দেশের নৌপথে বিভিন্ন সেবার শুল্কহার বাড়াতে যাচ্ছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। আগামী ১ জুলাই থেকে এ নতুন ট্যারিফ কার্যকর হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে নৌপথে পণ্য পরিবহনে খরচ বাড়বে।
বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালে সর্বশেষ শুল্কহার বাড়ানো হয়েছিল। সম্প্রতি নৌপথ থেকে মন্ত্রণালয়ের রাজস্ব আয় বাড়ানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে শুল্কবৃদ্ধির প্রস্তাব আসে। প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ অধ্যাদেশ, ১৯৫৮ (১৯৫৮ সালের ৭৫ নম্বর অধ্যাদেশ)-এর ১৯ (৩) ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সরকার বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃক আদায়যোগ্য ভাড়া, টোল, কর, ফি, অন্যান্য চার্জ পুনর্নির্ধারণ করে নতুন ট্যারিফ তফসিল চূড়ান্ত করে। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে গত ১২ মে এ-সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়।
২০১৯ ও ২০২৬ সালের ট্যারিফ তফসিল পর্যালোচনায় দেখা যায়, নৌপথে পণ্য পরিবহন-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন চার্জে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে বিআইডব্লিউটিএ। নৌযান, বন্দর, ঘাট, পণ্য ওঠানামা, বার্থি, মুরিং ও নৌপথ ব্যবহারের চার্জ বৃদ্ধির নতুন হার কার্যকর হলে নৌপথে পণ্য পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর প্রভাব পড়তে পারে নির্মাণসামগ্রী, কৃষি, শিল্প কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্য পরিবহন ব্যয়ে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানির দাম দুই দফায় বৃদ্ধিতে নৌ-পরিবহনে ভাড়া বেড়েছে। এখন ঘাট-পয়েন্ট পর্যায়ে পণ্য খালাসে শুল্কহার বাড়ানোর ফলে ইজারাগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান পণ্যের ওপর বাড়তি অর্থ যুক্ত করবে। দেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন রুটে আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন ট্যারিফ কার্যকর হলে বিভিন্ন সেবায় গড়ে প্রায় ৩০ শতাংশ শুল্ক বাড়বে বলে জানিয়েছেন বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তারা। তবে কিছু কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্কহার তুলনামূলক বেশি বেড়ে যাওয়ায় দেশের কৃষি ও ভোগ্যপণ্য খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
দেশীয় কার্গো, বাল্কহেড, ফেরি, ফ্ল্যাট ইত্যাদি নৌযানের কনজারভেন্সি চার্জ ২০১৯ সালে প্রতি গ্রস টনে বার্ষিক শুল্ক ছিল ৪০ টাকা। নতুন নিয়মে একই ধরনের দেশীয় কার্গো/বাল্কহেড/ফ্ল্যাট/ফেরি শ্রেণীর চার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি গ্রস টনে ১০০ টাকা। অর্থাৎ এক্ষেত্রে শুল্ক বৃদ্ধির হার ১৫০ শতাংশ। বিদেশী পতাকাবাহী পণ্যবাহী নৌযানের ক্ষেত্রে ২০১৯ সালে চার্জ ছিল প্রতি গ্রস টনে ২১০ টাকা, নতুন ট্যারিফ কাঠামোয় তা ৮০০ টাকা। এক্ষেত্রে শুল্ক বেড়েছে প্রায় ২৮১ শতাংশ। নৌযানের পাইলটেজ ফি প্রতি বিট ৫০০ থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ৭৫০ টাকা। পাইলটেজ ফি বৃদ্ধিতে চট্টগ্রাম থেকে চরগজারিয়া/আজাদ বাজার পর্যন্ত নৌপথকে চার বিট হিসেবে গণনা করায় ওই রুটে ব্যয় আরো বাড়বে। এতে পণ্যবাহী বড় নৌযান ও বাল্ক কার্গো পরিবহনের খরচ ট্রিপপ্রতি অনেকটা বেড়ে যাবে।
নতুন বর্ধিত শুল্কহারে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে বার্থিং চার্জ। ২০১৯ সালে পণ্যবাহী নৌযানের জন্য টনভিত্তিক একাধিক স্তর ছিল। ওই সময়ে ৫০ টন পর্যন্ত নৌযানের জন্য ১২৫ টাকা, ৫১-১০০ টনে ১৫০, ১০১-২৫০ টনে ১৭৫, ২৫১-৫০০ টনে ২০০, ৫০১-৭৫০ টনে ২৪০, ৭৫১-১,০০০ টনে ৩১৫, ১,০০১-১,৫০০ টনে ৪০০, ১,৫০১-২,০০০ টনে ৫৭৫, ২,০০১-২,৫০০ টনে ৮৫০, ২,৫০১-৩,০০০ টনে ১ হাজার ১২৫ এবং তিন হাজার টনের ঊর্ধ্বে ১ হাজার ৬৮০ টাকা ছিল। কার্যকর হতে যাওয়া নতুন শুল্কহারে ৫০০ টন পর্যন্ত ৩০০ টাকা, ৫০১-১,০০০ টনে ৫০০, ১,০০১-২,৫০০ টনে ১ হাজার এবং ২ হাজার ৫০০ টনের ঊর্ধ্বে চার্জ ২ হাজার টাকা করা হয়েছে। ফলে মাঝারি আকারের নৌযানে পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়বে সবচেয়ে বেশি। মাঝারি পণ্যবাহী নৌযানের শুল্কহার ১০৮ থেকে ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
এদিকে নতুন শুল্কহারে মুরিং চার্জও বেড়েছে। ২০১৯ সালে পণ্যবাহী নৌযানের মুরিং চার্জ ৫০ টন পর্যন্ত ছিল ৬২ টাকা, ৫১-১০০ টনে ৭৫, ১০১-২৫০ টনে ৮৭, ২৫১-৫০০ টনে ১০০, ৫০১-৭৫০ টনে ১২০, ৭৫১-১,০০০ টনে ১৫৭, ১,০০১-১,৫০০ টনে ২০০, ১,৫০১-২,০০০ টনে ২৮৭, ২,০০১-২,৫০০ টনে ৪২৫ এবং তিন হাজার টনের ঊর্ধ্বে ৭৮৪ টাকা। নতুন শুল্কহারে ২৫০ টন পর্যন্ত মুরিং চার্জ ১০০ টাকা, ২৫১-৫০০ টনে ১৫০, ৫০১-১,০০০ টনে ২০০, ১,০০১-১,৫০০ টনে ৩৫০, ১,৫০১-২,০০০ টনে ৫০০, ২,০০১-২,৫০০ টনে ৬৫০ এবং ২ হাজার ৫০০ টনের ঊর্ধ্বে ১ হাজার টাকা করা হয়েছে। এখানে ১,০০১-১,৫০০ টনের ক্ষেত্রে মুরিং চার্জ বেড়েছে ৭৫ শতাংশ, ১,৫০১-২,০০০ টনে ৭৪ এবং ২,০০১-২,৫০০ টনের মুরিং চার্জ বেড়েছে প্রায় ৫৩ শতাংশ।
নতুন শুল্কহারে পণ্য ওঠানামা বা ল্যান্ডিং-শিপিং/থ্রু-পুট চার্জেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০১৯ সালে বন্দর এলাকায় পণ্য ওঠানামায় প্রতি টনের চার্জ ছিল ৩৪ টাকা ৫০ পয়সা। ২০২৬ সালে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের জন্য প্রতি ১০০ কেজিতে ৭ টাকা বা প্রতি টন ৭০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি টনের চার্জ বেড়েছে ১০৩ শতাংশ। লাইসেন্সপ্রাপ্ত জেটি বা ফোরশোর দিয়ে পণ্য ওঠানামার ক্ষেত্রেও প্রতি টনে ৫০ টাকা এবং প্রতি ঘনফুটে ৫০ পয়সা চার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন শুল্কহারে পণ্যবাহী নৌযানের শ্রেণী বিন্যাসের পরিবর্তন ছাড়াও ছোট স্তরের সংখ্যা কমিয়ে বড় ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে কিছু কিছু নৌযানের জন্য আগের তুলনায় উচ্চহারের শ্রেণীতে চার্জ বা শুল্ক পরিশোধ করতে হবে। বিশেষ করে ৫০১ থেকে ২ হাজার ৫০০ টনের নৌযানে বার্থিং ও মুরিং ব্যয় আগের তুলনায় বেশি বেড়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথে সিমেন্ট, পাথর, বালি, কয়লা, সার, খাদ্যশস্য ও শিল্প কাঁচামাল পরিবহনে এ ধরনের নৌযানের ব্যবহার বেশি। ফলে নতুন শুল্কহার সরাসরি বাল্ক পণ্য পরিবহনের খরচে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী।
নৌপথ সাধারণত সড়ক ও রেলের তুলনায় কম ব্যয়বহুল পরিবহনমাধ্যম হিসেবে বিবেচিত। ব্যবসায়ীদের মতে, নৌপথে প্রতি টনে পরিবহন ব্যয় সামান্য বাড়লেও বেশি পরিমাণ পণ্যের কারণে মোট ব্যয়ে প্রভাব পড়ে। তাই নতুন শুল্কহার কার্যকর হলে দেশের মাঝারি ও ভারী শিল্পের কাঁচামাল, ভোগ্যপণ্য পরিবহনে ব্যয় বেড়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন তারা।
তবে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ বলছে, দেশের বিগত ছয়-সাত বছরে সড়ক ও রেলপথে পরিবহন খরচ অনেক বেড়েছে। জ্বালানি, শ্রমিক মজুরিসহ পরিচালন ব্যয় বেড়ে গেলেও দীর্ঘদিন ধরে নৌপথে শুল্কহার বাড়ানো হয়নি। সংস্থাটি নৌপথ সংরক্ষণ, ড্রেজিং, ঘাট ব্যবস্থাপনা, টার্মিনাল উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও নৌ-সহায়ক অবকাঠামোর ব্যবস্থাপনা করে। প্রতি বছর এসব খাতে পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। সাত বছরে মূল্যস্ফীতি, মজুরি, জ্বালানি ও নির্মাণসামগ্রীর খরচ বেড়ে যাওয়ায় কর্তৃপক্ষের রাজস্ব কাঠামো পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজনে নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে শুল্কহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক একেএম আরিফ উদ্দিন (বন্দর ও পরিবহন) বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নৌ খাতের চার্জ তিন বছর অন্তর বাড়ানোর নিয়ম রয়েছে। বিভিন্ন কারণে শুল্কহার বাড়ানোর প্রক্রিয়া ছয়-সাত বছর পিছিয়েছে। এ সময়ে অনেক কিছুর ব্যয় বেড়েছে, বিআইডব্লিউটিএর পরিচালন ব্যয়ও বেড়েছে। সার্বিকভাবে সরকার সব পক্ষের জন্য সহনীয় রেখে নৌযান ও নৌপথের বিভিন্ন চার্জ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন শুল্কহার কার্যকর হবে।’
পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৬ সালের ট্যারিফ কাঠামোয় দেশীয় কার্গো নৌযানের কনজারভেন্সি চার্জ আড়াই গুণ, বিদেশী পণ্যবাহী নৌযানের চার্জ প্রায় চার গুণ, পণ্য ওঠানামার চার্জ দ্বিগুণের বেশি এবং মাঝারি আকারের পণ্যবাহী নৌযানের বার্থিং-মুরিং চার্জ ৫০ থেকে ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ফলে নৌপথে পণ্য পরিবহনের সামগ্রিক খরচ আগামী মাস থেকে বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে শিল্প উৎপাদন ব্যয় ও অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলবে। পাশাপাশি নৌপথনির্ভর হওয়ায় বিভিন্ন উপকূলীয় জেলায় পণ্য পরিবহন খরচ বেড়ে স্থানীয়দের জীবনযাপন ব্যয় বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানতে চাইলে দ্য চিটাগং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিচালন ব্যয় নিকটবর্তী ও প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। প্রায় দ্বিগুণ পরিচালন ব্যয় দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করে দেশীয় ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছানো কঠিন কাজ। দেশের বিভিন্ন পণ্য, শিল্পের কাঁচামাল বিশ্ববাজার থেকে বন্দরে আমদানির পর নৌপথেই সারা দেশের কারখানাগুলোতে সবচেয়ে বেশি পরিবহন হয়। এখন নৌপথের শুল্কহার বাড়লে ব্যবসা পরিচালনাই কঠিন হয়ে যাবে।’
জানা গেছে, দেশের বন্দরগুলোয় পণ্য আমদানির পর এসব কাঁচামালের একটি বড় অংশ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছোট-মাঝারি লাইটারেজ জাহাজে পরিবহন হয়। বিশেষ করে বাল্কে আমদানি হওয়া শস্য, সিমেন্ট ক্লিংকার, ইস্পাতপণ্য, ভোজ্যতেল বড় জাহাজ থেকে দেশীয় নৌযানে করে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের প্রধান প্রধান শিল্প এলাকায় পরিবহন হয়। অন্যদিকে দেশের ১৯টি উপকূলীয় ও নৌ-পরিবহন সুবিধা থাকা জেলাগুলোয় ছোট ও মাঝারি নৌযানে পণ্য পরিবহন হয়।