রাস্তা থেকে এক নারীকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে—এমন একটি ধারণকৃত ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ভিডিওটি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, স্কুল থেকে সন্তানকে নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে ‘জুলাই মব সন্ত্রাসীরা’ সন্তানের সামনেই ওই নারীকে ধর্ষণের উদ্দেশ্যে অপহরণ করেছে। একই সঙ্গে এই ঘটনাকে বাংলাদেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির উদাহরণ হিসেবেও প্রচার করা হচ্ছে। তবে তথ্য অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই চাঞ্চল্যকর দাবিটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। মূলত, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের এক কনটেন্ট ক্রিয়েটরের তৈরি করা একটি সচেতনতামূলক নাটকের দৃশ্যকে বাংলাদেশের বাস্তব ঘটনা দাবি করে এই ভয়ানক গুজবটি ছড়ানো হয়েছে।
প্রেক্ষাপট ও ভাইরাল দাবি
সম্প্রতি ফেসবুক ও অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ভিডিওটি ছড়িয়ে দিয়ে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী ও দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিশানা করা হয়। সন্তানের সামনে থেকে মাকে অপহরণের মতো একটি স্পর্শকাতর বিষয় হওয়ায় ভিডিওটি দ্রুত ভাইরাল হয় এবং সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করে।

অনুসন্ধান ও সত্যতা যাচাই
ভিডিওটির সত্যতা এবং মূল উৎস চিহ্নিত করতে অনুসন্ধান চালানো হয়। অনুসন্ধানের একপর্যায়ে ভাইরাল হওয়া হুবহু ভিডিওটি “Muklesur Ali” নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টে খুঁজে পাওয়া যায়। ওই প্রোফাইলটি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এর অ্যাডমিন বা মালিক ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বীরভূম জেলার একজন বাসিন্দা।
শুধু এই একটি ভিডিওই নয়, ওই ফেসবুক প্রোফাইলে একই ধরনের আরও অসংখ্য ভিডিও রয়েছে, যেখানে অপহরণ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, আকস্মিক হামলা বা বিভিন্ন সামাজিক সংঘাতের দৃশ্য অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ভিডিওগুলোর বিভিন্ন দৃশ্য ও পর্ব বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, একই ব্যক্তিরা ভিন্ন ভিন্ন ভিডিওতে আলাদা আলাদা চরিত্রে অভিনয় করছেন—যা থেকে স্পষ্ট হয় এগুলো সম্পূর্ণ পরিকল্পিত ও অভিনয়ভিত্তিক কনটেন্ট।

ইউটিউব চ্যানেলের অকাট্য প্রমাণ
আরও গভীর অনুসন্ধানে উক্ত ব্যক্তির অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেলটির সন্ধান মেলে। সেই চ্যানেলের বিবরণী বা ‘অ্যাবাউট’ সেকশনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা রয়েছে যে—প্রকাশিত ভিডিওগুলো মূলত সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ও বিনোদনের উদ্দেশ্যে সম্পূর্ণ ‘স্ক্রিপ্ট’ বা লিখিত গল্প অনুযায়ী নির্মাণ করা হয়েছে। অর্থাৎ, এগুলোর সাথে বাস্তব কোনো অপরাধমূলক ঘটনার সম্পর্কও নেই।
আলোচিত ভাইরাল ভিডিওটির মূল এবং পূর্ণাঙ্গ সংস্করণটিও ওই ইউটিউব চ্যানেলেই পাওয়া গেছে। সেখানেও ভিডিওটিকে কোনো বাস্তব অপহরণ, ধর্ষণের চেষ্টা বা নির্দিষ্ট কোনো দেশ বা গোষ্ঠীর সহিংসতার ঘটনা হিসেবে প্রকাশ করা হয়নি; বরং এটি ছিল শুধুই একটি অভিনয়।

সামগ্রিক তথ্য-প্রমাণ ও উৎস বিশ্লেষণ শেষে এটি শতভাগ নিশ্চিত যে, ‘সন্তানের সামনে থেকে মাকে তুলে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা’ এবং ‘জুলাই মব সন্ত্রাসীদের কর্মকাণ্ড’ দাবি করে যে ভিডিওটি প্রচার করা হচ্ছে, সেটি প্রকৃতপক্ষে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমে ধারণকৃত একটি সাজানো ও স্ক্রিপ্টেড নাটকের অংশ। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কোনো ঘটনার সঙ্গে এর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা ভৌগোলিক সম্পর্ক নেই। রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা তৈরির উদ্দেশ্যে একটি অভিনয়কে বাস্তব অপরাধ হিসেবে সাজিয়ে এই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গুজবটি ছড়ানো হয়েছে।