Image description

থাইল্যান্ড-মিয়ানমার সীমান্তের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা অপরাধীদের অভয়ারণ্য হিসেবে কুখ্যাত। এখানে প্রতারকরা গড়ে তুলেছে এক ধরনের ‘স্ক্যাম সেন্টার’, যেখানে হয় নানাবিধ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড।

এই সেন্টারে বন্দী রয়েছেন অন্তত ২৪ জন বাংলাদেশি। তাদের অনেককে করতে হচ্ছে মানবেতর জীবনযাপন। অবশ্য সেখান থেকে তিনজনকে মুক্ত করে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, থাইল্যান্ড-মিয়ানমার সীমান্তে যেসব বাংলাদেশি নাগরিক বন্দী বা মানবেতর জীবনযাপন করছেন, তাদের বেশিরভাগই সেখানে গিয়েছেন দুবাই থেকে। দালালদের প্রলোভনে পড়ে তারা বেশি টাকা আয়ের আশায় দুবাই থেকে সেখানে যান। পরে অনেকেই প্রতারক চক্রের হাতে বন্দী হয়ে পড়েন। বাধ্য হন স্ক্যাম সেন্টারে কাজ করতে।

থাইল্যান্ডের পশ্চিম সীমান্তের একটি শহর ‘মায়ে সত’। মিয়ানমার সীমান্তের মোয়ে নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে এই শহর। সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল। এলাকাটি ব্যাংকক থেকে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দূরে। সীমান্তের ওপারের অঞ্চলটি মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী ডেমোক্রেটিক কারেন্ট বুড্ডিস্ট আর্মি-ডিকেবিএর নিয়ন্ত্রণে। সেখানে বিদ্রোহীদের সংঘাতের ফলে অনেক নাগরিকই আশ্রয় নিয়েছেন শহরে। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল বলে এলাকাটিতে মিয়ানমার সরকারের একেবারেই নিয়ন্ত্রণে নেই। এই সুযোগেই সীমান্তের এপার-ওপারে গড়ে উঠেছে ‘স্ক্যাম সেন্টার’। এখানেই বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের দিয়ে অনলাইনে প্রতারণা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। অন্যান্য দেশের নাগরিকদের সঙ্গে এখানে রয়েছেন অন্তত ২৪ জন বাংলাদেশিও। অবশ্য এই সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন তথ্য রয়েছে অভিবাসন সংশ্লিষ্টদের। তাদের মতে আরও বেশি বাংলাদেশ আটকে আছেন এই স্ক্যাম সেন্টারে।

তথ্য মতে, বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের প্রতারণা ও জালিয়াতিতে ফাঁসানোর জন্য থাইল্যান্ড-মিয়ানমার সীমান্তের উভয়পাশে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন স্ক্যাম সেন্টার। ক্রিপ্টোকারেন্সি কেনবেচা, অনলাইনে জুয়া, এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে মেয়ে সেজে অনলাইনে প্রতারণা, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হ্যাক, সেক্স ভিডিও তৈরি ইত্যাদি কর্মকাণ্ড চলে এসব স্ক্যাম সেন্টারে। প্রথমে অনেককেই উচ্চ বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন দেশ থেকে স্ক্যাম সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাদের অনেকেই নিয়োগ কর্তা ও দালাল চক্রের হাতে বন্দী হয়ে পড়েন। সেখান থেকে আর সহজেই বের হতে পারেন না। কারণ ওই এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে ডিকেবিএ। অনলাইনে স্ক্যাম সেন্টার থেকে অর্থ আদায় করা ডিকেএবির অন্যতম আয়ের উৎস। ফলে দিনের পর দিন বন্দী হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য হন অনেকে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বাংলানিউজকে জানান, থাইল্যান্ড-মিয়ানমার সীমান্তে যেসব বাংলাদেশি গিয়েছেন, তারা মূলত দুবাই থেকে দালালদের প্রলোভনে পড়ে সেখান যান। থাইল্যান্ডের ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে সে দেশে প্রবেশ করেন। পরে মায়ে সত শহরে গিয়ে অনেকেই বন্দী হয়ে পড়েন। তবে সীমান্তবর্তী শহর হওয়ায় থাইল্যান্ড ও মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে ইতোমধ্যেই তিনজন বাংলাদেশি নাগরিককে সেখান থেকে উদ্ধার করে দেশে ফেরত আনা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, মায়ে সত শহরে প্রায়ই থাইল্যান্ডের নিরাপত্তারক্ষীরা অভিযান চালিয়ে থাকে। তবে অভিযানের সময় প্রতারক চক্রের মূল হোতারা সীমান্ত পেরিয়ে মিয়ানমার চলে যায়। আর মিয়ানমার গিয়ে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ডিকেবিএর কাছে আশ্রয় নেয়। ফলে থাইল্যান্ড সরকার চাইলেও এসব স্ক্যাম সেন্টার সহজেই বন্ধ করতে পারে না। তারপরও তারা বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে থাকে। গত সপ্তাহে অভিযান চালিয়ে দুজন বাংলাদেশিকে উদ্ধার করেছে থাইল্যান্ডের নিরাপত্তারক্ষীরা। দুই সপ্তাহ আগে আরও একজন বাংলাদেশি সীমান্তে মিয়ানমারের অংশ থেকে উদ্ধার হয়েছেন।

সূত্রের তথ্য, চীন, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়াসহ নানা দেশের নাগরিকরা এই স্ক্যাম সেন্টারে যুক্ত। বিশ্বজুড়ে অনলাইনে প্রতারণা করে অর্থ আদায় এদের মূল উদ্দেশ্য। তথ্য-প্রযুক্তিতে যাদের ভালো দক্ষতা রয়েছে, তাদের টার্গেট করে উচ্চ বেতনের অফার দিয়ে প্রথমে তাদের এখানে নিয়ে আসা হয়। পরে বেতন না দিয়ে অনেককেই বন্দী করে ফেলা হয়। এখন ডিকেবিএ ও স্থানীয় চক্রের হাতে ঠিক কতজন বন্দী, সেটা কেউ নিশ্চিত নয়। এছাড়া থাইল্যান্ড-মিয়ানমার সীমান্তে ঠিক কতজন বাংলাদেশি এখন বন্দী রয়েছেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য জানা যায়নি।  

তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, এই মুহূর্তে সেখানে অন্তত ২৪ জন বাংলাদেশ রয়েছেন। আর তিনজন বাংলাদেশি ইতোমধ্যেই উদ্ধার হয়েছেন। স্ক্যাম সেন্টারে বাকি বাংলাদেশি বন্দীদের বিষয়ে ইতোমধ্যেই অবহিত হয়েছে সেখানকার বাংলাদেশ মিশন। থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারের বাংলাদেশ মিশন থেকে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাংলাদেশিদের উদ্ধারের তৎপরতা চালানো হচ্ছে। এছাড়া থাইল্যান্ডও স্ক্যাম সেন্টার বন্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছে। তাদের নিরাপত্তা বাহিনী প্রায়ই অভিযান চালাচ্ছে। সেই অভিযান থেকেই আটকে পড়া বাংলাদেশিরা উদ্ধার হতে পারেন।

বৃহস্পতিবারই (২৭ ফেব্রুয়ারি) থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পায়েতংতার্ন সিনাওয়াত্রা সংসদে বলেন, সরকার স্ক্যাম সেন্টারের বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে কাজ করছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মিয়ানমারে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত ড. মনোয়ার হোসেন বাংলানিউজকে বলেন, থাইল্যান্ড-মিয়ানমার সীমান্তে বেশ কিছু বাংলাদেশি স্ক্যাম সেন্টারের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। সেখান থেকে ইতোমধ্যেই তিনজন বাংলাদেশিকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে তারা যে সবাই বন্দী,  ঠিক এটা বলা যাবে না। কেউ কেউ প্রলোভনে পড়েও এই কাজে যুক্ত হয়েছেন। আমরা সেখানকার সবাইকে উদ্ধার করে দেশে ফেরাতে কাজ করছি।

‘কেউ যেন প্রলোভনে না পড়েন’
মিয়ানমার-থাইল্যান্ড সীমান্তের স্ক্যাম সেন্টারে বন্দী বাংলাদেশিদের বিষয়ে জানতে চাইলে ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান বাংলানিউজকে বলেন, থাইল্যান্ড সীমান্তে অনেক বাংলাদেশি নাগরিক প্রলোভনে পড়ে সেখানে গিয়েছেন। সেখানে গিয়ে তারা আটকে পড়েছেন বলে আমরা জানতে পেরেছি।  

উদ্ধার ও বন্দী বাংলাদেশির সংখ্যার বিষয়ে অবশ্য ভিন্ন তথ্য দেন তিনি। শরিফুল হাসান বলেন, ইতোমধ্যেই সেখান থেকে ১৪ জন বাংলাদেশিকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে আমরা জানতে পেরেছি শতাধিক বাংলাদেশি সেখানে আটকে আছেন। আমি এটা নিয়ে থাইল্যান্ডে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গেও আলাপ করেছি। তিনিও বিষয়টি দেখছেন। কীভাবে সেখান থেকে তাদের উদ্ধার করা যায়, সেটা চেষ্টা করছেন।  

কেউ যেন প্রলোভনে পড়ে এভাবে বিদেশে না যান, সেই আহ্বানও জানান অভিবাসন বিশেষজ্ঞ শরিফুল হাসান।