Image description
আমের বাম্পার ফলনেও হতাশ কৃষক

বাংলাদেশের আম স্বাদে ও গন্ধে যে কোনো ক্রেতাকে সহজেই আকৃষ্ট করে। প্রতিবছরই আম চাষ বাড়ছে, বাড়ছে উৎপাদনও। তবে বাড়ছে না রপ্তানি। উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম হলেও রপ্তানি তলানিতে। দেশে দেশে আমকেন্দ্রিক শিল্পের প্রসার ঘটলেও আমাদের দেশ তার ধারে-কাছেও নেই। কৃষি বিভাগ বলছে, বাংলাদেশের আমের বাজার ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। শুধু রপ্তানি সহজ হলে তা ২৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। তবে রপ্তানি বাড়াতে হবে। শুধু সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মানসম্মত ও নিরাপদ আম রপ্তানি করে শীর্ষে উঠে আসা সম্ভব। শীর্ষ উৎপাদনকারী দেশ হওয়ার পরও ৪ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশের হিস্যা নগণ্য। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদন থেকে শুরু করে বিমানবন্দর পর্যন্ত যথাযথ ব্যবস্থাপনা পরিপালন না করলে রপ্তানির এ সুযোগ কাজে লাগানো যাবে না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কয়েক বছর ধরেই রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলায় রপ্তানিযোগ্য বিপুল পরিমাণ আম উৎপাদিত হচ্ছে। কিন্তু সরকারের বিদ্যমান নীতির কারণে রপ্তানি বাড়ছে না। পূরণ হচ্ছে না রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রাও। যেটুকু রপ্তানি হয় তাতে চাষিরা উপকৃত হচ্ছেন না। রাজশাহী অঞ্চলের চাষিদের আরও অভিযোগ, ঢাকার রপ্তানি সিন্ডিকেটের পেটে যাচ্ছে পুরো মুনাফা। ঢাকার সিন্ডিকেট চাষি পর্যায় থেকে আম না কিনে আড়ত থেকে আম কিনে বিদেশে পাঠাচ্ছে। মানসম্মত আম না যাওয়ায় বিদেশে বাংলাদেশি আমের বাজার তৈরি হচ্ছে না।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ মৌসুমে দুই লাখ ৫ হাজার ২০৫ হেক্টর বাগান থেকে আম উৎপাদিত হয় ২৬ লাখ ৬২ হাজার ৫৮৩ টন। ২০২৫-২৬ মৌসুমে উৎপাদন কমে ২৫ লাখ ৩৮ হাজার ৯৮৭ মেট্রিক টনে দাঁড়ায়। চলতি ২০২৬-২৭ মৌসুমে আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৬ লাখ ৬৮ হাজার ৪৯৮ টন। এর আগে ২০২২-২৩ মৌসুমে দেশে সর্বোচ্চ ২৮ লাখ ৬৭ হাজার ৬৭৮ টন আম উৎপাদিত হয়েছিল।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিদেশে রাজশাহীর আমের বিপুল চাহিদা আছে। আন্তর্জাতিক বাজারে আম রপ্তানিতে জায়গা পেতে হলে বাগান থেকে ফল সংগ্রহ, নির্দিষ্ট মানে সংরক্ষণ, প্যাকেজিং ও পরিবহণ সুবিধা থাকা জরুরি যা এখনো গড়ে ওঠেনি। রাজশাহী আঞ্চলিক ফল গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. রিদওয়ানুল কারিম জানান, আম রপ্তানির ক্ষেত্রে নির্ধারিত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড রয়েছে। রপ্তানি আমে দাগ না থাকা ও সঠিক কৌশলে ফ্রুট ব্যাগিং করা প্রয়োজন। আমে পোকা থাকা চলবে না। আমকে থার্মাল হাউজে জীবাণুমুক্ত করাও দরকার পড়ে। গ্যাপ (গুড অ্যাগ্রিকালচারাল প্রাকটিস) সনদ লাগে। চাষিরা এসব ঝামেলা পোহাতে পারেন না। তিনি বলেন, আমপ্রধান এলাকায় রপ্তানি উপযোগী অবকাঠামো তৈরি করা জরুরি। এসব নিয়ে কাজ হচ্ছে। সর্বোপরি সরকারি সহায়তাও খুব প্রয়োজন।

রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনকারী চাঁপাইনবাবগঞ্জের রফিকুল ইসলাম বলেন, বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আম রপ্তানি না বাড়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে বাগান থেকে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় ঢাকায় আম পাঠাতে শীতাতপ ভ্যানের অভাব ও বিপুল পরিবহণ খরচ। বাগান থেকে ঢাকায় ও বিদেশ পর্যন্ত এক কেজি আমের পরিবহণ খরচ প্রায় ৮৫০ টাকা। আমরা রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন করতে সক্ষম হলেও রপ্তানির সব ধাপ অতিক্রম করা অনেক কঠিন। রপ্তানি বাড়াতে হলে সবকিছু সহজ করতে হবে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের আরেক উদ্যোক্ত মুনজের আলম মানিক বলেন, অতীতে চেষ্টা করেছি রপ্তানির জটিল ধাপগুলো অতিক্রমের। কিন্তু কাজটা বিদ্যমান নীতি ব্যবস্থায় সহজ নয়। রপ্তানির ক্ষেত্রে অন্যতম সমস্যা হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানের কোল্ড চেইন সুবিধার অভাব, গ্যাপ সনদের স্বল্পতা, উন্নত প্যাকেজিং, প্রমিতকরণ ও পর্যায়িতকরণ ব্যবস্থার ঘাটতি, উচ্চ পরিবহণ ব্যয় এবং ফাইটোস্যানিটারি শর্ত পূরণের জটিলতা বাংলাদেশের আম রপ্তানিতে বড় বাধা।

জানা গেছে, আম রপ্তানিতে উৎসাহদানে ‘রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্প’ নামের একটি প্রকল্প চলছে কয়েক বছর ধরে। এই প্রকল্পের আওতায় রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনে চাষিদের প্রশিক্ষণ ও নির্দেশনা দেওয়া হয়ে থাকে। দেওয়া হয় হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ। প্রকল্পের আওতায় ‘উত্তম কৃষিচর্চা’ (গুড অ্যাগ্রিকালচারাল প্রাকটিস) বা গ্যাপ নামের কর্মসূচি আছে। এর আওতায় আম উৎপাদন, ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তি এবং পরিবেশবান্ধব কলাকৌশল চাষিদের শিক্ষা দেওয়া হয়। এছাড়া চাষিদের সঙ্গে রপ্তানিকারকদের সংযোগ স্থাপন ও সহায়তা প্রদান করা হয়। এর পরও রপ্তানিতে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হচ্ছে না।

তথ্য বলছে, বর্তমানে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের ৩৮টি দেশে আম রপ্তানি হয়। চাষিরা বাড়তি খরচ করে রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন করলেও রপ্তানির সুযোগ পাচ্ছেন না। এ বছরও আম রপ্তানির অর্ধেক লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না। ফলে চাষিদের হতাশা থেকেই যাচ্ছে। চাষিরা বলছেন, এ বছরও ৩০ হাজার টন রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদিত হয়েছে। এর বিপরীতে লক্ষ্যমাত্রা মাত্র ৫ হাজার টন।

জানা গেছে, ২০১৬-১৭ মৌসুমে আম রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩০৯ টন। এর পাঁচ বছর পর আম রপ্তানির পরিমাণ বেড়ে হয় ১ হাজার ৭৬৭ টন। ২০২২-২৩ মৌসুমে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ১০০ টন আম যায় বিদেশে। তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আম রপ্তানি কমে হয় ১ হাজার ৩২১ টন। ২০২৪-২৫ মৌসুমে আম রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ৫ হাজার মেট্রিক টন নির্ধারণ করা হলেও রপ্তানি হয় ২ হাজার ১২১ টন। বিশ্ববাজারে রপ্তানি হওয়া আমের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মার্কেট শেয়ার মাত্র ১ শতাংশেরও কম।

জানা গেছে, এবারও চাঁপাইনবাবগঞ্জ দেশের শীর্ষ আম উৎপাদনকারী জেলা। এখানে ৩৭ হাজার ৪৯৮ হেক্টর বাগান থেকে ৪ লাখ ৬৯ হাজার টন আম উৎপাদন হচ্ছে। এবার এ জেলা থেকে ২৫০ টন আম বিদেশে যাবে। আম উৎপাদনে এগিয়ে যাচ্ছে পার্শ্ববর্তী জেলা নওগাঁ। নওগাঁর ৩০ হাজার ৩২১ হেক্টর বাগানে এবার ৩ লাখ ৮৭ হাজার টন আম ফলনের আশা আছে। নওগাঁ থেকে এবার ১০০ টন আম বিদেশে যাবে। গত কয়েক বছরে নওগাঁ থেকে ২৫০ টন পর্যন্ত আম বিদেশে গেছে। এবার রাজশাহীর ১৯ হাজার ৪৬২ হেক্টর বাগান থেকে ২ লাখ ৫৬ হাজার টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। কৃষি বিভাগের অতিরিক্ত উপপরিচালক পাপিয়া রহমান জানান, রাজশাহীতে আমের ফলন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি হবে। কিছু আম রপ্তানিও হবে। অন্যদিকে অঞ্চলের আরেক জেলা নাটোরেও আম চাষ বাড়ছে। এই জেলার ৫ হাজার ৬৯৩ হেক্টরে ৬৮ হাজার টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও উৎপাদন বেশি হবে বলে কৃষি বিভাগ আশা করছে।