ভারতের লাগাতার পুশইন চেষ্টায় সীমান্তে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। একদিকে নয়াদিল্লিতে বৈঠকে বসেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ), অন্যদিকে সীমান্তে নিয়মিতই পুশইনের চেষ্টা চালাচ্ছে ভারত। গতকালও জামালপুর ও কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে শতাধিক মানুষকে পুশইনের চেষ্টা করেছে বিএসএফ। তবে বিজিবি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের তৎপরতায় সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এ ছাড়া রবিবার গভীর রাতে পঞ্চগড় সীমান্তের শূন্যরেখায় পুশইন করা ১০ জনকে ৬৯ ঘণ্টা পর ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয় বিএসএফ। পুশইনের অপতৎপরতা ঠেকাতে সীমান্তে বাড়তি বিজিবি মোতায়েন করেছে সরকার। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নজরদারি বৃদ্ধির পাশাপাশি যৌথ পাহারায় নেমেছে বিজিবি ও গ্রামবাসী।
পুশইনসহ সীমান্তের নানা জটিলতা নিয়ে দিল্লিতে বৈঠকে বসেছে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী। গতকাল দিল্লির লোদি রোডের বিএসএফ সদর দপ্তরে শুরু হওয়া বিজিবি-বিএসএফ ৫৭তম মহাপরিচালক পর্যায়ের এ বৈঠক চলবে ১১ জুন পর্যন্ত। বৈঠকে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মহাপরিচালক ছাড়াও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পানি মন্ত্রণালয় ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সেক্টর কমান্ডাররা অংশ নিচ্ছেন।
বৈঠক প্রসঙ্গে গতকাল ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেন, এই বৈঠকের সিদ্ধান্তের জন্য সবার অপেক্ষা করা উচিত। যেসব অবৈধ অভিবাসী নো ম্যানস্ ল্যান্ডে (সীমান্তের শূন্যরেখায়) আটক রয়েছেন সেই বিষয়ে দুই সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে আলোচনা চলছে। আলোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই বিষয়ে মন্তব্য করা যাবে না। বাংলাদেশিসহ সব অবৈধ অভিবাসীর বিরুদ্ধে ভারতীয় আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ২ হাজার ৮৬০ জন অবৈধ অভিবাসীর তালিকা বাংলাদেশ সরকারকে দেওয়া হয়েছে। এই তালিকা পাঁচ বছর পুরোনো। কিন্তু আজ পর্যন্ত ওই তালিকা তারা (বাংলাদেশ) চিহ্নিত করেনি। যদি বাংলাদেশ সরকার এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত না নেয় তাহলে জটিলতা দেখা দেবে।
এদিকে গতকালও দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে পুশইনের চেষ্টা চালিয়েছে বিএসএফ। শুধু জামালপুর ও কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে শতাধিক মানুষকে পুশইনের চেষ্টা করা হয়। তবে বিজিবি স্থানীয়দের প্রতিরোধের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয় বিএসএফ। বিজিবি সূত্র জানিয়েছে, সোমবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে জামালপুর ৩৫-ব্যাটালিয়ন বিজিবির আওতাধীন সীমান্ত এলাকায় এসব ঘটনা ঘটে। ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসানুর রহমান বলেন, সীমান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিজিবি বর্তমানে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারাও অনুপ্রবেশ ঠেকাতে অত্যন্ত সজাগ এবং যেকোনো ধরনের অবৈধ প্রবেশ রুখতে সীমান্তজুড়ে কঠোর নজরদারি অব্যাহত রাখা হয়েছে।
বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ২৬ জেলার বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্ট চিহ্নিত করে টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। এসব জেলার মধ্যে রয়েছে যশোর, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, ফেনী, মৌলভীবাজার, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, খাগড়াছড়ি, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, জয়পুরহাট, কুমিল্লা, সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নীলফামারী, পঞ্চগড়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও শেরপুর। পুশইনের উদ্দেশে সীমান্তসংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় নারী, পুরুষ ও শিশুদের জড়ো করছে বিএসএফ। অনেক ক্ষেত্রে পুশইনের চেষ্টা ব্যর্থ হলে তাদের আবার ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে বেশ কিছু মানুষ সীমান্ত এলাকায় অনিশ্চয়তার মধ্যে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, সীমান্তে ভারতের পুশইনের বিষয়টি বিজেপির রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়। পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের নির্বাচনে এ ধরনের প্রতিশ্রুতি ছিল। যেটার চাপ কিছুটা আমাদের ওপরে আসছে। ভারত উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাংলাদেশকে চাপে রাখতে এটা করছে বলে আমি মনে করি না।