যশোরে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে খুন ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। চুরি-ছিনতাইয়ের পাশাপাশি একের পর এক নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। গত ৪৮ ঘণ্টায় জেলাজুড়ে মা-সন্তানসহ ৫ জনের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে রয়েছে স্বামীর হাতে নববধূ খুন, নাতনিকে উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় নানাকে কুপিয়ে হত্যা এবং মা-ছেলের রহস্যজনক ঝুলন্ত লাশ।
সোমবার (৮ জুন) ও মঙ্গলবার এসব ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে তিনজনকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
ঘরে মা-শিশুর ঝুলন্ত লাশ
যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলায় নিজ ঘর থেকে রেবেকা খাতুন (২৬) ও তার দেড় বছর বয়সী শিশুসন্তান সোহরাব হোসেনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার (৯ জুন) দুপুরে উপজেলার নাভারন ইউনিয়নের শরীফপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। রেবেকা ওই গ্রামের জনি মিয়ার স্ত্রী। ঘটনার সময় তাদের বড় মেয়ে জুঁই (১০) স্কুলে ছিল।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, সন্তানকে হত্যার পর রেবেকা নিজে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। তবে রেবেকার স্বজনদের দাবি, এটি হত্যাকাণ্ড। নিহতের বোন শাফিহা খাতুনের অভিযোগ, জনি মিয়া শ্বশুরবাড়ি থেকে পাওয়া রেবেকার জমির ৩০ লাখ টাকা নষ্ট করেছে এবং আরও টাকার জন্য চাপ দিচ্ছিল। টাকা না পেয়ে মা-ছেলেকে হত্যা করে লাশ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।
ঝিকরগাছা থানার ওসি গোলাম কিবরিয়া বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য স্বামী জনি মিয়াকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পেলে আসল কারণ জানা যাবে।
নাতনিকে উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় নানাকে হত্যা
যশোরের মণিরামপুর উপজেলার স্মরণপুর বাজারে ইনামুল হোসেন (৫০) নামের এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যা করেছে বখাটেরা। নিহত ইনামুল ঝিকরগাছা উপজেলার ছারাসাতপুর গ্রামের বাসিন্দা।
স্থানীয়রা জানান, ইনামুলের অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া নাতনিকে স্কুলে যাওয়া-আসার পথে ছারাসাত গ্রামের রাব্বি, রাকিব, হুমায়ুনসহ কয়েকজন বখাটে উত্ত্যক্ত করত। গত শনিবার ইনামুল এর প্রতিবাদ করেন এবং বখাটেদের বকাঝকা করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সোমবার (৮ জুন) রাতে স্মরণপুর বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে ওত পেতে থাকা বখাটেরা ইনামুলের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ফেলে রেখে যায়। হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
মণিরামপুর থানার ওসি আবু সাঈদ জানান, হামলা ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের সবার বাড়ি ঝিকরগাছা উপজেলার ছারাসাত গ্রামে। কিন্তু হত্যাকাণ্ডটি মণিরামপুর উপজেলায় ঘটেছে। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী বাদী হয়ে থানায় মামলা দায়ের করেছেন। ঘটনায় জড়িত একজনকে আটক করা হয়েছে।
স্বামীর হাতে নববধূ খুন
যশোর সদর উপজেলায় বিয়ের ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই স্বামীর হাতে খুন হয়েছেন সামিনা আক্তার শাম্মী (২০) নামে এক নববধূ। সোমবার (৮ জুন) সকালে উপজেলার শেখহাটি তামালতলা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত স্বামী সুজন স্ত্রীকে হত্যার পর নিজের শরীরেও ছুরি চালিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। বর্তমানে তিনি যশোর জেনারেল হাসপাতালে পুলিশি হেফাজতে চিকিৎসাধীন।
পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সামিনা ও সুজন সম্পর্কে মামাতো-ফুপাতো ভাই-বোন। ভালোবেসে বিয়ে করে তারা শেখহাটিতে ভাড়া থাকতেন। সোমবার সকালে মাদক সেবনের টাকা ও পারিবারিক কলহের জেরে সুজন ক্ষিপ্ত হয়ে সামিনাকে ধারালো ছুরি দিয়ে গলা কেটে হত্যা করেন।
নিহত সামিনার মামা পিয়াস জানান, সুজন আগে বিদেশে কর্মরত ছিলেন। প্রায় ছয় মাস আগে ভালোবেসে তারা বিয়ে করেন এবং পরে আলাদা ভাড়া বাসায় বসবাস শুরু করেন। বর্তমানে সুজন বেকার ছিলেন এবং পুনরায় বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এর মধ্যেই এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটল।
যশোর কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কাজী বাবুল বলেন, ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, তারা আত্মীয়তার সম্পর্কের মধ্যে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আলাদাভাবে বসবাস করতেন। পারিবারিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ চলছিল। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে সব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় নিহতের স্বামী আটক রয়েছেন।
মাঠ থেকে বৃদ্ধের মরদেহ উদ্ধার
যশোর সদরের পাঁচবাড়িয়া স্কুল মাঠ থেকে হামিদ বিশ্বাস (৬৫) নামের এক বৃদ্ধকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে স্থানীয়রা। পরে সোমবার (৮ জুন) রাত সাড়ে ১২টার দিকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাক্তার আহসান কবির বাপ্পি বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে অজ্ঞান পার্টির কবলে পড়ে হার্ট অ্যাটাকজনিত কারণে তার মৃত্যু হতে পারে। মৃত্যুর কারণ সন্দেহজনক হওয়ায় লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
যশোর কোতোয়ালি মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কাজী বাবুল বলেন, ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু হয়েছে। তদন্ত রিপোর্ট হাতে পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।
এদিকে যশোরে একের পর এক খুনের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ক্রাইম স্পটগুলোতে পুলিশি নজরদারি ও টহল আগের চেয়ে কম। তবে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রতিটি ঘটনারই তদন্ত চলছে এবং অপরাধীদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।