Image description

২০২৪ সালে বিশ্ব গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয়েছে বাংলাদেশে। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) করা বিশ্ব গণতান্ত্রিক সূচকে ২৫ ধাপ পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বের আর কোনো দেশের এত বড় অবনমন হয়নি। ‘দ্য গ্লোবাল ডেমোক্রেসি ইনডেক্স: হাউ ডিড কান্ট্রিজ পারফরম ইন ২০২৪? শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব কথা জানিয়েছে বিখ্যাত ম্যাগাজিন ইকোনমিস্টের অনলাইন সংস্করণ। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের স্বৈরাচারী শাসক ছিলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গণতন্ত্রকে পুনঃনির্মাণ করা এক বিশাল কাজ। তা সত্ত্বেও আশাবাদের কারণ আছে। শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে। অর্থনীতিকে করেছে স্থিতিশীল। এ জন্য বাংলাদেশকে ইকোনমিস্ট ২০২৪ সালে ‘কান্ট্রি অব দ্য ইয়ার’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। ১৬৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ২৫ ধাপ পিছিয়ে অবস্থান করছে ১০০তম স্থানে। উল্লেখ্য, ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নির্বাচনের বছর ছিল ২০২৪। এ বছর বিশ্বের কমপক্ষে ৭০টি দেশের প্রায় ১৬৫ কোটি ভোটার ভোট দিয়েছেন। বিশ্বে যত ভোটার বসবাস করেন এই সংখ্যা প্রায় তার অর্ধেক। একটি বছরে এত সংখ্যক দেশে নির্বাচন হলেও তার সবটা গণতান্ত্রিক ছিল না।

এ জন্য ২০২৪ সালটা বড় চ্যালেঞ্জ সামনে এনেছে। ২৭শে ফেব্রুয়ারি ইআইইউ প্রকাশিত সর্বশেষ গণতান্ত্রিক সূচক অনুযায়ী, এই সূচক নির্ধারণ শুরু হয় প্রায় দুই দশক ধরে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের সূচক সবচেয়ে খারাপ রূপ নিয়েছে। ২০০৬ সাল থেকে বিশ্বের ১৬৭টি দেশ ও ভূখণ্ডের ওপর এই সূচক করে আসছে ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিট। তারা শূন্য থেকে ১০-এর ভিত্তিতে দেশগুলোকে ৫টি শ্রেণিতে ভাগ করে। তার তা হলো- নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও বহুত্ববাদ, সরকারের কার্যকারিতা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং নাগরিক স্বাধীনতা। এরপর দেশগুলোকে আবার চারটি শ্রেণিতে সাজানো হয়। তা হলো- পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক দেশ, ত্রুটিপূর্ণ গণতান্ত্রিক দেশ, হাইব্রিড শাসকগোষ্ঠীর দেশ এবং কর্তৃত্ববাদী শাসকগোষ্ঠীর দেশ। এই তালিকায় টানা ১৬তম বারের মতো নরওয়ে বিশ্বের সবচেয়ে গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। তারা শূন্য থেকে ১০-এর মধ্যে স্কোর করেছে ৯.৮১। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় অবস্থানে আছে যথাক্রমে নিউজিল্যান্ড ও সুইডেন। অন্যদিকে ২০২১ সাল থেকে এই সূচকের সবচেয়ে তলানিতে রয়েছে আফগানিস্তান। তারা স্কোর করেছে মাত্র ০.২৫। বিশ্বে গণতান্ত্রিক সূচকের গড় নতুন নিম্নতম রেকর্ডে এসেছে। তা ৫.১৭। ২০১৫ সালে তা ছিল ৫.৫৫। সেখান থেকেও পতন ঘটেছে। বিশ্বের শতকরা মাত্র ৬.৬ ভাগ মানুষ এখন বসবাস করেন পূর্ণাঙ্গ গণতন্ত্রে। দশ বছর আগে এই হার ছিল শতকরা ১২.৫। 

অন্যদিকে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ মানুষ অর্থাৎ প্রতি ৫ জনের মধ্যে দু’জন বসবাস করেন কর্তৃত্ববাদী শাসনের অধীনে। বৈশ্বিক নির্বাচনগুলো সুষ্ঠু করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও অনেক নির্বাচন ছিল প্রহসনের। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পাকিস্তানে নির্বাচনের দিন সহিংসতায় ভোটগ্রহণ বিঘ্নিত হয়। পাকিস্তানে সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনীতিক সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। তার গণতান্ত্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ। নির্বাচনের অল্প আগে তাকে জেলে ঢোকানো হয়। দেশটির স্কোর ৩.২৫ ছিল ২০২৩ সালে। তার অবনমন হয়ে দাঁড়িয়েছে ২.৮৪। রাশিয়াতে হয়েছে আরেকটি লজ্জার নির্বাচন। তাতে ভ্লাদিমির পুতিনকে পঞ্চমবারের মতো প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করা হয়েছে। সূচকে তারা মাত্র দুই পয়েন্ট স্কোর করেছে। বুরকিনা ফাসো, মালি এবং কাতার সহ অন্য দেশগুলোতে নির্বাচনই বাতিল করা হয়েছে। এমনকি ইউরোপে উল্লেখযোগ্য অবনমন হয়েছে সূচক। শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে ৯টিই এই মহাদেশের। পূর্ণাঙ্গ গণতন্ত্রের দেশ থেকে ত্রুটিপূর্ণ দেশের তালিকায় নেমে এসেছে ফ্রান্স। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে একক দল হিসেবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার পর জুনে আগাম নির্বাচন দেন। কিন্তু তাতে তার আস্থার অবনমন ঘটে। নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অবৈধ কৌশল অবলম্বন করা হয়। নির্বাচনে অর্থের ছড়াছড়ি ছিল। এ জন্য সাংবিধানিক আদালত প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচন বাতিল ঘোষণা করে নতুন নির্বাচন আহ্বান করে। এসব ঘটনায় রোমানিয়ার গণতান্ত্রিক ধারার অবনমন ঘটে। ওদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইয়োল দ্রুততার সঙ্গে সামরিক আইন জারি করেন। তাতে দেশ এক মহাসংকটে ডুবে যায়। ফল হিসেবে দ্রুততার সঙ্গে তিনি সামরিক আইন প্রত্যাহার করেন। এরপর দেশটি পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক দেশের শ্রেণি থেকে পিছিয়ে পড়ে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র রয়ে গেছে ত্রুটিপূর্ণ গণতান্ত্রিক শ্রেণিতেই। ২০২৩ সালে তারা যে অবস্থানে ছিল তা থেকে সামান্য পিছিয়ে পড়েছে। তবে এ বছর যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় সমস্যার মুখে পড়তে পারে।  প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম মাসে সিভিল সার্ভিসের রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে চ্যালেঞ্জে ফেলে দিয়েছেন। একগাদা নির্বাহী আদেশ দিয়েছেন, যার আইনগত কর্তৃত্ব নিয়ে আইনগত প্রশ্ন থেকে যায়। নতুন এই নেতা কীভাবে শাসন করাকে বেছে নেন তার ওপর ২০২৫ সালে তাদের গণতান্ত্রিক সূচকের পরীক্ষা নির্ভর করবে।