Image description

লোকোমোটিভের ( ইঞ্জিন ) সংকট আর ত্রুটির কারণে ঈদের ফিরতি যাত্রায় ভুগেছেন ট্রেনের যাত্রীরা । এসব কারণে ১ থেকে ৬ জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ রেলওয়ের ঢাকা বিভাগেই অন্তত ৩০ টি ট্রেন দেরিতে ছেড়েছে । কিছু ট্রেনের দেরি হয়েছে এক থেকে চার ঘণ্টা । সংকেত ত্রুটিতে বিলম্ব হয় ১৩ ট্রেনের । ইঞ্জিনসংকটে ফিরতি যাত্রা সামাল দিতে রেলওয়েকে এ সময়ে প্রতিদিন প্রায় ১৪ টি লোকাল ও মেইল ট্রেনের চলাচল বন্ধ রাখতে হয় । এতে এসব ট্রেনের যাত্রীরা বঞ্চিত হয়েছে সেবা থেকে । রেলওয়ের ঢাকা বিভাগের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে ; যা রেলওয়ের ইঞ্জিনসংকটকে আবারও সামনে আনল । ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী , ঈদের

বাংলাদেশ রেলওয়ে

» ইঞ্জিনের কারণে ১ থেকে ৬ জুন ঢাকা বিভাগে ৩০ ট্রেনে দেরি । » সবচেয়ে বেশি নয়টি করে ট্রেন ছাড়ায় দেরি হয় ১ ও ৫ জুন ।

ফিরতি যাত্রার সময় ১ থেকে ৬ জুন পর্যন্ত শুধু ইঞ্জিন দেরিতে পাওয়ার কারণে ৩০ টি ট্রেন নির্ধারিত সময়ের পরে যাত্রা শুরু করে । এর মধ্যে ১ জুন সবচেয়ে বেশি ৯ টি ট্রেন বিলম্বে চলাচল করে । সেদিন উপকূল এক্সপ্রেস নির্ধারিত সময়ের ১ ঘণ্টা ৫৫ মিনিট

» সর্বোচ্চ বিলম্ব ৩ ঘণ্টা ৫৫ মিনিট , বেশি বুড়িমারী এক্সপ্রেসে । » ইঞ্জিন ট্রাবলের ঘটনা ১৭ টি , ইঞ্জিন বিকলের ঘটনা ঘটে ১৬ টি ।

পরে , বুড়িমারী এক্সপ্রেস ১ ঘণ্টা ২০ মিনিট , তিতাস কমিউটার ট্রেন ১ ঘণ্টা ৫ মিনিট , অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস ৫০ মিনিট , এগারসিন্ধুর ও গোধূলী ৪০ মিনিট , উপবন ও যমুনা এক্সপ্রেস ২৫ মিনিট করে , মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস ২০

ইঞ্জিনসংকট ভোগাল শেষ পৃষ্ঠার পর মিনিট এবং তূর্ণা নিশীথা এক্সপ্রেস ১৫ মিনিট দেরিতে ছেড়ে যায় । ৩ জুন কালনী এক্সপ্রেস ১ ঘণ্টা ১৫ মিনিট দেরিতে চলাচল করে । ৪ জুন তুর্ণা ১ ঘণ্টা ৫ মিনিট , দেওয়ানগঞ্জ কমিউটার ১০ মিনিট এবং মহুয়া কমিউটার ৩০ মিনিট বিলম্বে ছেড়ে যায় । ৫ জুন বিলম্বে ছাড়ে ৯ টি ট্রেন । এগুলোর মধ্যে পর্যটক এক্সপ্রেস , সোনার বাংলা এবং বুড়িমারী এক্সপ্রেস ও মহুয়া কমিউটার ৫৫ মিনিট করে , উপবন এক্সপ্রেস ১ ঘণ্টা ২০ মিনিট এবং মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেন ১ ঘণ্টা ১৫ মিনিট বিলম্বে ছাড়ে । ৬ জুন দেরি হয় আটটি ট্রেনের । এ

গুলোর মধ্যে বুড়িমারী এক্সপ্রেস নির্ধারিত সময়ের ৩ ঘণ্টা ৫৫ মিনিট , লালমনি এক্সপ্রেস ১ ঘণ্টা ২৫ মিনিট , কক্সবাজার ও তূর্ণা ১ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট , তিস্তা এক্সপ্রেস ৫০ মিনিট , উপবন ৪০ মিনিট এবং করতোয়া ট্রেন ৩৫ মিনিট বিলম্বে ছেড়ে যায় । এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক ( ডিআরএম ) এ বি এম কামরুজ্জামান আজকের পত্রিকাকে বলেন , ঈদের সময় মূলত পশ্চিমাঞ্চল থেকে ঢাকাগামী কিছু ট্রেন বিলম্বে চলাচল করেছে । পূর্বাঞ্চলের কিছু ট্রেনেও এই সমস্যা হয়েছে । এর পেছনে লোকোমোটিভ - সংক্রান্ত কিছু সমস্যা থাকলেও যাত্রীর অতিরিক্ত চাপ ছিল অন্যতম কারণ । যাত্রীদের নিরাপদে ওঠানামার জন্য বিভিন্ন স্টেশনে ট্রেন বেশি সময় দাঁড় করিয়ে রাখতে হয়েছে ।

ফলে কিছু ট্রেনের চলাচলে বিলম্ব হয়েছে । ট্রেন বিলম্বের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী , ১ থেকে ৬ জুন পর্যন্ত ঢাকা বিভাগে অন্তত আটটি সংকেত ( সিগন্যাল ) ত্রুটির কারণে ১৩ টি ট্রেন ১০ থেকে ৪৫ মিনিট পর্যন্ত বিলম্বিত হয় । এর মধ্যে আখাউড়া বাইপাসে সিবিআই সিস্টেম বিকল ; টঙ্গী , বরমচাল , নান্দিনা , ঢাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পয়েন্ট ট্রাবল ও পয়েন্ট ফ্ল্যাশিং এবং বিদ্যাগঞ্জে প্যানেল বোর্ড বিকল হয় । বিদ্যাগঞ্জে প্যানেল বোর্ড ৪ ঘণ্টা ২৫ মিনিট বিকল ছিল । ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পয়েন্ট ফেইলিউরের ঘণ্টা ২০ মিনিট সংকেতব্যবস্থা ব্যাহত হয় । ১ থেকে ৬ জুন পর্যন্ত ঢাকা বিভাগে চারটি ইঞ্জিনে ত্রুটি এবং একটি ইঞ্জিন বিকল হয় । তবে গত ২৩ মে থেকে ২৭ মে পর্যন্ত সারা দেশে ১৬ টি ইঞ্জিন বিকল হয় ।

কারণে

জুন টঙ্গী - ধীরাশ্রম সেকশনে তুরাগ -৩ ট্রেনের ইঞ্জিনে ত্রুটির কারণে ট্রেনটি ৪৫ মিনিট বিলম্বিত হয় । একই দিনে ফাতেমানগরে জামালপুর কমিউটার ট্রেন ৪০ মিনিট বিলম্বে চলে । ৪ জুন আউলিয়ানগরে দেওয়ানগঞ্জ কমিউটার ট্রেনের ১০ মিনিট দেরি হয় । ৫ জুন আউলিয়ানগরে হাওর এক্সপ্রেস ১২ মিনিট দেরিতে চলে । ৪ জুন জয়দেবপুর স্টেশনে তুরাগ- ১ ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয় । পরে

রিলিফ ইঞ্জিন সংযুক্ত করে ট্রেনটি চালানো হয় । এতে ট্রেনটি ৩ ঘণ্টা ৫ মিনিট বিলম্বিত হয় ।

ঈদযাত্রায় ১৭ ইঞ্জিনে ত্রুটি ( ট্রাবল ) প্রতিবেদন সূত্র বলছে , ঈদযাত্রায় ২৩ থেকে ২৭ মে পর্যন্ত ঢাকা বিভাগে অন্তত ১৭ টি ইঞ্জিন ট্রাবল হয় । এসব ঘটনায় বিভিন্ন ট্রেন ২৫ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত বিলম্বিত হয় । ২৩ মে সাতটি ইঞ্জিনে ত্রুটি হয় । ২৪ মে দুটি , ২৫ মে চারটি , ২৬ মে দুটি এবং ২৭ মে একটি ইঞ্জিন ট্রাবল হয় ।

ইঞ্জিনসংকটে বন্ধ ছিল ১৪ মেইল- লোকাল ট্রেন ট্রেন বিলম্বের প্রতিবেদনে দেখা গেছে , ঈদের ফিরতি যাত্রায় ১ থেকে ৬ জুন পর্যন্ত ইঞ্জিনের অপ্রাপ্যতার কারণে প্ৰতিদিন ১৪ টি মেইল ও লোকাল ট্রেনের চলাচল বন্ধ ছিল । সুরমা , নোয়াখালী , ভাওয়াল , ধলেশ্বরী মেইলসহ ময়মনসিংহ , দেওয়ানগঞ্জ ও মোহনগঞ্জ লোকাল ট্রেনের একাধিক ট্রিপ বাতিল করা হয় । জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো . আফজাল হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন , মেয়াদোত্তীর্ণ লোকোমোটিভ মূল সমস্যা । এর কয়েকটিতে বারবার ত্রুটি দেখা দিচ্ছে ।

লোকোমোটিভের অনেক যন্ত্রাংশ নির্দিষ্ট সময় পর পরিবর্তনের প্রয়োজন হলেও অতীতে দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্টরা প্রয়োজনীয় উদ্যোগ না নেওয়ায় সেগুলো যথাসময়ে প্রতিস্থাপন করা হয়নি । ফলে বর্তমানে কিছু নতুন ইঞ্জিনে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দিচ্ছে । তবে এসব সমস্যা সমাধানে রেলওয়ে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সংগ্রহ এবং লোকোমোটিভগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও সার্ভিসিং নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে । রেলওয়ের সূত্র জানায় , বর্তমানে রেলওয়ের বহরে মোট ২৭১ টি লোকোমোটিভ রয়েছে , যেগুলোর মধ্যে ১৭৭ টি সচল । সচলগুলোর মধ্যে মিটারগেজ ইঞ্জিন ৯০ টি ও ব্রডগেজ ৮৭ টি । বাকিগুলো মেরামত রক্ষণাবেক্ষণে আছে । লোকোমোটিভের মধ্যে মিটারগেজের প্রায় ৬৫ শতাংশ এবং ব্রডগেজের প্রায় ৪৫ শতাংশ মেয়াদোত্তীর্ণ । 

দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের বুয়েট ) অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মো . হাদিউজ্জামান আজকের পত্রিকাকে বলেন , মেয়াদোত্তীর্ণ লোকোমোটিভ বারবার মেরামত করে সচল রাখার চেষ্টা করা হলেও তা দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর সমাধান নয় । রেলের সংকট কাটাতে দ্রুত নতুন লোকোমোটিভ কেনার উদ্যোগ নিতে হবে । তবে কেনার সময় প্রয়োজনীয় স্পেসিফিকেশন ও স্পেয়ার পার্টসের নিশ্চয়তা থাকতে হবে । পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশ থেকে ব্রডগেজ ইঞ্জিন ধার নিয়েও সংকটের সমাধান করা যায় ।