Image description

মধ্যপ্রাচ্যের সংকট অনেক কিছুই শিখিয়েছে বিশ্বকে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি-সংক্রান্ত জটিলতা জ্বালানি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চরম দুর্বলতা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে সরকার। এজন্য তৈরি হতে যাওয়া পঞ্চবার্ষিক অর্থনৈতিক সংস্কার ও কৌশলে (২০২৬-৩১) বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে জ্বালানি খাত। এখানে প্রচলিত ব্যবস্থাপনা এবং ধ্যান-ধারণা ভেঙে জ্বালানি শক্তি রূপান্তরে জোর দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

‘ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে সমৃদ্ধি’ শিরোনামে এ কৌশলপত্রে পুনরুদ্ধার, উত্তরণ এবং পুনর্গঠন কৌশলে তিন স্ট্র্যাটেজি গ্রহণ করা হয়েছে। এটি তৈরি করছে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)।

এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি বলেছেন, জ্বালানি নিরাপত্তায় আত্মনির্ভরশীল নীতি গ্রহণ করছে সরকার। বৈশ্বিক কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং আগামীতে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি তৈরি করতে হলে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। এজন্য পঞ্চবার্ষিক কৌশলপত্রে এ বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

কৌশলপত্রের খসড়ায় বলা হয়েছে, দেশের দুর্বলতা হচ্ছে অভ্যন্তরীণ গ্যাসের মজুদ কমছে। সেই সঙ্গে ৭ থেকে ১২ শতাংশ সিস্টেম লস আছে। এ ছাড়া জ্বালানি আমদানির ঝুঁকি রয়েছে। এক্ষেত্রে অস্থির স্পট এলএনজির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যৎ সংকট বাড়াতে পারে। সেটি করা না গেলে আর্থিক চাপ বাড়তেই থাকবে। অর্থাৎ বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি পেমেন্ট এবং ব্যাপক ভর্তুকি যাচ্ছে এই জ্বালানি খাতেই। এক্ষেত্রে সৌরশক্তির সম্প্রসারণ করা হবে।

আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ইউটিলিটি-স্কেল পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে সোলার প্যানেল করা হবে। সেই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ ভাসমান সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি এবং শুধু রুফটপ বা ছাদ থেকেই ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। এজন্য রুফটপ সোলার প্রোগ্রাম হাতে নেওয়া হবে। পাশাপাশি ১০০ মেগাওয়াট অফশোর উইন্ড (বায়ু) বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে।

পরিকল্পনায় আরও থাকছে ২০২৮ সালের মধ্যে ১০০টি নতুন গ্যাসকূপ খনন করা (১৫০০ এমএমসিএফডি), মহেশখালী-বাখরাবাদ পাইপলাইন নির্মাণ করা এবং সিস্টেম লস ২ থেকে ৩ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তিতে স্থানান্তরিত করা হবে। বছরে ৭ দশমিক ৬ মিলিয়ন টন আমদানি ক্ষমতা সুরক্ষিত করা হবে। ইস্টার্ন রিফাইনারিকে আপগ্রেড করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ আগামীর সময়কে বলেছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে আমাদেরও যেতেই হবে। দেশের জ্বালানি সক্ষমতা বৃদ্ধির যে উদ্যোগগুলো নেওয়া হচ্ছে সেগুলো ভালো। তবে প্রশ্ন হলো কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হয়। নতুন উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নে বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে সরকার যেসব চুক্তি করবে, সেগুলোয় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। এগুলোয় স্বচ্ছতা নিশ্চিতের পাশাপাশি জবাবদিহি থাকা দরকার।

কৌশলপত্রের খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, অকার্যকর পিপিএএসগুলো পুনঃআলোচনা বা বাতিল করা হবে। বর্তমানে বিপুল ভর্তুকি ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে লক্ষ্যযুক্ত ভর্তুকিতে স্থানান্তরিত হতে হবে। স্বচ্ছ বিইআরসি পর্যালোচনা পদ্ধতি প্রয়োগ করা হবে। ১০ গিগাওয়াট পরিচ্ছন্ন শক্তির লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। নতুন কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার পাশাপাশি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ইউনিট ১ (ডিসেম্বর ২০২৬) এবং ইউনিট ২ (ডিসেম্বর ২০২৭)-এর মধ্যে নিরাপদ চালু করা হবে। গ্রিড আধুনিকীকরণ করা হবে। এক্ষেত্রে কমপক্ষে ৫০০ মেগাওয়াট গ্রিড-স্কেল ব্যাটারি স্টোরেজ স্থাপন করা হবে। এইচভিডিসি আপগ্রেড, স্ক্যাডা সিস্টেম এবং উন্নত শক্তি ব্যবস্থাপনা সিস্টেম স্থাপন করা হবে।

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আঞ্চলিক একত্রীকরণ করা হবে। এর মধ্যে আদানি পাওয়ারের পেমেন্ট-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান করা হবে। পাশাপাশি আপগ্রেড করা হবে বহরমপুর-ভেড়ামারা এইচভিডিসি লাইন ব্যবহার করে নেপাল থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানি সম্প্রসারণ করা হবে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ বলেছে, কর-বৈষম্যের শিকার জ্বালানি খাত। আগামী বাজেটে সবুজ রাজস্বনীতি ঘোষণা প্রয়োজন। সোমবার নিজস্ব কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে সংস্থাটি এমন কথা বলেছে। সিপিডির গবেষণা প্রধান খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেছেন, নীতিগত বৈষম্যের কারণে দেশে, নতুন ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি আসার পথ এখনো সংকুচিত রয়েছে।

এদিকে আগামী অর্থবছরের বাজেটে সৌরবিদ্যুতের সব ধরনের উপকরণ আমদানিতে শুল্ক কর ২০৩০ সাল পর্যন্ত অব্যাহতি দেওয়া হতে পারে। এ ছাড়া সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত করমুক্ত করা এবং সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের বিল পরিশোধে ৫ শতাংশ রেয়াত বাবদ অব্যাহতি দেওয়া হতে পারে।