গঠনের প্রক্রিয়া বেশ কিছুদিন ধরেই চলমান। বর্তমানে সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিএনপি এবং জামায়াতের মতো বড় দলের বাইরে গিয়ে তৃতীয় শক্তি হিসেবে নতুন একটি জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে নতুন কয়েকটি দল। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি), গণঅধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন (আপ বাংলাদেশ) ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) নিয়ে তৃতীয় বলয় গঠনের চেষ্টা চলছে। এই তিন শক্তির বাইরে বিগত তিনটি নির্বাচনে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা এবং সরকারের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা দুইজন সিনিয়র রাজনীতিবিদের নেতৃত্বে আরেকটি জোট গঠনের খবর বেরিয়েছে।

বিগত ১৭ বছর আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির সঙ্গে যুক্ত দলগুলোকে নিয়ে আলাদা একটি অলিখিত জোট রয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে জোটের বিষয়ে একাধিকবার বলা হয়েছে বিগত সময়ে যেসব দল ঐক্যবদ্ধভাবে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন করেছে নির্বাচনে তাদের মূল্যায়ন করা হবে। এর লক্ষণ বিএনপির দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে দেখা গেছে। জোটের প্রার্থীদের জন্য সম্ভাব্য আসনগুলোতে বিএনপি এখনও কোনো প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি। শেষ পর্যন্ত যদি বিএনপির নেতৃত্বের জোট টিকে থাকে, তা হলে ছেড়ে দেওয়া আসনগুলোতে শরিক দলের প্রার্থীদের সমর্থন দেবে দলটি। এক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নির্বাচন কমিশনের আরপিও সংশোধন অধ্যাদেশ। সংশোধিত আরপিও অনুযায়ী নির্বাচনী জোট করলেও নিজ দলের প্রতীকেই ভোট করতে হবে। তাই ছোট ছোট যেসব দল বিএনপির জোটে রয়েছে, তারা নিজের দলের প্রতীকে ভোট করে বিজয় অর্জন করা নিয়ে শঙ্কিত। তাই তারা দাবি করেছে জোটের প্রার্থী হলেও যেন পছন্দ অনুযায়ী প্রতীক বরাদ্দ নিতে পারে সেই সুযোগ রাখতে হবে।

নির্বাচনে নিবন্ধিত একাধিক দল জোটভুক্ত হলেও ভোট করতে হবে নিজ নিজ দলের প্রতীকে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) সংশোধিত এমন বিধানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট হয়েছে। জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) মহাসচিব মোমিনুল আমিন রিটটি করেন। আগে কোনো দল জোটভুক্ত হয়ে নির্বাচনে অংশ নিলে জোটের শরিক যে কোনো দলের প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পেত। তবে আরপিও পরিবর্তনের বিষয়ে এখন পর্যন্ত ইসি বা সরকার থেকে কোনো বার্তা পাওয়া যায়নি। তাই বিএনপির নেতৃত্বে থাকা দলগুলো জোট গঠন নিয়ে নানা জটিলতায় পড়েছে। জোট করে যদি নিজ দলের প্রতীকে ভোট করে শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়, তা হলে সেই আসনগুলো বিএনপির হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা বেশি। আর সেই আসনে বড় সুযোগ নেবে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট। তাই জোট গঠন নিয়ে বিএনপি নানা অংক কষছে শেষ মুহূর্তে।

জোট গঠনের বিষয়ে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির নেতৃত্বে একটি বৃহৎ জোট গঠনের প্রক্রিয়া এখনও চলমান। ফ্যাসিবাদবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দল ও জোট ছাড়াও যুগপতের বাইরে হাসিনা সরকারবিরোধী মনোভাবাপন্ন দলগুলোর সঙ্গেও আলাপ-আলোচনা চলছে। ফ্যাসিবাদবিরোধী ও গণতান্ত্রিক দেশপ্রেমিক যেসব রাজনৈতিক দল নির্বাচনী জোটে আসতে চাইবে, তাদের সবাইকেই এর অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ইসলামি দলগুলোর একটা সমঝোতা গত বছরের ৫ আগস্টপরবর্তী সময় থেকেই সক্রিয়। যদিও তারা এটাকে জোট না বলে আসন সমঝোতার ঐক্য বলছে। ইসলামি দলগুলো নিজ নিজ শক্ত আসনগুলোতে সমঝোতার ভিত্তিতে প্রার্র্থী দেবে।

এ বিষয়ে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার আমাদের সময়কে বলেন, অভিন্ন দাবিতে আমরা কিছু দল একসঙ্গে বসেছি। আমাদের মধ্যে আসন সমঝোতা হবে। এটাকে জোট বলি না। সামনে আরও কিছু দলের সঙ্গে আলাপ হবে। নির্বাচনকে সামনে রেখে আসন সমঝোতা হবে।

নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপিসহ কয়েকটি দল নিয়ে আলাদা জোট গঠনের উদ্যোগ শেষ মুহূর্তে আটকে গেলেও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। তারাও মনে করে চলতি সপ্তাহে একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। এখানেও দলগুলো চাওয়া-পাওয়ার হিসাব মেলাতে ব্যস্ত। কোন জোটে গেলে বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে তা বিবেচনায় নিয়ে জোট গঠন করতে চায় ছাত্রদের নেতৃত্ব থেকে গড়ে ওঠা দলগুলো। গণঅধিকার পরিষদের একটা গ্রুপ বিএনপির সঙ্গে জোট করতে চায়। অন্যপক্ষ চায় বিএনপি-জামায়াতের বাইরে গিয়ে তৃতীয় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটাতে। বিএনপি-জামায়াতের বাইরে গিয়ে জোট করে ভোটের মাঠে কতটুকু ছাড় পাবে তা নিয়ে চিন্তিত দলগুলো। এমন পরিস্থিতির মধ্যে গত বুধবার এই জোটের আত্মপ্রকাশ হওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত হয়নি। তবে গঠন প্রক্রিয়া বন্ধ হয়নি। আলোচনা এখনও চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসরীন সুলতানা মিলি আমাদের সময়কে বলেন, জোট গঠনের প্রক্রিয়া এখনও চলমান। কথা-বার্তা চলছে। ‘আপ বাংলাদেশ’ নিয়ে এনসিপি ও গণঅধিকার পরিষদ আপত্তি জানিয়েছে। তারা নিজেদের ফোরামে আলাপ করবে। আমরা মনে করি, আপ বাংলাদেশকে নিয়েই তারা একটা সমঝোতায় পৌঁছাবে। এনসিপি এবং গণঅধিকার পরিষদ দুই দিন সময় নিয়েছে। গণঅধিকার পরিষদের একটা পক্ষ চাইছে বিএনপির সঙ্গে জোট করতে, অন্যপক্ষ চাইছে আমাদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ থাকতে। কাজেই জোট গঠন প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে এটা বলা যাচ্ছে না। আশা করি আগামী সপ্তাহে একটা সমাধানে পৌঁছব।

এই তিন শক্তির বাইরে বিগত তিনটি নির্বাচনে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা এবং সরকারের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা দুইজন সিনিয়র রাজনীতিবিদের নেতৃত্বে আরও একটি জোট গঠনের খবর বেরিয়েছে। দুই জাতীয় পার্টি ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এ জন্য জাতীয় পার্টির একাংশের চেয়ারম্যান সাবেক মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও জাতীয় পার্টি (জেপি) আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বে বৃহত্তর জোট গঠনের চেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে। এ দুজনই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রী ছিলেন। তা ছাড়া মূল জাতীয় পার্টি নিয়ে এখনও দ্বন্দ্ব চলছে। এক অংশের নেতৃত্বে রয়েছেন গোলাম মোহাম্মদ কাদের; অন্য অংশে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। দুই অংশই দলের প্রতীক লাঙল দাবি করে ইসিতে চিঠি দিয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি ইসি। তাই এই জোট গঠনের আগে জাতীয় পার্টির বিষয়ে সুরাহা হতে হবে ইসি থেকে।

ভোটের আগে জোট গঠন নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. আল মাসুদ হাসানুজ্জামান আমাদের সময়কে বলেন, ভোটের আগে জোটের সমীকরণ এটা নতুন না। আগেও দলগুলো পরস্পরবিরোধী জোট করতে দেখা গেছে। এটা শুধু আমাদের দেশে না। সারা দুনিয়াতেই রয়েছে। তফসিল ঘোষণার আগেই ভোটের জোট দৃশ্যমান হবে।

রাজনৈতিক দলের নেতা এবং বিশ্লেষকদের ধারণা, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে জোট গঠন প্রক্রিয়া শেষ হবে। আর জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন হলে ভোটের পরিবেশ ভিন্ন হবে। সেক্ষেত্রে প্রতিটি জোটের লক্ষ্য থাকবে সরকার গঠন। তাই শেষ পর্যন্ত জোট হবে নাকি আলাদাভাবে ভোট হবে তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে চলতি সপ্তাহের শেষ দিন পর্যন্ত।