প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার-বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ-উর রহমান স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ‘আওয়ামী লীগ’ অংশগ্রহণ নিয়ে দেয়া বক্তব্য টক অব দ্য কান্ট্রি। তিনি বলেছেন, নির্বাচন-সংক্রান্ত শর্তাবলি পূরণ করলে ব্যক্তি হিসেবে আওয়ামী লীগ নেতাসহ যে কেউ আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। এ বিষয়ে সরকারের দিক থেকে বাধা দেয়ার কোনো কারণ নেই।
গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে তথ্য অধিদফতরে আয়োজিত নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হতে কোনো রকম কোনো সমস্যা নেই। একজন ব্যক্তি যদি নির্বাচনে অংশ নিতে চান, তিনি যদি আওয়ামী লীগ করেন তবুও প্রার্থী হতে পারবেন; কারণ নির্বাচনটা নির্দলীয়। তবে প্রার্থী হওয়ার যে ক্রাইটেরিয়া আছে, সেটি পূরণ করতে হবে। আসন্ন স্থানীয় নির্বাচন ইস্যুতে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে জাহেদ-উর রহমান যে বার্তা দিয়েছেন তাতে পরিষ্কার, আওয়ামী লীগ যে রাজনীতিতে ফেরার হুঙ্কার দিয়েছে; সেটি শুরু হবে স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেয়ার মধ্য দিয়ে।
১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে রাজনীতিতে ছিল এক ধরনের সমীকরণ। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি; ফলে বিএনপির সঙ্গে জামায়াত-এনসিপি জোটের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে। নির্দলীয় ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতারা অংশগ্রহণ করলে জটিল সমীকরণের মুখে পড়বে দেশের রাজনীতি। তখন রাজনীতির গতিপ্রকৃতি কোন দিকে মোড় নেবে আগাম বোঝা কঠিন।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন হবে অনেকটা ঝড়ো হাওয়ার মতোই। ঝড়ো হাওয়া যখন তখন গতিপথ পরিবর্তন করে। কখন কোন দিকে মোড় নেয় তা বোঝা যেমন দুরূহ; তেমিন আওয়ামী লীগ রাজনীতির মাঠে কোন কৌশলে ফিরবে তার ওপর রাজনীতির গতিপ্রকৃতি প্রবাহিত হবে। দলের সভাপতি শেখ হাসিনা যখন ফিরবেন না এবং দলের অন্য কোনো নেতার নেতৃত্বও তৃণমূল আওয়ামী লীগ মেনে নিচ্ছে না সে কারণে বিজয়ের চেয়ে রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন হবে দলটির মূল টার্গেট। কোন কৌশল গ্রহণ করলে দেশের রাজনীতিতে নতুন করে শেকড় পোতা যাচ্ছে সে চেষ্টাই করবে আওয়ামী লীগ।
যার কারণে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ নির্বাচন ঘিরে ইতোমধ্যেই গ্রামগঞ্জে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির আওয়ামী লীগের ভোটার ও প্রার্থীদের নিজেদের পক্ষে নেয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে জন্ম নেয়া এনসিপি যেমন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে প্রার্থী করতে আওয়ামী লীগ নেতা মঞ্জুর আলমের বাসায় ধরনা দিয়েছে; তেমনি জামায়াত স্থানীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোট পেতে তাদের সঙ্গে পর্দার আড়ালে নির্বাচনী সমঝোতার প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছে।
ক্ষমতাসীন বিএনপিও বসে নেই। নির্বাচনী প্রচারণায় না নামলেও ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের নেতারা আওয়ামী লীগের ভোট পাওয়ার চেষ্টা করছে। স্থানীয় নির্বাচনে মাঠের পরিস্থিতি কেমন হবে তা আন্দাজ করা যাচ্ছে না। এটি ঠিক, বিএনপিকে ঠেকাতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে পর্দার আড়ালে নির্বাচনী সমঝোতা করতে জামায়াত সর্বাত্মক চেষ্টা করবে। ইসলামের নামে রাজনীতি করলেও ভোট এবং ক্ষমতার জন্য জামায়াত যেকোনো কৌশল গ্রহণ করতে পারে।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে হিন্দু শাখা খোলা, পূজাম-পে ছুটে গিয়ে গিতা পাঠ, রোজা ও পূজা মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ ফতোয়া দেয়াÑ সব কৌশল করেছে। জাতীয় নির্বাচনে বিপুল সংখ্যক আসন পাওয়ার পর জামায়াত স্থানীয় নির্বাচনে সেই কৌশল আরো বেগবান করবে। দেশের উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্থানীয় নির্বাচন ইস্যুতে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি কার্যত আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ের নেতা ও সমর্থকদের তোয়াজনীতির কৌশল গ্রহণ করেছে। প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগ প্রতিহতের ঘোষণা দিলেও পর্দার আড়ালে ওই দলটির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের নিজেদের দিকে টানতে নানা কৌশল করছে।
১২ ফেব্রুয়ারি জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগের পর বিএনপির সরকার গঠনের কিছুদিন যেতে যা যেতেই শুরু হয়েছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রচারণা। স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম চলতি বছরের শেষ দিকে স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিয়েছেন। জেলা পরিষদ নির্বাচন এখনো আকর্ষণীয় না হলেও স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ চার স্তর সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ এবং ইউনিয়ন পরিষদ-ইউপি নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচিত ওইসব প্রতিনিধি সরকার পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং তৃণমূল পর্যায়ে রাজনৈতিক দলের খুঁটির ভূমিকা পালন করে। চার স্তরের স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নির্বাচন কমিশন অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রায় দুই হাজার ৯০০ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছে। আগামী অর্থবছরে স্থানীয় নির্বাচনগুলো হচ্ছে সেটি নির্বাচন কমিশনের অর্থমন্ত্রণালয়ে পাঠানো বরাদ্দের প্রস্তাবে পরিষ্কার।
আগামী অর্থবছরে স্থানীয় সরকারের পাঁচ স্তরের ভোটের পরিকল্পনা রয়েছে ইসির। এর মধ্যে স্থানীয় সরকারের চার হাজার ৫৮১ ইউনিয়ন পরিষদ, ৬১ জেলা পরিষদ, ৪৯৫ উপজেলা পরিষদ, ৩৩০ পৌরসভা ও ১৩ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন পদ নির্বাচন উপযোগী রয়েছে। এ প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সাংবাদিকদের বলেছেন, বাজেটে নির্বাচনের প্রয়োজনীয় বরাদ্দ আসার পরই জুলাই-অগাস্ট থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে, কোন নির্বাচন কবে হবে।
রাজনৈতিক দলগুলোর তৃণমূল পর্যায়ে নিজেদের জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক অবস্থান যাচাইয়ের জন্য স্থানীয় নির্বাচনগুলোকে একটি পরীক্ষামূলক ধাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। ক্ষমতা গ্রহণের পর এই নির্বাচন বিএনপি সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, অধিকাংশ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান বর্তমানে মেয়াদোত্তীর্ণ এবং নির্বাচন উপযোগী অবস্থায় রয়েছে। তবে নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট শাখাগুলোকে সরকার বা মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায় থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা দেয়া হয়নি। ফলে নির্বাচন-সংক্রান্ত প্রস্তুতিও আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়নি। তবে আওয়ামী লীগের শাসনামলে আরপিওতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে করা হতো। আন্তর্বর্তী সরকারের নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার ও সদস্য স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ নির্বাচন দলীয় ব্যানারে না করে স্থানীয় নির্বাচন নির্দলীয় করার প্রস্তাব দেয়ার পর আরপিও সংশোধন করে স্থানীয় নির্বাচন নির্দলীয় করা হয়। তবে এখন পর্যন্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে মাঠপর্যায়ে বা দাফতরিকভাবে কোনো নির্দেশনা এখনো দেয়া হয়নি। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. শহীদুল হাসান বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে অনুষ্ঠিত হবে, সেটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়।
সাংগঠনিক কার্যক্রম নিষিদ্ধের কারণে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করতে পারেনি। আবার নির্বাচনে জুলাই অভ্যুত্থানের দল এনসিপি ও জামায়াত নির্বাচনী জোট গঠন করেছিল। ফলে বিএনপি বনাম জামায়াত-এনসিপি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় রাজনীতির সমীকরণ ছিল এক ধরনের। ২০২৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে দিল্লি চায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের পুনপ্রত্যাবর্তন।
১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে সেটি সম্ভব না হলেও নির্দলীয় স্থানীয় নির্বাচনে সেটি হতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ-উর রহমানের বক্তব্যে সেটি পরিষ্কার। স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কারণে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা তীব্র হতে পারে। আওয়ামী লীগ সরাসরি রাজনৈতিক কর্মকা-ে সক্রিয় না থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে তাদের সমর্থিত প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছেন। এতে রাজনীতিতে নতুন প্রেক্ষাপট তৈরি হবে। দেশের রাজনৈতিক সমীকরণ পাল্টে যাবে। অবশ্য নির্বাচন নিয়ে গবেষণা করেন এমন এক বিশেষজ্ঞ বলেছেন, জনসমর্থনের দিক দিয়ে বিএনপি বটবৃদ্ধ আর জামায়াত রাজকড়ই গাছের মতোই। রাজকড়ই গাছ কয়েক বছরে বিশালাকৃতির হলেও মজবুত না হওয়ায় ঝড়বাতাসে ভেঙে পড়ে। কিন্তু বড়গাছ ধীরে ধীরে বড় হয় এবং ঝড়ঝঞ্ঝায় নিজেকে রক্ষা করে শত বছর বেঁচে থাকে। বিএনপির জনসমর্থন অনেকটা ওই বটগাছের মতোই। তবে স্থানীয় নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি ও জামায়াত এবং তৃতীয় সারির এনসিপি কোন কৌশল গ্রহণ করবে, সেটিই দেখার বিষয়।