মোল্লা মোহাম্মাদ ফারুক আহসান
মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়কে আমার খুবই ভালো লাগে কারণ তিনি খুবই আত্মবিশ্বাসের সাথে ভুলভাল কথাবার্তা বলেন। এইবার একদম বেসিক কথাতে আসি।
এখন উনার বক্তব্য অনুযায়ী
১। বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতা আছে ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়ার। ব্যাংক গ্রাহকের ভালো চেয়ে যদি কাউকে নিয়োগ দেয় তাহলে মেনে নেওয়া উচিত।
২। তিনি ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের ক্ষেত্রে প্রিজাম্পশন অফ ইনোসেন্সের কথা বললেন।
৩। সবচেয়ে মারাত্মক যে ব্যাপারটা তিনি ইসলামী ব্যাংক যে ডাকাতি করা হয়েছিলো সেটাকে তিনি বৈধতা দিলেন এই বলে যে, "ইবনে সিনার শেয়ারহোল্ডাররা নাকি ব্লক মার্কেটে তিনগুণ দাম পেয়ে শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছে"।
এখন প্রথমে আসি,
উনি খুরশীদ আলমের নিয়োগকে জায়েজ করতে গিয়ে রেগুলেটরি অথরিটির দোহাই দিয়েছেন।
ব্যাংক কোম্পানি আইনের ধারা ১৫ এবং ধারা ৪৬ যৌথভাবে পড়লে দেখা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংক কেবল তখনই কোনো চেয়ারম্যান বা পরিচালকের নিয়োগ অনুমোদন করতে পারে, যদি তিনি ‘ফিট অ্যান্ড প্রপার ক্রাইটেরিয়া’ (Fit and Proper Criteria) বা উপযুক্ততার নীতিতে উত্তীর্ণ হন।
আর বাংলাদেশ ব্যাংকের BRPD Circular No. 12 (২৬ এপ্রিল ২০০৩) অনুযায়ী ব্যাংকের পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রেও ফিট এন্ড প্রোপার টেস্ট মেনে নিয়োগ দিতে হয়। ব্যাংকিং কোম্পানি আইনের পনের ধারা অনুযায়ী ১৫(৬)(ঊ) অনুযায়ী কেউ কোন ব্যাংকের পরিচালক পর্যন্ত হতে পারবেন না যদি তাহার নিজের কিংবা স্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান হইতে গৃহীত ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ বা খেলাপী হন।
এখানে নতুন যে চেয়ারম্যান নিয়োগ হয়েছেন তার বউ একজন ঋণখেলাপী। এখন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বলা হচ্ছে তার বউ ঋণখেলাপী হলেও সে তো ঋণখেলাপী না তাতে তো সমস্যা নাই। 
যদি কোনো ব্যক্তির অতীত ট্র্যাক রেকর্ড, কোনো নির্দিষ্ট গ্রুপের সাথে তার পূর্বতন সংশ্লিষ্টতা বা নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে, তবে বাংলাদেশ ব্যাংক তাকে নিয়োগ দেওয়া বা পদে টিকিয়ে রাখার জন্য ধারা ৪৫-৪৬ ব্যবহার করতে পারে না। বরং আইন অনুযায়ী, জনস্বার্থে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই ধারা ৪৬ প্রয়োগ করে তাকে অপসারণ করতে বাধ্য। মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় অপসারণের আইনকে নিয়োগ টিকিয়ে রাখার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে উল্টো যুক্তি দিয়েছেন।
এইবার দ্বিতীয় যুক্তিতে আসি,
উনি কিছু সস্তা ক্রিমিনাল ল এর লিগ্যাল প্রিন্সিপলের কথা বললেন। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক একটি রেগুলেটরি বডি, কোনো আইন প্রয়োগকারী সংস্থা (Law Enforcement Agency) নয়। ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ নিয়ে যদি ব্যাংকের ভেতরে প্রশাসনিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়, তবে তার সমাধান করতে হবে কর্পোরেট সুশাসন (Corporate Governance) এবং ব্যাংকিং নীতিমালার মাধ্যমে।
ব্যাংকিং সুশাসনের ব্যাপারে যেটা ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড বলে পরিচিত সেটা হলো ব্যাসেলস স্ট্যান্ডার্ড। পুরো বিশ্বের ব্যাংকিং সুশাসনের জন্যে এইটা ব্যবহার করা হয়। "প্রিজাম্পশন অফ ইনোসেন্স" আপনার র্যাব, পুলিশ ব্যবহার করুক। সমস্যা নাই। ব্যাংক, আর্থিক খাত কিংবা আর্থিক সুশাসনের ক্ষেত্রে এগুলো বলবেন না।
এখন ব্যাসেলস স্ট্যান্ডার্ডের থার্ড প্রিন্সিপল অনুযায়ী, কেবল "আদালতে দোষী প্রমাণিত না হওয়া" (যা মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় প্রিজাম্পশন অফ ইনোসেন্স বলে দাবি করেছেন) কোনো উচ্চ পদের যোগ্যতা হতে পারে না। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ‘Reputational Integrity’ (সুনামের সততা) এবং ‘Public Perception’ (জনসাধারণের আস্থা) সবচেয়ে বড় শর্ত।
ব্যাংকের পরিচালক, চেয়ারম্যান এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর যোগ্যতা ও সততার (Fit and Proper) মানদণ্ড থাকতে হবে। কোনো জালিয়াতি বা বিতর্কিত ব্যাকগ্রাউন্ডের লোক ব্যাংকের নীতি নির্ধারণী চাবিকাঠি পেতে পারবে না।
হ্যা, আইনত অবশ্যই কোন সমস্যা নাই। যেভাবে এসআলমের উপহার দেওয়া গাড়িতে ঘোরাঘুরি করাটাও কোন আইনী অপরাধ না। কিন্তু যখন কর্পোরেট গভর্নেন্সের প্রশ্ন আসে তখন এটা পুরোপুরি ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড বিরোধী।
আরেকটা কথা ব্যাসেল কোর প্রিন্সিপালস (Principle 1)-এর অন্যতম প্রধান শর্ত হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা আর্থিক রেগুলেটরকে সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে হবে।
ব্যাংকের সুশাসন নিশ্চিত করার একক এখতিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। সরকারের কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হয়ে সংসদে সাফাই গাইতে পারেন না বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতাকে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান সুরক্ষায় ব্যবহার করতে পারেন না।
এইবার আসি তৃতীয় ক্ষেত্রে, ইবনে সিনা ব্লক মার্কেটে কেন শেয়ার বিক্রি করেছিলো সেটা নিয়ে ইকনোমিস্টে দীর্ঘ প্রতিবেদন আছে। মাননীয় মন্ত্রী যদি সেটাও না পারেন তাহলে প্রথম আলোরও প্রতিবেদন আছে।
ইবনে সিনা থেকে শুরু করে ইসলামী ব্যাংকের উদ্যোক্তারা কেউই শেয়ার বিক্রি করতে চান নাই। একটা প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকের শেয়ার কেউ একান্ত বোকা ছাড়া কেউ মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিয়ে বিক্রি করতে রাজি হবে না এইটা স্বাভাবিক।
কিন্তু তৎকালীন সময়ে বাধ্য হয়ে তাদেরকে এইটা করা লেগেছে৷ কেন লেগেছে এইটা সবাই জানে৷ সেটা নিয়ে কথা বলা মানে হলো সময় নষ্ট হওয়া।
সহজ কথা হলো আওয়ামী লীগের যেরকম এসআলম ছিলো যা দিয়ে সিঙ্গাপুরে টাকা লুট করে পাঠিয়েছে তেমনভাবে আপনাদেরও নিজস্ব এসআলম দরকার। তাই সহজ শিকার হিসেবে একটা ব্যাংককে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিচ্ছেন।
লুটপাট করছেন করেন। ভুলভাল যুক্তি দিবেন না।