একসময় কিশোরদের আড্ডা সীমাবদ্ধ ছিল পাড়া-মহল্লা কিংবা স্কুলের মাঠে। এখন সেই আড্ডার বড় অংশই চলে গেছে স্মার্টফোনের পর্দায়। ফেসবুক গ্রুপ, মেসেঞ্জার চ্যাট, টিকটক লাইভ, অনলাইন গেমিং প্ল্যাটফর্ম এই ভার্চুয়াল জগৎই হয়ে উঠছে নতুন প্রজন্মের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। কিন্তু প্রযুক্তির এই সুবিধার আড়ালেই উদ্বেগজনকভাবে বিস্তার ঘটছে কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির। অপরাধের পরিকল্পনা থেকে শুরু করে অবাধ্য মোবাইল আসক্তি, সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি বর্তমান প্রজন্ম। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সমাজবিজ্ঞানী ও প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, কিশোর গ্যাংগুলোর সংগঠিত হওয়া, সদস্য সংগ্রহ, প্রতিপক্ষকে হুমকি দেওয়া, এমনকি অপরাধ পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও এখন মূল ভূমিকা রাখছে স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।
পর্দায় গ্যাং কালচার ও আতঙ্কের পরিসংখ্যান : র্যাবের তথ্যানুযায়ী, গত ছয় বছরে দেশে মোট ১ হাজার ১২৬ জন কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি বিশাল অংশ ধরা পড়েছে ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পরিচালিত অভিযানে। গ্রেপ্তার হওয়া এসব কিশোরের মোবাইল ফোন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তারা ফেসবুক, মেসেঞ্জার, টিকটক ও বিভিন্ন অনলাইন গেমিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করত। কোথাও কোথাও গ্যাংয়ের সদস্য সংগ্রহ, অস্ত্রের ছবি প্রদর্শন, প্রতিপক্ষকে ভয়ভীতি দেখানো এবং নিজেদের ‘প্রভাব’ জাহির করতেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকটক বা ফেসবুকে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার অন্ধ প্রতিযোগিতা থেকেও অনেক কিশোর অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক এবং সমাজবিজ্ঞানী ড. মো. তৌহিদুল হক এ প্রসঙ্গে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের দেশে এখন যার যেমন খুশি সেভাবে মোবাইল বা অন্যান্য ডিভাইস ব্যবহার করছে। এমনকি প্রাথমিক পর্যায়ের একজন শিক্ষার্থীও অ্যান্ড্রয়েড ফোন এবং উচ্চগতির ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে।
তিনি উল্লেখ করেন, অতিরিক্ত ইন্টারনেট ব্যবহারের ফলে কিশোরদের আচরণে বড় ধরনের নেতিবাচক পরিবর্তন আসছে। অনেক অভিভাবক অভিযোগ করছেন যে, নির্দিষ্ট বয়স হওয়ার পরও তাদের সন্তানরা স্বাভাবিকভাবে যোগাযোগ করতে পারছে না। তারা ক্রমে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে এবং পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের চর্চাকে চ্যালেঞ্জ করছে। ভিনদেশি তরুণদের লাইফস্টাইল ও কথাবার্তা দেখে প্রভাবিত হওয়ার ফলে তাদের মধ্যে আইন না মানার প্রবণতা এবং বুদ্ধিভিত্তিক বিকলাঙ্গতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা ও অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশ সোশ্যাল মিডিয়া ও স্মার্টফোন ব্যবহারে নজিরবিহীন কড়াকড়ি শুরু করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধকরণ : অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ১৬ বছরের কম বয়সিদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে ঐতিহাসিক আইন পাস করেছে। আইন অমান্য করলে প্ল্যাটফর্মগুলোকে ৫০ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার পর্যন্ত জরিমানা করার বিধান রাখা হয়েছে। ফ্রান্সও ১৫ বছরের কম বয়সিদের জন্য একই ধরনের বিল অনুমোদন করেছে। এ ছাড়া স্পেন, ব্রিটেন, নরওয়ে ও চীনসহ বহু দেশ বিভিন্ন বয়সিকেন্দ্রিক বিধিনিষেধ বা ‘মাইনর মোড’ চালু করেছে।
স্কুলে স্মার্টফোন নিষিদ্ধ : ইউনেস্কোর গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষা ব্যবস্থায় (৭৯টি দেশে) স্কুলে স্মার্টফোন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ক্লাসে ফোনের একটিমাত্র নোটিফিকেশনের কারণে মনোযোগ হারালে শিক্ষার্থীদের পুনরায় পাঠে ফিরতে প্রায় ২০ মিনিট পর্যন্ত সময় লাগে।
বিশ্বের অভিজ্ঞতা ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সম্পূর্ণ নিষিদ্ধকরণ সবসময় কার্যকর বা যৌক্তিক নয়। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় অনলাইন শিক্ষা, জরুরি যোগাযোগ ও ডিজিটাল দক্ষতা অর্জনের জন্য শিশুদের প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হওয়া প্রয়োজন। এই বাস্তবতার কারণে অস্ট্রেলিয়ার মতো কঠোর আইনের দেশেও ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার কিডস এবং গুগল ক্লাসরুমকে নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত রাখা হয়েছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নূর মোহাম্মদ মনে করিয়ে দেন, অনেক শিশু মোবাইলে ফ্রিল্যান্সিং বা বই পড়ার মতো গঠনমূলক কাজও করে। তাই জেন-জি পরবর্তী প্রজন্মের বিকাশকে অস্বীকার না করে তাদের মনস্তত্ত্ব বুঝতে হবে। ঢালাও নিষেধাজ্ঞার ফলে অনেক কিশোর-কিশোরী সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।
করণীয় : বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবস্থা থেকে উত্তরণে শিশুদের সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনা এবং ডিভাইসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমানো জরুরি। প্রযুক্তির সঠিক ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে একযোগে কাজ করতে হবে।